মনের বিরক্তি মনে চেপে বসিরের লগে গলা মিলাল দবির। হ, কথা ঠিক। ভজারে রাখলে তোমার কারবারের ক্ষতি অইবো দাদা।
সেন্টু বলল, হেইডা আমি বুঝি। বুজি দেইক্কাঐ ভজারে খেদাইছি।
শুনে খুবই উৎসাহী হলো বসির। ফুক ফুক করে দুইবার সিগ্রেটে টান দিল। খেদাইছেন?
হ দোফরেঐ খেদাইয়া দিছি।
ভাল করছেন, বহুত ভাল করছেন।
তয় দোকান চালামু কেমতে হেই চিন্তায় অহন আর বাঁচতাছি না।
ক্যা? অন্য কর্মচারী রাখবেন?
হেইডা তো রাকতেই অইবো। তয় ভজার মতন কর্মচারী পামু কই? ভজা বহুত ভাল চা। বানাইতো, আমার থিকাও ভাল মিষ্টি বানাইতো। আমি নিজহাতে অরে কাম হিগাইছিলাম। আকবইরা হালায় গোঁয়ার পিছে না লাগলে ভজারে আমার খেদান লাগতো না।
চা শেষ করে সিগ্রেটে টান দিল বসির। কিছু একটা বলতে যাবে তার আগেই দবির বলল, আল্লায় যা করে ভালর লেইগাই করে। মনে কষ্ট লইয়ো না দাদা। কর্মচারী বিচড়াও (খোজো), দেখবা ভজার থিকাও ভাল কর্মচারী পাইয়া গেছ। বদলাম কইরা আকবর তোমার কোনও ক্ষতি করতে পারে নাই। উপকারই করছে। এই যে আকবর কথা রটানের লগে লগে ভজারে তুমি খেদাইছো, এইডাই তোমার উপকার। বাজারের মাইনষে আর গাহেকরা মনে করবো খাচ্চর কর্মচারী তুমি দোকানে রাখো নাই। খেদাইয়া দিছো।
বসির বলল, একদোম খাঁটি কথা। সেন্টুদাদা, আইজথিকা দেকবেন আপনের দোকানের আরও নাম অইবো। বেচাকিনা আরও বাড়বে।
বোজলাম, তয় ভজা ছেমড়াডার লেইগা মায়া লাগতাছে দাদা। এতদিন রইছে আমার লগে! কানতে কানতে বাইর অইলো দোকান থিকা। ভজার লেইগা মনডা আমার খারাপ।
দোকানের নাম বাড়লে, বেচাকিনা বাড়লে খারাপ মন ভাল অইতে টাইম লাগবো না।
ভগবানে করুক, হেইডাই য্যান অয়। আপনেগো মুখে ফুলচন্দন পড়ুক।
এসময় খাইগোবাড়ির (খানবাড়ির) আপেল মেম্বার এসে দাঁড়াল সেন্টুর দোকানের সামনে। লগে মেদিনীমণ্ডলের ইদ্রিস জুয়েল আর নয়ন। দবির আর ল্যাংড়া বসিরের দিকে ফিরাও তাকাল না আপেল। পরনে টেটরনের কালো প্যান্ট আর সাদার উপর নীল চেকের হাফহাতা শার্ট। পায়ে রাবারের পামশু। হাতে সিগ্রেট জ্বলছে। সিগ্রেটে টান দিয়া সেন্টুকে বলল, দুই কুড়ি বড় সাইজের রসোগোল্লা বাইন্দা রাখো সেন্টু। ঘুইরা আইতাছি। যাওনের সময় লইয়া যামু।
লগের ছেলে তিনটা নিয়া কালিরখিলের ওদিকে চলে গেল আপেল। সেন্টু ব্যস্ত হয়ে গেল মিষ্টি গুছাতে। দবিরের মনে তখন বিরাট স্বস্তি। এবার নিশ্চয় কথাটা তুলবে বসির। গভীর আগ্রহ নিয়া বসিরের দিকে তাকাল সে।
বসিরও তাকাল দবিরের দিকে। তয় এইবার কথাডা কই গাছিদাদা।
ভিতরের উত্তেজনা প্রকাশ করল না দবির। খুবই সরল সাধারণ গলায় বলল, কও।
আপনের মাইয়াডার বস কত অইলো গাছিদাদা? হে হে।
অনেকক্ষণ পর বসিরের হে হে হাসিটা শুনল দবির। শুনে আনমনা হল। কার কথা কও? নূরজাহানের?
তয় আর কার কথা কমু? নূরজাহান ছাড়া আপনের আর কোনও মাইয়া আছেনি? হে হে।
না হেইডা নাই। আমার ঐ একখানঐ মাইয়া।
কন দিহি বস কত অইলো মাইয়ার?
এই ধরো চৌদ্দ-পোনরো বচ্ছর।
ধরতে পারুম না। চৌদ্দ না পোনরো হেইডা কন।
মুখ হাসিহাসি করল দবির। আমগো লাহান মাইনষে পোলাপানের আসল বসের খবর। রাখে না। কোন বচ্ছর কোনদিন জন্মে পোলাপান হেইডা পুরাপুরি মনে রাখে না।
হ কথা ঠিক।
তয় নূরজাহানের চৌদ্দ নাইলে পোনরো বচ্ছর বস অইবো। এইরকম বাইষ্যাকাল। আষাঢ় না শাওন মাস জানি। বিয়াইন্না রাইত্রে আহুজ পড়লো তোমার ভাবীছাবের। ধরনী অইলো আলার মা’য়। ইস, আগের দিন বিয়াল থিকা যে কী মেঘবিষ্টি। নূরজাহানের মা’র বেদনা উটলো হাজেরবেলা। মেগে ভিজতে ভিজতে কোষানাও লইয়া আমি গেলাম আলাগো বাইত্তে। আলার মা’রে লইয়াইলাম। বাইত্তে আর কেঐ আছিলো না। ঘরে নিজেঐ কুপি আঙ্গাইয়া রাইক্কা গেছি। নিঝুম বিষ্টি নামছে। আশমান খালি গুরুম গুরুম করে। খাড়াজিলিকের পর খাড়াজিলিক (বিদ্যুৎ চমক)। হাজেরবেলাই ঘুটঘুইট্টা আন্দার। একহান কইরা খাড়াজিলিক দেয়, চাইরমিহি ফকফক কইরা ওডে, হেই আলোয় পথ দেইক্কা নাও বাই আমি। ওইরকম মেগবিষ্টির রাইত্রে আলার মা কইলাম একবারও না করলো না। কওনের লগে লগে পুরানা একহান ছাতি মাথায় দিয়া আমার নাওয়ে উটলো। অমুন। বিষ্টি ছাতিতে মানে না। ভিজ্জা একসার (একসা) অইলো। ভিজা কাপড় লইয়াঐ বইয়া রইলো হারারাইত। আমি ভাত হাদলাম, খাইলো না। নূরজাহানের মায় তহন বেদনার চোড়ে মরোমরো। আমার একহান মাত্র ঘর। ওই ঘরেঐ বউর আহুজ পড়বো। বাইরে মেগবিষ্টি আরও বাড়ছে। আশমান য্যান ছিদ্রি অইয়া গেছে। ঘরে বইয়া থাকতে আমার শরম করতাছিল। ভিজতে ভিজতে রান্নঘরে গেলাম না। লুঙ্গি কাছা দিয়া হারারাইত বইয়া রইলাম রান্নঘরে। বিষ্টি বাঁচাইয়া বাঁচাইয়া টিক্কা আঙ্গাই আর খালি কুরুক কুরুক কইরা তামুক খাই। কান রইছে ঘর মিহি। বুকের ভিতরে নলামাছের লাহান ফালাফালি করে কইলজা। এই নি হুনুম আহুজ পইড়া গেছে তোমার ভাবিছাবের। ওয় ওয়া কইরা কানতাছে আমার পোলা নাইলে মাইয়া।
একটু থামল দবির। তারপর বলল, হ আওজ এক সময় হুনলাম। তহন বিয়ান অইয়া গেছে। আমার নূরজাহানও অইলো, মেগবিষ্টিও থাইমা গেল। ঘণ্টাহানি পর ডালিম ফুলের লাহান রইদ উটলো। মাইয়ার মুখহান দেইক্কা এমুন আমোদ লাগলো। তোমার ভাবিছাবের বুকের কাছে কেঁতাকাপড়ের মইদ্যে এই এতডু একহান মুখ, এই গিনি গিনি চকু ছোড ছোড হাত পাও। মাথা ভরা কালা কালা চুল মাইয়াডার।
