এতকিছু ভেবেও পেটের খিদাটা সামাল দিতে পারছে না ফইজু। পেটের ভিতর কোন অদৃশ্য শত্রু যেন কায়দা করে ছাইড়া দিছে পুরাপুরি জবাই না করা একখান ড্যাকরা মোরগ। সেই মোরগ মরণযন্ত্রণায় দাপড়া দাপড়ি করছে পেটে। কখন মরবে, কখন মরে। শান্ত হবে, কে জানে!
এরকমই তো হওয়ার কথা।
সেই কোন সকালে একমুঠ মুড়ি খেয়েছিল ফইজু। লগে ছোট সাইজের দুইখান মিষ্টি আলুসিদ্ধ। ওইটুকু খাবার কতক্ষণ থাকে এই বয়সি মানুষের পেটে?
বাড়িতে অবশ্য খাওনদাওনের আকাল নাই। জের ভরা মুড়ি, ছালা ভরা মিষ্টি আলু। চাউল ডাইল তরিতরকারিরও কমতি নাই। তিন পোলাই জুয়ান মর্দ অইছে। কামাই রুজি করে তিনজনেই। বড়জনের নাম বদু। বদু অইলো কেরায়া নাওয়ের মাঝি। নিজের নাও নিজে বায়। দেশগ্রামের পয়সাআলা মানুষজন লইয়া, গিরস্তবাড়ির বউঝি লইয়া এই গ্রামে ওই গ্রামে যায় নাও বাইয়া। দিনে একদেশশো টেকা রুজি। গেল বচ্ছর বিয়া করছে। বউর নাম আশুরা। কবুতরখোলার মাইয়া। সাত মাইসা পেট লইয়া আশুরা অহন ফইজুর বাড়ির উঠানে হাঁটাচলা করে। শইল্লের তুলনায় মাইয়াটার পেট অইয়া গেছে বেশি বড়। মুখ মিহি চাইলে মায়া লাগে। মনে অয় বিরাট আজাবের মইদ্যে আছে। দুই-চাইর দিনের মইদ্যে আহুজ পড়লে এই আজাব থিকা রেহাই পাইবো।
পেটের ভারে সংসারের কামকাইজ তেমুন করতে পারে না আশুরা। তারপরও দুই চাইরখান কামে হাত লাগাতে যায়। আর ওইটা দেখলেই বদুর মায় যায় চেইত্তা। হায় হায় বউ, এইডা তুমি কী করতাছো? তোমার কাম করনের কাম কী? আমি আছি না? আমিঐ করুম নে? তুমি থোও। যাও ঘরে গিয়া বইয়া থাকো গা। কিছু করন লাগবো না! এই শইল লইয়া কাম করন বহুত কষ্টের। পাঁচহান মাইয়া আর চাইরহান পোলা হইছে আমার। আমি জানি পোলাপান অওয়ান কত কষ্টের! এত কষ্ট করনের পরও চাইরটা পোলাপান বাঁচাইতে পারি নাই। আহুজ ঘরে মরলো একহান পোলা। তিনহান মাইয়া মরলো কোনও ছয় মাসে, কোনও এক দেড় বচ্ছরে। পোলাপান অওয়ানের যেমুন কষ্ট, মইরা গেলে কষ্ট তার থিকা হাজার গুণ। যাও, ঘরে যাও।
বদুর মায়ের নাম খাতুন।
উঠানের কোণে বসে তামাক টানতে টানতে খাতুনের এইসব কথা শোনে ফইজু আর অবাক হয়। খুবঐ খাড়েদজ্জাল (অতিদজ্জাল) মানুষ অইতাছে খাতুন। বিয়ার পর থিকা জানডা ফইজুর তেজপাতা কইরা ছাড়ছে। ফইজু যেমন তারে হাড়ে ডরায়, পোলা তিনটাও ডরায় যমের লাহান। মাইয়া দুইডার নাম ভানু আর আলতা। জামাই বাড়িত থাকে বচ্ছরের পর বচ্ছর। বচ্ছরে একবার বাপের বাড়িতে নাইওর আইলে মা’র ডরে কুঁকড়াইয়া থাকে, দুই-চাইরদিনের বেশি থাকতে চায় না। নাতি নাতকুড়ডিরে বেদম আদর করে খাতুন। তাও থাকতে চায় না তারা।
ফইজুর মাজারো পোলার নাম কুতুব। সেইটা একটু পাজি পাজরা। কথায় কথায় ঘাড় ত্যাড়া করে। বাপ রে আর বড়ভাই রে মানেই না। মাছের কারবার করে। বিয়ান্নারাইতে উইঠা দিঘলি বাজারে যায় কোনওদিন, মাওয়ার বাজারে যায় কোনওদিন। তিন-চাইর হাজার টেকা পুঞ্জি (পুঁজি)। ওই টেকা দিয়া আড়ত থিকা মাছ কিনে। কিনে পাইকারি বেচে, খুচরা বেচে। ঘণ্টা-দুই ঘণ্টার কারবার। কোনও-কোনওদিন তিন-চাইরশো টেকাও রুজি করে। আবার কোনও কোনওদিন এক-দুইশো টেকা লোসখানও দেয়। লোসখান মোসখান পাত্তা দেয় না কুতুব। একদিন লোসখান অইছে কী অইছে, লোসখানের ডবল লাব করুম নে কাইল। মাছের কারবার এমুন। আইজ লোসখান কাইল লাব।
দুইন্নাইর কেঐরে ডরায় না কুতুব। ডরায় খালি খাতুনরে। মা’র সামনে চোখ তুইলা চায় না। মা’র গলার আওজে মেকুর (বিড়াল) অইয়া যায়।
আর ছোট পোলাডা, মাবুদ, মাবুদ আগে কাম করতো ভানুর জামাইর লগে। ভানুর জামাই কাটা কাপড়ের (রেডিমেড গার্মেন্টস) কারবার করে। ঢাকা থিকা মাল আইন্না দেশগ্রামের হাটবাজারে বিক্রি করে। মাবুদ থাকতো তার লগে লগে। মাস শেষে কয়েকটা টেকা তারে ধরাইয়া দিতো ভানুর জামাই। জামাইর নাম জামাল। খুবঐ কিরপিন (কৃপণ) পদের মানুষ। মাবুদ ত্যাক্ত হইয়া দুলাভাইর সঙ্গ ছাড়ছে। অহন কুতুবের লগে থাইকা মাছের কারবার ধরনের ফিকির করতাছে।
মাবুদ অইতাছে খাতুনের নাড়িঝাড়া পোলা। অতি আদরের। সেও মা’রে ডরায় যমের লাহান। সংসারের একটা মানুষরে ছাইড়া কথা কয় না খাতুন। আর সে যেইটা কইবো ওইটাঐ হোনন লাগবো। না হোনলে খবর আছে। হাতের সামনে যা পাইবো ওইডা দিয়াই পিডাইবো। পোলা মাইয়ারা যে কত পিডান খাইছে তার হাতে। স্বামী হইয়া ফইজুও খাইছে দুই-চাইরবার। তয় বউর হাতে মাইর খাওনের কথা কেঐরে কইতে পারে নাই। বিরাট শরমের কথা! এই কথা কেঐরে কওন যায়নি? হোনলে মাইনষে হাসবো না?
সংসারের প্রতিটা মানুষকে কঠিন শাসনে রাখে খাতুন। ফইজুর লগে সংসার করতে আসার পর থেকেই এই অবস্থা তার। তখন ফইজু গিরস্তালি করে। দেড়কানির মতন জমিন ছিল। আমন আউশ চাষ করে কোনওরকমে চলত দিন। বর্ষাকালে মাঝির কাজটাও করত। বছর বছর পোলাপান হত, সংসার চালাত অতিকষ্টে। তবু দিনে দিনে চেহারা ঘুরল সংসারের। মরে বেঁচে ছেলেমেয়ে যে কয়জন রইল, প্রত্যেকেরই কোনও না কোনও গতি হল। ওই যে কথায় আছে না, মুখ দিছেন যিনি, আহার দিবেন তিনি। তিনি আহার দিছেন। মেয়ে দুইটার বিয়া হল মোটামুটি ভাল ঘরেই। ছেলেগুলি দাঁড়িয়ে গেল। বদলাল সবই, শুধু খাতুন বদলাল না। স্বভাব চরিত্র আগের মতনই। বুড়া হতে চলল, তবু ত্যাজ সেই আগের মতনই। দজ্জালি কমে নাই। স্নেহ মায়া বলতে কিছু যে তার মধ্যে আছে। বোঝাই যায় না।
