না না, বিবেকের এই অপবাদ ফইজু নিবে না। ঘা
ড় থেকে গামছা নামিয়ে পেটে টাইট করে একটা বাঁধ দিল ফইজু। এভাবে বাধলে খিদা টের পাওয়া যায় না।
.
খান গাছিদাদা, খান।
সেন্টুর চা-মিষ্টির দোকানঘরটা পাটাতন করা। ভাঙনের দিককার ঘর, পাটাতন ছাড়া উপায় কী! ঘরের বয়স হয়েছে অনেক। রোদবৃষ্টিতে চাল বেড়ার দশা তেমন কাহিল করতে পারে নাই, ভিতরকার দশা ভালরকম কাহিল। মানুষের পাড়ায় পাড়ায় আলগা হয়েছে পাটাতনের কাঠ। চায়ের পানি পড়ে, মিষ্টির সিরা পড়ে পচনও ধরেছে কাঠে। হাঁটাচলায় মচর মচর শব্দ হয়। সেন্টু চেষ্টা করে শব্দ বাঁচিয়ে হাঁটতে। কাস্টমারদের জাত হয় বারোপদের। এইটুকু শব্দেও বিরক্ত হয় কেউ কেউ। জাতপাতের হিসাব না রেখেই হয়তো সেন্টুকে একটা ধমক দিল। কাজটা ভজা করলে ভজাকেই দিল ধমকটা। ওই মিয়া, এমুন আওজ করো ক্যা? আস্তে হাঁটতে পারো না!
ভজা বেখেয়ালি টাইপের মানুষ। ধমক ধমক খেয়েও অনেক কথাই মনে রাখে না। সেন্টুর খেয়াল সবদিকে। সে খেয়াল রাখে।
আজ খেয়ালটা সেন্টুর নাই। পায়ে মচর মচর শব্দ তুলে পিরিচে দুইখান করে বড় সাইজের রসগোল্লা এইমাত্র দবির আর ল্যাংড়া বসিরের টেবিলে এনে রাখল সে। সেন্ট খুবই হাসিখুশি ধরনের মানুষ। হাসিহাসিমুখে কাস্টমারদের লগে গল্পগুজব করতে ভালবাসে। আজ মুখে হাসি নাই। মাঝবয়সি মুখোন ব্যাজার।
সেন্টুর ব্যাজার মুখ খেয়াল করল বসির। দবিরকে মিষ্টি খাওয়ার কথা বলেই নিজের মিষ্টিতে চামচ চালাল। বড় এক টুকরা মিষ্টি কেটে মুখে দিল। কেসটা কী সেন্টুদাদা?
মিষ্টির আলমারির পাশে সেন্টুর বসার ব্যবস্থা। ততক্ষণে সে গিয়া বসেও পড়ছে। ব্যাজার মুখে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। মাওয়ার বাজারের চারপাশে তখন পদ্মার ঘোলা পানির মতন দিনশেষের আলো।
বসিরের কথা শুনে তার দিকে তাকাল সেন্টু। ব্যাজার মুখ হাসিহাসি করার চেষ্টা করল। কীয়ের কেস?
বসির রসগোল্লা চাবাতে চাবাতে বলল, আপনের? ইহ জিন্দেগিতে তো আপনের এমুন। ব্যাজার মুখ দেহি নাই। আইজ মুখ ব্যাজার ক্যা?
দবির এসবের কিছুই খেয়াল করে নাই। সে আছে তার নিজের উত্তেজনায়। বাড়ি থেকে এতদূর নিয়া আসলো বসির তয় কাজের কথাটা বলছেই না। মেদিনীমণ্ডলের চক পাড়ি দিয়া, এতটাক্ষণ ধরে এতটা পথ এল, আবোল তাবোল কত কথা, আসল কথার খবর। নাই। তখন নাহয় ফইজু ছিল নাওয়ে, এজন্য নাহয় বলে নাই। মালেক দরবেশের বাড়ির ওইদিকে কোষানাও নিয়া বইসা রইল ফইজু, সে আর বসির হেঁটে এল এতটা পথ, তাও কিছু বলল না। মাওয়ার বাজারে এসে ঢুকল সেন্টুর দোকানে, রসগোল্লার অর্ডার দিল। দবিরকে খাওয়ার কথা বলে নিজে খেতে খেতে এখন দেখি কথা বলছে সেন্টুর লগে! সেন্টুর হাসিমুখ, ব্যাজার মুখ নিয়া চিন্তিত। শালার পো শালায় শুরু করল কী? আসল কথা কয় না ক্যা?
ল্যাংড়া বসিরের কায়দায় চামচে মিষ্টি কেটে মুখে দিল দবির। বসিরের লগে ভাও (ভাব) দিয়েই চলতে হবে তাকে। ভিতরের উত্তেজনা কিছুতেই প্রকাশ করা যাবে না। এতদূর। বসির যখন তাকে নিয়াই আসছে, জেবের পয়সা খরচা করে সিগ্রেট মিষ্টি খাওয়াচ্ছে, খানিকপর খাওয়াবে চা, আসল কথা সে বলবেই। না বললে দবিরের লোকসান কিছু নাই, বসিরের পুরাটাই লোকসান। এইজন্য দবিরও বসিরের পথটাই ধরল। সেন্টুর মুখের দিকে তাকাল। বসিরের লগে গলা মিলায়া বলল, হ, ঘটনা কী রে দাদা? মুখহান এমুন ব্যাজার। ক্যা?
সেন্টু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর কইয়েন না। আমগো লাহান হিন্দুরা এই দেশে থাকতেই পারবো না।
দবির কথা বলবার আগেই বসির বলল, এইডা কেমুন কথা কইলেন সেন্টুদাদা? আমগো বিক্রমপুরে তো হিন্দু মোসলমানে গলা প্যাঁচাইয়া থাকে। বিরাট খাতির দুই জাতে। কেঐর লগে কেঐর শৌতরামি (শত্রুতা) নাই।
উপরে উপরে নাই, ভিতরে ভিতরে আছ।
কন কী?
হ। ওইডা বাইরে থিকা দেহা যায় না। আপনেরা কেঐ বাইরে থিকা বুজতেও পারবেন না। বুজি খালি আমরা, হিন্দুরা।
দবির বলল, বুজাইয়া ইকটু কও তো দাদা।
বসিরও গলা মিলাল। হ হ কন সেন্টুদাদা। না কইলে বুজুম কেমতে!
সেন্টু আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। না থাউক। কইয়া লাব কী?
বসির বলল, লাব আছে দাদা। দুই পদের লাব আছে। একটা লাব অইলো, মনের মইদ্যে কথা চাইল্পা রাখলে কষ্ট বাড়ে। কইয়া হালাইলে হেই কষ্ট কমে। আরেকখান লাব অইলো, ঘটনা জানা থাকলে এই হগল লইয়া বড় জাগায় কথা কওন যায়।
কেমুন বড় জাগা?
এই ধরেন নেতাগো লগে। ঘটকালি করনের সুবিদা বিরাট। বেক মাইনষেই আমারে খাতিল (খাতির) করে। বিক্রমপুরের বেক নেতাঐ আমারে চিনে। দরকার অইলে আপনেগো লইয়া নেতাগো লগে আমি কথা কমু। এইডা হিন্দু-মোসলমান বেকতেরঐ দেশ। আমার যেমুন এই দেশ, আপনেরও তেমুন এই দেশ।
দবির বলল, লেইজ্য কথা। কও দাদা, কইয়া ফালাও। আর আমগো উপরে তুমি বিশ্বাস রাখতে পারো। আমগো পেট থিকা কোনওদিনও কথা বাইর অইবো না। তোমার কোনও ক্ষতি অইবো না।
তার বাদেও ভর করে দাদা।
বসির বলল, কোনও ডর নাই। গ্যারান্টি দিলাম।
দোনোমোনো করে সেন্টু। না থাউক।
এবার বসির মুখ গোমড়া করল। তয় আর কী! আপনে যদি না কইতে চান কইয়েন না। আপনের কষ্ট লইয়া আপনে থাকেন। আমগো কী?
বসিরের পক্ষ নিয়া দবির বলল, কইতে পারতা সেন্টু। কইলে তোমার উপকার ছাড়া অপকার অইতো না। বসির খুবঐ ভাল মানুষ। আমিও মানুষ খারাপ না। দেশগেরামের কেঐ আমগো নামে বদলাম কইতে পারবো না।
