আশুরা বউ হয়ে আসার পর একটু একটু বোঝা গেল।
দেশগ্রামে বউ-শাশুড়ির মিলমিশ বলতে গেলে দেখাই যায় না। দেখা গেল শাশুড়িরা দিনরাত বকাবাজি করছে বউকে। পান থেকে চুন খসলে চৌদ্দগুষ্ঠির খবর নিয়া নিচ্ছে। পয়লা পয়লা মুখ বুজে কিছুদিন হয়তো এসব সহ্য করল বউ। তারপর সেও হয়ে উঠল দজ্জাল। শাশুড়ি একটা বললে সে বলে তিনটা।
বদুর বিয়ার আগে এই নিয়া খুবই চিন্তিত ছিল ফইজু। হায় হায় রে, খাতুনের যা স্বভাব, বউটা বাড়িতে টিকতে পারবো কিনা আল্লাই জানে! খাতুনের অত্যাচারে বাইধ্য অইয়া বউ লইয়া না ভিন্ন অইয়া যায় বদু।
আল্লার রহমত। হল তার উলটা। একমাত্র আশুরার লগেই খাতুনের সম্পর্ক হল প্রকৃত অর্থেই স্নেহমমতার। চরিত্রের লগে বেমানান আচরণ ছেলের বউর লগে পয়লা দিন থেকেই। শুরু করল খাতুন। পারলে আশুরাকে কোলে নিয়া বইসা থাকে। স্বামী আর তিন পুত্র কারও দিকে ফিরে তাকায় না, জামাইবাড়িতে মেয়েরা খেয়ে আছে না না-খেয়ে, নাতিনাতকুড়দের অসুখবিসুখ হল কি না, কে ভাবে ওসব কথা! চোখ সব সময় শুধু বউর দিকে। চিন্তা সব সময় শুধু বউ নিয়া।
আজব কারবার!
আজ দুপুরে কারবার যেটা হল সেটা অতি লজ্জার। সংসার স্বচ্ছল হওয়ার পর ফইজু গেছে বাড়তি মানুষ হয়ে। ছেলেরা তাকে তেমন পাত্তা দেয় না, খাতুন তো দেয়ই না। আগে যা-ও দুয়েকটা কথা বলার ক্ষমতা সংসারে ফইজুর ছিল, এখন সেটা একদমই নাই। আগে রুজি রোজগার করত বলে দাম একটু ছিল সংসারে। এখন রুজি রোজগার নাই, বয়স হয়েছে, খাতুন তাকে কেন পাত্তা দিবে। বর্ষার শুরু থেকেই ফইজু ভাবছিল, না, এইভাবে বাড়ির উঠানে বসে দিনগুলি পার করে দেওয়ার অর্থ নাই। কাজকাম কিছু একটা জোটাতে পারলে ভাল। কাজে টাকাপয়সা না পাওয়া যাক, পেটেভাতেও যদি কোনও বাড়িতে কাজ জোটে, মন্দ কী! সারাদিন বাড়ির বাইরে থাকা হল, তিনবেলার খাবারও জুটল। খাতুনের দজ্জাল চেহারা দেখতে হল না।
এই ভেবে এদিক ওদিক কাজের চেষ্টা ফইজু করেছে। জোটেনি কোথাও। কাল হঠাৎ করেই কাজির পাগলা বাজারে ল্যাংড়া বসিরের লগে দেখা। কথায় কথায় সে বলল তার কোষানাওয়ের একজন মাঝি দরকার। না না, নৌকা তেমন বাইতে হবে না। দিনে একবার দুইবার এদিক ওদিক যাওয়াআসা। কাজ তেমন ভারী না। তিনবেলা খাওয়াদাওয়ার লগে দুই-চারটা টাকাও বসির দিবে। তবে কত দিবে সেটার ঠিক নাই।
ফইজু রাজি। সে তো শুধু পেটেভাতের কাজ পেলেই রাজি।
আজ দুপুরের পর যাওয়ার কথা বসিরের বাড়ি। দুপুরের পর বাড়ি থেকে বের হবে সে। পুরাপুরি কাজে লাগতে হবে পরদিন থেকে। আজকের দিনটা ফাও। বাড়ি থেকেই দুপুরের ভাত খেয়ে যেতে হবে।
ফইজু ওই নিয়া ভাবে নাই। একটা দিন ফাও হলে অসুবিধা কী? একটা দিন বাড়ির ভাত খেয়ে কাজে গেলে অসুবিধা কী? খাতুনকে কাজের কথা বলেছে, সে পাত্তা দেয় নাই।
দুপুরের দিকে ফইজু একটু তাড়াহুড়াই করছিল।
ভাত তরকারি রান্না হয়ে গেছে। এখন খাতুন শুধু বেড়ে দিলেই খেয়ে ল্যাংড়া বসিরের বাড়ির দিকে মেলা দিতে পারে। খানিক আগে বাড়ির ঘাটে ডুব দিয়া আসছে। গামছায়। শরীর মাথা মুছতে মুছতে খাতুনকে বলল, দেও বদুর মা, ভাত দেও। খাইয়া মেলা দেই। রান্নাঘরের সামনে জলচৌকি নিয়া বসে আছে আশুরা। সেদিকে ফিরেও তাকাল না খাতুন। এমন একটা মুখ খিচানি দিল! লগে যা তা ভাষায় গালাগাল। ওই গোলামের পো গোলাম, আমি তর বান্দি যে যা কবি ওইডাঐ লগে লগে করন লাগবো? যা ভাত পাবি না। ভাত দিমু না তরে। যা কইলাম, যা। নাইলে ফিরি দা (পিঁড়ি দিয়ে) পিডাইয়া হাড্ডিগুড়ি ভাইঙ্গা হালামু!
এত নিরীহ ভঙ্গিতে ভাত চাওয়ার পর এভাবে তেড়ে উঠতে পারে এতকালের পুরনো স্ত্রী, তাও ছেলের বউর সামনে, এতটা ফইজু ভাবে নাই। সে একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে গেল। বউ সামনে থাকায় লজ্জাও পেল খুব। দুয়েকটা কথা যে খাতুনকে বলবে, বলার সাহস হল না। একটা বললে পাঁচটা বলবে খাতুন। সত্যি সত্যি পিঁড়ি দিয়া পিটাতে শুরু করতে পারে। তখন বউর সামনে ইজ্জত আর থাকবেই না। তারচেয়ে চুপ করে যাওয়া ভাল। না খেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়া ভাল।
রান্নাঘর থেকে মাথা নিচু করে বের হয়ে আসার সময় ফইজু টের পেল তার খুব কান্না পাচ্ছে। শাশুড়ির কারবারটা দেখতে পেয়েছিল আশুরা, কথাবার্তা তো শুনেছেই। শ্বশুর লোকটার জন্য হয়তো মায়া হয়েছে তার। মায়াবী একটা মুখ করে ফইজুর দিকে তাকিয়ে। ছিল সে। ফইজু তাকাতে পারে নাই তার দিকে। গামছা কাঁধে ফেলে যত দ্রুত সম্ভব আশুরার চোখের সামনে থেকে সরে যেতে চেয়েছিল।
এখন এই শেষ বিকালে কোষানাওয়ের আগার চারোটে বসে মালেক দরবেশের বাড়ির শসা ঝকার দিকে তাকিয়ে নিজ সংসারের এই চেহারা দেখে খিদার কষ্ট ভুলতে চাইছিল ফইজু। পেটের ভিতর খিদা রয়ে গেছে খিদার মতোই। সেই অর্ধেক জবাই করা মোরগ সমানে দাপড়াচ্ছে। এই আজাবের হাত থেকে বাঁচার জন্য যাবে নাকি ফইজু দুই-তিনটা শসা চুরি করতে! ওদিকটায় লোকজনের চিহ্নমাত্র নাই। কোষানাওখান নিঃশব্দে আঁকার তলায় ঢুকিয়ে দুই-তিনটা কেন, পুরা ঝাঁকা খালি করে দিলেও কেউ উদিস পাবে না।
যাবে নাকি ফইজ?
না, আর যাই করুক চুরিটা ফইজু করবে না। খিদার কষ্টে মরে গেলে মরে যাবে, তাও চুরি করবে না। এত লম্বা জীবনে কখনও যা করে নাই, মরণ ঘনিয়ে আসা দিনে কেন করবে সেই কাজ। কেউ দেখুক না দেখুক, ওই যে মাথার উপর বসে আছেন একজন, দিনদুনিয়ার মালিক, তিনি তো দেখবেন। আর ফইজুর মনের ভিতরে বসে আছে বিবেক নামের যে আরেকজন সে তো কথায় কথায় খোটা দিবে ফইজুকে। ওই ফইজু, তুই তো চোর। গিরস্তবাড়ির আঁকা থিকা শোসা চুরি কইরা খাইছিলি না? ছি ছি, তুই চোর? চোরা ফইজু?
