দবির মাথা নাড়ল। আছে, আছে। খাইগোবাড়ির মাঠে মিটিং করছিলো জিয়াসাবে।
হ এইত্তো আপনের মনে আছে। তারপর তো তারেও মাইরা হালাইলো। তয় তার আগে আরেকখান কারবার অইছিলো। এই সড়কখান তখন বি চদরী সাবগো গেরাম দয়হাটা না মজিদপুর, ওইমিহি দিয়া নেওনের কথা অইছিলো। ওইমিহি দিয়া লৌহজং যাইবো।
কও কী?
আরে হ। হোনেন না ঘটনা। জিয়াসাবে শহিদ অইয়া যাওনের পর সড়কের কাম গেল থাইম্মা। তারবাদে ক্ষমতায় আইলো এরশাদ সাব। সেয় আইসা আবার শুরু করাইলো কাম। এরশাদ সাবের মিনিস্টার অইলো আমিনুল ইসলাম খানসাব। সেয় সড়কখান লইয়াইলো মাওয়া মিহি। বাপের বেড়া একখান। বিক্রমপুরের সব থিকা বড় কামডা কইরা দিছে।
হ অহন সড়কখান ভালয় ভালয় শেষ অইলেই অয়।
বসির অবাক। ওই দেখো গাছিদাদায় কয় কী? আরে ভালয় ভালয় শেষ অইবো কী? শেষ তো পেরায় অইয়াঐ গেছে।
কোনহানদা (কোনখান দিয়ে) হইয়া গেছে অহন দেহি কামকাইজ বন্ধ। মাওয়া তরি মাডি হালানের কামঐত্তো পুরাপুরি শেষ অয় নাই। কুমারবুগের পর থিকা রাস্তা নিচা। আরও বহুত মাডি হালান লাগবো।
আরে হেইডা তো লাগবোঐ। বইষ্যাকালে মাডিকাডার কাম করবো কেমতে? বইষ্যাকালডা শেষ অইতে খালি দেন না, দেইখেন নে মাডিকাডার কাম কারে কয়। পোনরো দিনের মইদ্যে মাওয়া ফেরিঘাট তরি রাস্তা এইরকম উঁচা হইয়া যাইবো।
তারপরও ম্যালা কাম বাকি থাকবো?
হ ওইডা থাকবো। পাকা করনের কাম বাকি থাকবো। এই বইষ্যাকালেও কলম (কইলাম, বললাম) হেই কাম পইড়া নাই। বুড়িগঙ্গার এই পাড় থিকা রাস্তা পাকা করনের কাম আরম্ব অইয়া গেছে।
আরে মিয়া ওইডা জানি। ছিন্নগর তরি আউগ্নাইয়াই গেছে রাস্তা। খরালিকালে আমগো এই মিহি রিশকামিশকাও আহে।
হে হে বইষ্যাকালেও আহে গাছিদাদা। কোলাপাড়ার ওইমিহি কয়দিন আগেও রিশকা দেখছি আমি। গেল শীতে ছিন্নগরের ওইমিহি এক রিশকাঅলার লাশ পাওয়া গেছিলো না? কারা জানি গলায় ফাঁস দিয়া মারছে বেডারে। মাইরা খালপারে হালায় দিছে।
হ ওই ঘটনা হুনছি। তয় কারা মারছে বেড়ারে হেইডা জানতে পারে নাই দারোগা পুলিশে?
না দাদা, পারে নাই।
কথার ফাঁকে কখন যে বুকপকেট থেকে রমনা সিগ্রেট বের করে ধরিয়েছে বসির, দবির খেয়াল করে নাই। এখন হঠাৎই যেন খেয়াল করল বসির ফুকফুক করে সিগ্রেটে টান দিচ্ছে, নাকমুখ দিয়া গলগল করে বের হচ্ছে ধুমা। সেই ধুমা মিশে যাচ্ছে শ্রাবণ মাসের বিকালবেলার হাওয়ায়।
তবে বসির একলা একলা সিগ্রেট টানছে দেখে মনের খুব ভিতরে একটা খটকা লাগল দবিরের। এত খাতির করে যে বসির তাকে বাড়ি থেকে নিয়া আসলো, সেন্টুর দোকানে বসে চা-মিষ্টি খেতে খেতে কাজের কথাটা বলবে, নৌকা ঘুরিয়ে দবিরকে আবার বাড়িও পৌঁছে দিয়া যাবে, সেই মানুষটা সিগ্রেট ধরাবার আগে তাকে একবার বলল না, খাইবেন নি গাছিদাদা একশলা?
দবিরের মনের কথাটা যেন শুনতে পেল বসির। খুবই লাজুক মুখ করে দবিরের দিকে তাকাল। একখান ভুল কইরা হালাইছি দাদা। হে হে।
দবির তাকিয়েছিল মালেক দরবেশের বাড়ির ওদিককার গাছপালার দিকে। বসিরের কথায় তার দিকে চোখ ফিরাল। কীয়ের ভুল?
আপনে বোজেন নাই?
না রে দাদা, বুজি নাই।
আপনে মানুষটা বহুত সোজাপদের। আরে আমি যে একলাঐ সিকরেট ধরাইলাম, আপনেরে যে হাদলাম না, এইডা আপনে খ্যাল করেন নাই?
দবির সরল মুখ করে হাসল। আগে করি নাই। তুমি কথা হপায় (মাত্র) কইছো, তার ইট্টু আগে করছি।
আমি আসলে কথার তালে আছিলাম, এর লেইগা ভুলডা অইছে। লন, অহন একশলা খান। না খাইলে বুজুম আপনে আমার উপরে রাগ করছেন।
আরে না রে দাদা, আমি ওইপদের মানুষ না। রাগারাগি ফাডাফাডি আমি কেঐর লগে করি না।
বুকপকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগ্রেট দবিরের দিকে বাড়িয়ে দিল বসির। নেন গাছিদাদা, নেন।
ইট্টু পরে খাইলেও অসুবিদা নাই। অহন খাইলে চা খাওনের পরও তো আরেকখান খাওন লাগবো।
ওই দেখো গাছিদাদায় কয় কী? আরে সিকরেটের কি আকাল পড়ছেনি? চা খাওনের পর একহান ক্যা, লাগলে তিনহান খাইবেন। লন লন, ধরান।
সিগ্রেটের লগে ম্যাচও বাড়িয়ে দিল বসির।
দবির সিগ্রেট নিয়া হাওয়া বাঁচিয়ে ধরাল। তারপর বড় করে টান দেওয়ার পর উদিস পেল খানিক আগের তুলনায় মনটা তার অনেক ভাল। বেশ একটা আমুদে ভাব খেলা করছে মনে। নূরজাহানের লেইগা সমন্দটা মনে অয় ভালই আনছে বছির।
সিগ্রেট অর্ধেকও খাওয়া হয় নাই দবিরের, মালেক দরবেশের বাড়ির লগের একচিলতা মাঠটার উত্তর পারে কোষানাওখান ভিড়াল ফইজু। আইয়া পড়ছি। নামেন।
দুইজন মানুষ নৌকা থেকে নামল।
বৃষ্টি কাদায় প্যাঁচপ্যাচা হয়ে আছে মাঠ। খানে খানে দুবলাঘাস লেপটা লেপটি হয়ে আছে গেরুয়া রঙের কাদায়। মাঠের পশ্চিমে অনেকখানি নেমে গেছে সূর্য। রোদের শেষ আভাটুকু লেগে আছে চারদিককার চকেমাঠে, ঘরবাড়িতে। এই আলোয় ছাতা মাথায় দেয় আহাম্মকে। বসির এতটা আহাম্মক না। নৌকা থেকে নামার আগেই ছাতি বুজিয়ে ডানদিককার আকাতলির (বগলের) নীচে নিয়েছে। এখন ল্যাংড়া পা টেনে টেনে, ওই তো, ওই যে সড়কপারে দেখা যায় মাওয়ার বাজারের দোকানপাট, ওইদিকটায় দবির গাছির পাশাপাশি হাঁটা দিয়েছে।
.
বাঁশঝাড় তলার ওদিকটায় দুইটা শালিক পাখি চরছে।
