একটার পিছন পিছন ছুটছে আরেকটা। ওই শালিকটা চিনতে পারল নূরজাহান। আষাঢ় মাসের দিকে হঠাৎ করেই বড় আমগাছটার খোড়ল থেকে লাফিয়ে পড়েছিল নীচে। শালিক পাখি বাসা বেঁধেছিল খোড়লে। ছানা ফুটেছে ওই একটাই। মাটিতে পড়ে একটুখানি উড়ে যায় শালিকছানা, আবার নামে মাটিতে। ওড়ার চেয়ে লাফায় বেশি। আর পাখা দুইখান। ছড়ায়া দিয়া অবিরাম কাঁপায়, হলুদ ঠোঁটের ভিতর গোলাপি রঙের ঠোঁট ফাঁক করে মায়ের মুখের কাছে চি চি করে। খাওন দেও মা, খাওন দেও।
সেই ছানাটা কবে এত বড় হয়ে গেছে। এখন কোনটা মা কোনটা ছানা বোঝাই যায় না। দুটিতেই দিনের আলো নিভে আসার লগে লগে রাতের খাদ্য জোগাড়ে ব্যস্ত। একটা দইকুলি (দোয়েল) লাফাচ্ছিল অদূরে। নূরজাহানকে দেখে ফুরুৎ করে উড়ে গেল পুকুরের ওপারকার ডুমুর ঝোপে। একটা কাক অনেকক্ষণ ধরে কা কা করছে ছনের ঘরের চালে বসে। দিনের আলো একটু একটু করে ফুরাচ্ছে। এতক্ষুনে মনে অয় মাওয়ার বাজারে বইয়া চা-সিকরেট খাইতে খাইতে বাবার কাছে ঘটকায় আমার সমন্দের কথা কইয়া হালাইছে।
নূরজাহানের লেইগা কার লগে সমন্দ দেখতাছে ঘটকায়? কোন গেরামের পোলায় পছন্দ করলো নূরজাহানরে? এতডু মাইয়ারে পছন্দ করলো কোন পদের পোলায়?
বিয়ার কথা যতবার ভাবছে ততবারই গোপন এক লজ্জায় মুখ নিচা হয়ে যাচ্ছে। নূরজাহানের। যতক্ষণ ঘরে ছিল ততক্ষণ তাকাতে পারে নাই মায়ের দিকে, এখন যেন তাকাতে পারছে না শালিক পাখি আর গাছপালার দিকে। মা এখনও বসে আছে বড়ঘরের দুয়ারে। সেদিকটায় তাকাতেই পারছে না নূরজাহান। এইডা কেমুন কথা? বিয়ার সমন্দ আইছে না নাআইছে, খালি ঘটকায় আইছে বাইত্তে হেতেই দেহি শরমে মরতাছি আমি! যেদিন সত্যঐ বিয়া অইবো হেদিন কী করুম? বাসরঘরে জামাই যহন…
নূরজাহান যখন এসব ভাবছে বাঁশঝাড়ের ওদিককার ধইনচা খেতে তখন কীরকম টাবুর টুবুর একটা শব্দ। প্রথমে শব্দটা খেয়াল করে নাই সে, যখন আস্তে ধীরে বাড়ছে শব্দ, বাড়ির দিকে আসছে তখনই যেন খেয়াল করল। এমুন আওজ করে কীয়ে? গুইসাপে নি? না গুইসাপে তো এত জোরে আওজ করে না! ঘটনা কী?
বাঁশঝাড়ের দক্ষিণ দিকটায় গেছে নূরজাহান, দেখে ধইনচা খেতের ভিতর থেকে একটা কুকুর সাঁতরে আসছে। দেশগ্রামের কুকুর পরিষ্কার পানিতে সাঁতরালে এমন শব্দ হয় না। খেতখোলার ভিতর দিয়া সাঁতরে এলে শব্দটা হয়। ঘন ধইনচা খেতের ফাঁকফোকর দিয়া সাঁতরাবার সময় ধইনচার ডালপালা আর শিকড়বাকড়ে শরীর মাথা আর চার পা আটকে যাচ্ছিল বলেই টাবুর টুবুর শব্দ হচ্ছিল। নূরজাহান যখন ওদিকটায় গেছে ততক্ষণে ডাঙায় উঠে গেছে কুকুরটা। এখন পর পর দুইটা ঝাড়া দিয়া শরীর থেকে পানির শেষবিন্দু তরি খসায়া দিল। ধইনচা খেত আর গাছপালার আড়াল থেকে দিনশেষের এক টুকরা আলো এসে পড়েছে কুকুরটার গায়, তাতে খুব সুন্দর লাগছে। জীবটাকে। পাকা খাজুরের মতন রং গায়ের, চোখ দুইটা যেন গাঢ় কাজল টানা। মুখের কাছটা সাদা কালোয় মিশানো। লেজটা হলুদ সাদা। তলপেটটাও সাদা হলুদে মিশানেনা। কুকুরদা মরদা (মর্দা, পুরুষ)।
এই কুত্তা আমগো বাইত্তে আইলো কই থিকা?
কোন বাড়ির কুত্তা?
কুকুরটা যেন নূরজাহানের মনে মনে বলা কথা শুনতে পেল। তার পায়ের কাছে এসে লেজ নাড়াতে নাড়াতে দুইবার খেউ খেউ করল। বেশ একটা আদরের ভাব আছে চেহারায়। দেশগেরামের নেড়িকুত্তা। তয় একটু যেন ভাল জাতের, একটু যেন পরিষ্কার। দেখলে ঘিন্না লাগে না।
কুকুরটাকে কয়েক পলক দেখে উঠানের দিকে দৌড় দিল নূরজাহান। মা ওমা, তাড়াতাড়ি আহো। তাড়াতাড়ি।
দুয়ারে অলস ভঙ্গিতে বসে থাকা হামিদা মেয়ের ডাকে চমকাল। নিজের অজান্তেই যেন ঘর থেকে বের হয়ে এল। কী অইছে রে?
তারপরই কুকুরটাকে দেখতে পেল। নূরজাহানকে দৌড় দিতে দেখে কুকুরটাও দৌড় দিয়েছে তার পিছন পিছন। যেন কতদিনের পালা কুকুর। বাড়ির মানুষ যেদিকে যায় সেও যায় সেদিকে।
হায় হায় কুত্তা আইলো কই থিকা?
হেইডা তো আমিও কইতে পারি না। ধইনচা খেতের ভিতর দিয়া হাতড়াইয়া আইলো।
কোন বাড়ির কুত্তা?
আমি কেমতে কমু? কুত্তা আইছে দেইক্কাই তো তোমারে ডাক দিলাম।
কুকুরটা তখন দুইজন মানুষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বেশ একটা ফুর্তির ভাব ধরে লেজ নাড়ছে। একবার নূরজাহানের পা শোকে, একবার শোকে হামিদার পা। ভাবটা এরকম যেন এই বাড়িতে সে নতুন না, যেন সে এই বাড়ির বহু পুরানা বাসিন্দা।
কুকুরটার ভাব দেখে মা-মেয়ে দুইজনেই অবাক। হামিদা ভুরু কুঁচকে নূরজাহানের দিকে তাকাল। কুত্তাডার কারবার দেখতাছস? দেইক্কা মনে অয় আমগো বাড়িরই কুত্তা। আমরাই য্যান পালি।
হ। এক্কেরে আপনা মাইনষের লাহান ভাব।
খেদায় দে, খেদায় দে। কুত্তা বিলাই পালনের ঝামেলা অনেক।
আমি পারুম না। তুমি খেদাও।
ক্যা, পারবি না ক্যা?
যুদি কামড় দেয়?
এই কুত্তায় কামড় দিবো না।
রান্নাচালার ওদিক থেকে একটা চলা (লাকড়ি) নিল হামিদা। চলা হাতে তেড়ে গেল কুকুরটার দিকে। এই যা যা। হুর হুর। হুরো। যা যা।
কুকুরটা প্রথমে বুঝতে পারে নাই, আচমকা তাড়া খেয়ে ভড়কে গেল। লেজ নামিয়ে বড়ঘরের চাইছের (পিছন) দিকে দৌড় দিল। হামিদাও কিছুদূর দৌড়ে গেল কুকুরটার লগে। একদিক দিয়া গিয়া অন্যদিক দিয়া ঘুইরা আবার উঠানে চলে এল কুকুরটা।
