এরকম দুই-তিনবার। হামিদার তাড়া খেয়ে বড়ঘরের পশ্চিম দিক দিয়া ঘরের ছাইছে চলে যায় কুকুরটা, হামিদাও যায় পিছন পিছন। কুকুর পুবদিক দিয়া বের হয়ে আসে। হামিদা আবার আগের কায়দায় দৌড়ে যায়, কুকুর পশ্চিম দিক দিয়া ঢুকে পুবদিক দিয়া বের হয়ে আসে। ভাল রকমের একটা চরকিবাজি।
কুকুরের লগে মায়ের এই চরকিবাজি দেখে উঠানে দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হাসতে লাগল নূরজাহান। মহা বিরক্ত হয়ে নূরজাহানকে একটা ধমক দিল হামিদা। ওই মাগি, ভ্যাটকাবি (হাসবি) না।
তারপরই হাতের চলা কুকুরটার দিকে ছুঁড়ে মারল। কুকুরের গায়ে সেটা লাগল না। ঘরের ছাইছে রাখা ভাঙাচোরা হাঁস মুরগির খোয়াড়টার তলার দিকে চলে গেল।
নূরজাহান হাসতে হাসতে বলল, অইছে মা। থোও তো। কুত্তাডা যহন যাইতে চায় না, থাউক আমগো বাইত্তে। বাইত্তে কুত্তা থাকলে হিয়াল খাডাস আহে না। তুমি ইচ্ছা করলে আবার হাঁস মুরগি পালতে পারবা।
নূরজাহানের কথা শুনে হামিদা ভুরু কুঁচকাল। কথা বলল না।
কুকুরটা তখন ছনের ঘরের ওদিকটায় গিয়া এমন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে, যেন হামিদা তাড়া করলেই ছুট দেবে। বড়ঘরের চারপাশে যেভাবে ঘুরপাক খেয়েছে ওই একই কায়দায় ছনের ঘরের চারদিকেও ঘুরপাক খাবে। হামিদার হাতে চলা নাই দেখে ভয়টা যেন একটু কমেছে তার। কাজলমাখা চোখ স্থির করে তাকিয়ে আছে মা-মেয়ের দিকে।
নূরজাহান বলল, ভাল জাতের কুত্তা মনে অইতাছে। মরদা কুত্তা। মাইগ্না (মাদি) অইলে বিয়ান বুয়ানের (বাচ্চা দেয়া অর্থে) ঝামেলা আছিলো। মরদা কুত্তার ঝামেলা নাই। এমুন দৌড়ানি দেওনের পরও যহন যাইতে চাইতাছে না, থাউক বাইত্তে।
হামিদা তখনও ভুরু দুইখানা আগের মতন কুঁচকে রেখেছে। এটা হচ্ছে তার কোনও কথা মনে ধরার লক্ষণ। ব্যাপারটা জানে নূরজাহান। সুতরাং মায়ের অবস্থা দেখে সে বুঝে গেল কুকুরটা বাড়িতে থাকলে তার এখন আর কোনও আপত্তি নাই।
ঠোঁটে চুকচুক শব্দ করে কুকুরটাকে তারপর ডাকল নূরজাহান। আয় তু তু তু। আয়, আয়।
এই ডাকের অর্থ বুঝল কুকুরটা। খানিক আগের ভয়ডর ভুলে বেশ একটা আমুদে ভঙ্গিতে নূরজাহানের দিকে আগায়া আসলো। লেজটা পুরপুর করে নড়ছে।
.
দুইন্নাইতে এত ভাল ভাল জিনিস দিয়ে আল্লায়, মাইনষের প্যাডে খিদাডা দিছে ক্যা? খিদার থিকা বদজিনিস আর কিছু নাই। এই জিনিসটা কীরলেইগা (কী জন্য) হান্দাইয়া দিছে প্যাডের ভিতরে? দুইন্নাইর কায়কারবার বেক চলতাছে খিদার লেইগা। চুরি ধারামি, শয়তানি বানরামি (বাঁদরামি) খুন ডাকাতি বেক কিছুর পিছে ওই হালার খিদা। আমি গরিব মানুষ ঠিকঐ, তয় জিন্দেগিতে চুরি ধাওরামি করি নাই। খিদার চোডে আমার দিহি অহন। চুরি করতে ইচ্ছা করতাছে! ওই যে মালেক দরবেশের বাড়ির শোসার (শসার) ঝকাডা দেহা যাইতাছে, আঁকার ফাঁক দিয়া ঝোলতাছে কইচ্চা কউচ্চা (সবুজ সবুজ) শোসা, খিদার চোডে আমার দিহি ইচ্ছা করতাছে ওইমিহি যাইতে! গিয়া দুই-তিনহান শোসা ছিড়া লইয়ামুনি? ওইপদের দুই-তিনহান শোসা খাইলে খিদার কারবার খতম। রাইত্রে ভাত পাই না পাই, অসুবিদা নাই। যামুনি ঝাঁকা মিহি?
কোষানাওয়ের আগার চারোটে বসে শসা ঝকার দিকে তাকিয়ে আছে ফইজু। বাড়ির পশ্চিম দিককার ভাঙনে বিশাল আঁকা। এতটা দূর থেকেও দেখা যায় কঁকার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলছে বিঘত পরিমাণ কচি কচি শসা। আঁকার তলায় স্থির হয়ে আছে বর্ষার পানি। শেষ বিকালের রোদ উঠে গেছে গিরস্তবাড়ির ঘরদুয়ারের চালে আর গাছপালার মাথার দিকে। আবছা মতন একটা ছায়া জমতে শুরু করেছে শসা আঁকার তলায়। বর্ষার পানি সেই ছায়ায়ই কালো হয়েছে।
তবে আকাশ বেশ পরিষ্কার।
মেঘের চিহ্নমাত্র নাই। প্রকৃতি একেবারেই ধোয়া পাকলা। গিরস্তবাড়ির লেপাপোছা উঠানের মতন তকতকা চারদিক। এই প্রকৃতি অবশ্য বদলে যেতে পারে পলকে। শ্রাবণ দিনের বিশ্বাস নাই। কোন ফাঁকে কোথা দিয়া আকাশের এককোণ থেকে আরেক কোণে উড়ে আসবে কাউয়ার (কাক) মতো মেঘ। হাসতে থাকা প্রকৃতি হঠাৎ করেই ম্লান করবে মুখ। তারপর কথা নাই বার্তা নাই, কুত্তা বিলাইয়ের মতন বৃষ্টি। চোখের পলকে কাদায় পানিতে প্যাঁচপ্যাচা পায়ের তলার মাটি। শেষ বিকালেই রাত্র হয়ে যাবে।
শসা ঝকার উপর দিয়া ফইজু একবার আকাশের দিকে তাকাল। এই একখান জিনিসের লাহান জিনিস দিছে আল্লায়। আশমান। কী সোন্দর জিনিসখান। দুইন্নাইয়ের মাথার উপরে নীল আর সাদা রঙ্গের চাল। কোনও বেড়াবোড়া নাই, খালি চাল। আর একখান ভাল জিনিস অইলো হাওয়া বাতাস। এই যে শাওন মাসের বিয়ালে পদ্মার ওইমিহি থিকা ঝিরঝির কইরা আইতাছে খল্লামাছের মাথার লাহান মুলাম একহান বাতাস, বাতাসটার কোনও তুলনা দুইন্নাইতে আছে! রইদ কী সোন্দর, চান্দের আলো কী সোন্দর! গাছের পাতা, ফুল পাখি, দুবলা ভরা কউচ্চা রঙ্গের মাঠ আর পাকাধানে ভরা সোনার বরণ চক, আহা কত সোন্দর জিনিস। বাইষ্যাকালের বিষ্টিও তো কত সোন্দর, শীতের দিনের বিয়ালে যহন চাইর মিহি থিকা দেশগেরামের দিকে আস্তে আস্তে আহে খুয়া (কুয়াশা)–আহা, হেইডাও তো কত সোন্দর। খরালিকালের চাঁদনি রাইতে তারায় তারায় ভরা আকাশখান, হেই আকাশের কি কোনও তুলনা আছে? বাড়ির উডানে বইয়া রাইত দোফরে আকাশ মিহি চাইলে একহান। কথাই খালি মনে অয়, এত সোন্দর দুইন্নাই ছাইড়া একদিন চইলা যাওন লাগবো। হায় হায় এতকিছুর মইদ্যে ওই বদজিনিসখান, খিদাঁড়া ক্যান দিছে আল্লায়! যদি খিদা না থাকতো তয় তো কামকাইজ কিছু করন লাগতো না। খিদার আগুনে পোড়া পেড লইয়া কাজির পাগলা থিকা নাও বাইয়া ফইজুর পয়লা আহন লাগতো না মেদিনমণ্ডল। দবির গাছির বাড়িত থিকা আহন লাগতো না মাওয়ার বাজারে। শাওন মাসের এত সোন্দর বিয়ালডা বাড়ির উডানে বইয়া আশমানের মিহি চাইয়া কাটাইয়া দেওন যাইতো।
