কথাটা বুঝতে পারল না আতাহার। বলল, ক্যা?
বঙ্গবন্ধু সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা না করলে তর বাপে বাইচ্চা থাকে না। রাজাকাররা বাইচ্চা থাকে না। মুক্তিযোদ্ধারা বেবাকটিরে ঢওয়াইয়া (ধ্বংস করা অর্থে) হালাইতো।
আলমগিরের কথা শুনে হাসল আতাহার। ওই অর্থে ধরলে তো জিয়াউর রহমানের কাছেও রিনি আমরা। বঙ্গবন্ধু রাজাকারগো বাঁচাইয়া দিছে, জিয়াউর রহমান রাজনীতি করবার পারমিশন দিছে। আর এরশাদ আইয়া রাজাকারগো খালি মিনিস্টার বানাইছে, খালি মিনিস্টার বানাইছে।
সুরুজ মুখ বিকৃত করে বলল, এই হগল প্যাচাইল বাদ দে তো। আমার ভাল্লাগে না। পলেটিসক বহুত খারাপ জিনিস।
আলী আমজাদ তাকিয়েছিল আলমগিরের দিকে। সুরুজের কথা শেষ হওয়ার পর বলল, ভাইয়ে মনে অয় আওয়ামী লীগ করে!
আলমগির লাজুক হাসল। আরে না মিয়া, আমি কোনও লীগঐ করি না। তয় বঙ্গবন্ধুর খুব ভক্ত আমি। বঙ্গবন্ধুর নামে কেঐ কোনও খারাপ কথা কইলে সইজ্জ করতে পারি না। মিজাজ খারাপ অইয়া যায়।
আতাহার বলল, ও আসলে আওয়ামী লীগঐ করে। ইলেকশনের টাইমে দেকবেন আওয়ামী লীগের লাইগা কেমুন ফালান ফালায় (লাফানো অর্থে)। আলইম্মারে তহন হারিকেন দিয়া বিচড়াইয়াও (খুঁজে) পাইবেন না।
আর তুমি যে ফালাইবা বিএনপির লেইগা!
আমি বিএনপি সাপোট করি এইডা বেবাকতে জানে। বিএনপির লেইগা তো ফালামু। সাপোটাররা না ফালাইলে কারা ফালাইবো!
আলী আমজাদ বলল, এরশাদ সাবের তো তাইলে খুব খারাপ দশা দেকতাছি। এহেনে আওয়ামী লীগ আছে, বিএনপি আছে, জাতীয় পারটি তো দেকতাছি না! জাতীয় পারটি অহন ক্ষমতায়। বিক্রমপুরের দুই বাঘা নেতা আছে জাতীয় পারটিতে। কোরবান আলী, শাহ মোয়াজ্জেম। আর তোমগো মইদ্যে কোনও জাতীয় পারটি নাই।
সুরুজ কেলানো একখানা হাসি দিয়ে বলল, কে কইলো নাই? আমি আছি। আমি জাতীয় পারটি। এরশাদ সাব জিন্দাবাদ!
সাব্বাস। তাইলে নিখিল কী?
আতাহার বলল, হিন্দু তো, সিউর আওয়ামী লীগ।
বাদ রইল খালি জামাতটা। ঠিক আছে আমি জামাত অইয়া যামুনে। তাইলে এই ঘরে যহন আমরা পাঁচজন একলগে বহুম ঘরডা ছোট্ট একখান বাংলাদেশ অইয়া যাইবো।
জামাত করতে অইলে আমার বাপের লগে দুস্তি করেন। ঐ লাইনের লোক।
আলী আমজাদ চিন্তিত গলায় বলল, এই এলাকায় আর কে কে রাজাকার আছিলো?
সুরুজ এবার বেশ বিরক্ত হল। আরে এই প্যাচাইলডা বাদ দিতাছেন না ক্যা? কইলাম যে ভাল্লাগে না।
আইচ্ছা বাদ দিলাম। অহন অন্যকথা কই।
আলমগির চোখ সরু করে আলী আমজাদের দিকে তাকাল। আপনে কইলাম মহা ত্যান্দর মানুষ ভাই। শইল মোডা অইলে কী অইবো, বুদ্ধি বহুত চিকন আপনের। আমি আপনেরে বুইজ্জা হালাইছি। নিখিলারে পরে চা দেওনের কথা থিকা আপনে বাইর করলেন ও হিন্দু দেইখা অরে আমরা আমগো লাহান দাম দেই না। ছোড কইরা রাখি। এইডা কইলাম আমগো মাথায় আছিলো না। আমরা কোনওদিন এই লাইনে চিন্তা করি নাই। আইজ থিকা দুস্তির মইদ্যেও হিন্দু মুসলমানের প্যাঁচখান আপনে লাগাইয়া দিলেন। এই ফাঁকে আমরা কে কেমুন হেইডাও ইট্টু বাজাইয়া দেকলেন। বহুত চালাক মানুষ ভাই আপনে। তয় সোজা একখান কথা আপনেরে আমি কইয়া রাখি, আমরা কেঐ আওয়ামী লীগ সাপোট করি কেঐ বিএনপি নাইলে জাতীয় পারটি কিন্তু দোস্ত যে এইডা ভুইলা যাওন ঠিক অইবো না। একজনরে খোঁচা দিয়া দেহেন বেবাকতে মিল্লা আপনেরে খাইয়া হালাইবো।
তারপর মুচকি হেসে আলমগির বলল, আপনে তো জামাতী। জামাতীরা বেবাকতেরঐ শত্রু।
আলী আমজাদ মনে মনে বলল, দেহা যাইবনে। টাইম আহুক। দুস্তি কেমতে ভাইঙ্গা দিতে অয় হেইডা আমি জানি। মুখে বলল, এই হগল প্যাচাইল বাদ। অন্য প্যাচাইল পাড়ি। এই দিকে ‘ইউ টু’ পাওয়া যায় না?
শব্দটা জীবনে শোনেনি আতাহাররা। চারজন একলগে আলী আমজাদের মুখের দিকে তাকাল।
নিখিল বলল, ইউ টু কী?
ইউ টু অইলো ‘উধাবা ঠুল্লি’।
আতাহার বলল, অর্থ কী?
আলী আমজাদ হাসল। তারপর সিগ্রেট ধরিয়ে মুখভর্তি করে ধুমা ছাড়ল। উধাবা ঠুল্লি কথাটার অর্থ কইতে পারুম না, জিনিসটা কী হেইডা বুজাইয়া দিতাছি। পাকিস্তান আমলে ঢাকার নিউ মার্কেটে থান কাপোড়ের দোকানের কর্মচারি আছিলাম আমি। ঐ টাইমে নিউ মার্কেটে এক ধরনের মাইয়াছেইলা ঘুইরা বেড়াইতো। হাতে ভ্যানেটি ব্যাগ, চোক্কে কালো গগস (গগলস)। পরনে রঙচঙা শাড়ি। কিছু কিনতো না খালি ঘুইরা বেডাইতে। তারবাদে যার তার লগে রিকশায় উইট্টা যাইতো গা। পয়লা পরথম ঘটনা কী বোঝতে পারতাম না। পরে অন্য কর্মচারিরা বুজাইয়া দিল। অগো নাম উধাবা ঠুল্লি। এই নাম কে দিছে, ক্যা দিছে জানতাম না। সংক্ষেপে আমরা বানাইয়া লইছিলাম ইউ টু। পরে কত ইউ টু নিজেগো মেসে লইয়াইছি আমরা!
আতাহার হেসে বলল, বুজছি।
তারপর সামনে ফেলে রাখা সিগ্রেটের প্যাকেট থেকে সিগ্রেট ধরাল। আতাহারের দেখাদেখি প্রত্যেকেই সিগ্রেট ধরাল।
বাইরে খয়েরি চাদর পরা লোকটা তখনও একই ভঙ্গিতে বসে আছে। একবার লোকটার দিকে তাকাল আতাহার। বলল, আমগো এইদিকে ঐসব জিনিস নাই। চউরাণী মউরাণী দুই একখান পাওয়া যায়। জিনিস ভাল না।
আলী আমজাদ কিছু একটা বলতে যাবে, কী ভেবে বাইরে তাকিয়েছে, দূরে সড়কের পশ্চিমপাড় থেকে সড়কে উঠতে দেখল একজোড়া ছেলেমেয়েকে। মেয়েটা ভাঙন থেকে আগে উঠল, উঠে ছেলেটাকে হাত ধরে টেনে তুলল। এতদূর থেকেও আলী আমজাদ বুঝতে পারল দুইজনেই পাখির মতো ছটছট করতাছে।
