সেন্টু একটু নড়েচড়ে বসল। হেইডা জানি।
তয় কও।
আসলে এসব জানার কোনও আগ্রহই দবিরের নাই। সে কারও সাতেপাঁচে থাকা মানুষ। কে হিন্দু কে মুসলমান, কার লগে কার কী সম্পর্ক, কে কার লগে শত্রুতা মারামারি করছে এসব সে ভাবে না। দেশগ্রামের সবাই তার কাছে ভাল, সবাই তার আপন। সবার কথাই সে জানে, সবার ভালমন্দই জানে। কূটনামির স্বভাব দবিরের নাই। কারও কথা। কারও কাছে লাগায় না। কেউ বললে তার কথা মন দিয়া শোনে, না বললে আগ্রহ দেখায় না।
এখন দেখাচ্ছে বসিরের জন্য। যত তাড়াতাড়ি সেন্টুর পেটের কথা বের করতে পারবে বসির, তত তাড়াতাড়ি তার পেটের কথাটাও বের হয়ে আসবে। কোন মতলবে, কোন কথা বলবার জন্য এতদূর তাকে নিয়া আসছে বসির, জানা যাবে। উত্তেজনা লাঘব হবে দবিরের।
সেন্টু তখন হাফ সাইজের দুইখান কাঁচের গেলাসে দুইচামচ করে চিনি ফেলছে, গেলাসের মাজা তরি গোরুর দুধ ঢালছে। এখন কেটলির নল কাত করে খয়েরি রঙের লিকার ঢালল গেলাসে। তারপর ফটাফট শব্দে চামচ নাড়তে লাগল।
দবির আর বসির দু’জনেরই রসগোল্লা খাওয়া শেষ। হাতের কাছে গেলাসে ভরে পানি দিয়েছিল সেন্টু। পুরা পানিটাই ঢক ঢক করে খেয়েছে দু’জনে। এখন বেশ একটা পরিতৃপ্তির ছাপ পড়েছে চেহারায়। চা এলেই চায়ে চুমুক দিয়া সিগ্রেট ধরাবে দুইজনে। সেই ফাঁকে সেন্টুর ঘটনা জানা হয়ে যাবে। তারপরই আসল কথাটা বলবে বসির। দবির সেই আশায় আছে।
চায়ের গেলাস দবির আর বসিরের টেবিলে এনে রাখছে সেন্টু, বসির বলল, আপনে একলা একলা দোকান চালাইতাছেন ক্যা সেন্ট্রদাদা? আপনের ওই ছেমড়াডা কো? কী জানি নাম? ও ও মনে অইছে, ভজন। ভজা ভজা। ভজা কো?
সেন্টু তার জায়গায় গিয়া বসল। আর কইয়েন না। ওই শালার পো শালারে লইয়াঐ। তো ঘটনা।
বসির ফুরুক করে চায়ে চুমুক দিল। কী করছে?
যেইডা করছে হেইডা অর দোষ না। ও কী করবো কন? পেডে কামড় (আমাশা) কি ওয় (সে) ইচ্ছা কইরা হওয়াইছে!
পকেট থেকে সিগ্রেট বের করে নিজের অজান্তেই যেন ধরাল বসির। দবিরকে দিল। দিয়া ম্যাচ জ্বেলে ধরিয়ে দিল। ভজার পেডে কামড় অইছে নি?
হ। তয় ভজা খাচ্চর না। কাম সাইরা সাপন দিয়া হাত ধোয়।
দবির সিগ্রেটে টান দিয়া বলল, ওইডা ধুইতেই অইবো। তোমার দাদা চা-মিষ্টির কারবার। তোমার দোকানের কর্মচারী যুদি বারে বারে পায়খানায় যায় আর যুদি সাপান দিয়া হাত না ধোয় তয় তুমি ওইডা লইয়া বদলামের মইধ্যে পড়বা। মাইনষে কইবো সেন্টুর দোকানের কর্মচারী হুইচ্চা (শৌচকর্ম) সাপন দিয়া হাত ধোয় না। গুয়ের হাত দিয়া চা-মিষ্টি বানায়। এই বদলাম একবার রইট্টা (রটে) গেলে তোমার দোকানে গাহেক আইবো না। তোমার কারবার ফিনিশ অইয়া যাইবো।
সেন্টু ব্যাজার মুখে বলল, এই বদলামডা রটানের চেষ্টাঐ ত্তো করতাছে আকবইরা। বাজারের দুইহান মিষ্টির দোকানের একহান আমার একহান আকবইরার। খালি বিক্রমপুরে না, পুরা বাংলাদেশেই হিন্দুগো হাতের মিষ্টির নাম বেশি। মোসলমানরা ভাল মিষ্টি বানাইতে পারে না। কেমতে পারবো কন? তার তো বেশিদিন ধইরা মিষ্টি বানায় না। এক-দুই পুরুষ ধইরা বানায়। আর আমরা বানাই চৌদ্দ পুরুষ ধইরা…
সেন্টুর কথা শেষ হওয়ার আগেই বসির বলল, হ এইডা ঠিক। মাওয়ার বাজারের মিষ্টির কথা হোনলেই মাইনষে বোজে সেন্টুর দোকানের মিষ্টি। আকবরের দোকানের মিষ্টি মাইনষে পছন্দ করে না।
তয় আকবইরা যে মিষ্টি খারাপ বানায় এইডা আমার মুখে কেঐ কোনওদিন হোনে নাই। অর বদলাম আমি কোনওদিন কই না। তয় ওই শালার পো শালায় আমার গোঁয়ার (পশ্চাৎদেশ) পিছে লাইগ্যা রইছে। আমার কোনও দোষ ধরতে পারে না দেইক্কা ভজারে লইয়া পড়ছে।
বসির আবার বলল, কী করছে?
আইজ বিয়ান থিকা তিন-চাইরবার পায়খানায় গেছে ভজা। বাজারে পায়খানা নাই। যাইতে অয় গাঙপারের কাইশ্যাবনে (কাশবনে)। ওহেনে পানি উইট্টা গেছে। যারা হাগতে মোততে যায় কাম সাইরা তারা বেবাকতেই বাইষ্যার (বর্ষার) পানি খরচা করে। ভজা। ওইভাবে কাম সারে না। একহাতে বদনা লয় আরেক হাতে লয় সাপানের টুকরা। কাম। সাইরা সাপন দিয়া কচলাইয়া হাত ধুইয়া আহে। ভজা বারে বারে পায়খানায় যায় এইডা বিয়ান থিকাই দেখছে আকবইরা। তারপর থিকাই কারবার শুরু করছে।
বসির বড় করে সিগ্রেটে টান দিল। কী কারবার?
দবির ভিতরে ভিতরে তখন খুবই বিরক্ত। দুই শালার পো শালায় কী শুরু করলো? হাগামুতা পেডে কামড় এই হগল লইয়া এত প্যাচাইল পারতাছে ক্যা? সেউন্টা নমোরপুতের তো আক্কেল বুদ্দি কিছু নাই। চা মিষ্টি খাইছে যেই কাস্টমাররা তাগো সামনে এই প্যাচাইল কেমতে পারে?
দবিরের মনের কথা কেউ টের পায় না। না সেন্টু না বসির। তারা ওই একই বিষয় সমানে চালিয়ে যায়।
সেন্টু বলল, কারবারডা অইলো, যারে পায় তারে কয়, সেউন্টার দোকানের ভজা গুয়ের হাত দিয়া মিষ্টি বানায়, চা বানায়। ওই যে দেহো মিয়ারা, বদনা হাতে বারে বারে কাইশ্যাবনে যায়! কাম সাইরা হাত পোয় না। ওই হাত দিয়াঐ গাহেকরে চা মিষ্টি দেয়।
বসির চিন্তিত গলায় বলল, এইডা আকবর আপনেরে ফাপড়ে হালানের লেইগা কইতাছে সেন্টুদাদা। তয় ভজারে রাখন আপনের ঠিক অইবো না। একবার এই বদলাম রইট্টা গেলে আপনের দোকানে আর গাহেক আইবো না। চা মিষ্টির দোকান পাকছাপ (পরিষ্কার অর্থে) না থাকলে ওই দোকান চলবো না।
