.
চকের দিক থেকে বিশাল উঁচু দেখায় সড়ক।
একপাশ থেকে অন্যপাশের বাড়িঘর উঠান পালান কিছু দেখা যায় না। বাড়ির উঁচু গাছপালার মাথার দিকটা দেখা যায়। বিকালবেলার ওই একটুখানি রোদ কোনও কোনও গিরস্তবাড়ির গাছপালার মাথায় লেগে চকচক করছে।
বইঠা ছেড়ে অনেক আগেই লগি ধরেছে ফইজু। চকে ধান নাই। এখন তো দেশগ্রামে ইরি ছাড়া আর কিছু চাষ হয় না। ইরি উঠে যায় বর্ষার আগে আগে। ফলে চকমাঠ থাকার কথা ফকফকা, তয় ফকফকা চক এদিকটায় নাই। গিরস্তলোক বাড়ির লগের জমিতে ধইনচা (ধনচে) বুইনা দিছে। কেউ কেউ দিছে কাইশশা (কাঁশ) বুইনা। ধইনচা কাইশশার ফাঁকফোকর দিয়া বইঠা বাওয়া যায় না। এজন্যই লগি নিয়েছে ফইজু। মুখোন তার সেই আগের মতনই নিরস আর অন্ধকার। মেদিনীমণ্ডলের বিশাল চকে খেলা করছে দিনশেষের রোদ। সেই রোদে মুখের অন্ধকার কাটে নাই ফইজুর। দুপুরের ভাত না খাওয়া পেটে দমকা হাওয়ায় বর্ষাচকের পানি যেমন উথাল পাথাল করে ফইজুর পেটের ভিতরটা এখন তেমন করছে। তবু নাওখান সে বাইয়া যায়। লগির ঠেলায় ঠেলায় মালেক দরবেশের বাড়ির দিকে আগায়।
নীল পিরান পরা দবির বসে আছে আগার দিককার চারোটে (নৌকার মাথার দিককার পাদানি কিংবা বসার জায়গা)। তার মুখামুখি ল্যাংড়া পা ভাজ করে বসেছে বসির। মাথার উপর মেলা আছে ছাতি। ঘটকালির কাজে আদব লেহাজের আকাল নাই বসিরের। নৌকায়। উঠে প্রথমেই ছাতিটা মেলে ধরেছিল দবিরের মাথায়। দবির হাত তুলে না করেছে। আমার ছাতি লাগবো না। বিয়ালের রইদ শইল্লে মাথায় লাগে না।
বসির হে হে করে হেসেছে। আমার লাগে গাছিদাদা। ঘটকালির কামে মাথাডা রাখতে অয় গাঙ্গের পানির লাহান ঠান্ডা। এর লেইগা মুলাম (মোলায়েম) রইদ্রেও ছাতিডা আমি মাথায় দেই। মাথার চুল অইলো আমার আগন (অগ্রহায়ণ) মাসের দুবলার (দূর্বাঘাস) লাহান। চপচপা তেল দিয়াও কাকই চালাইতে পারি না।
দবির একপলক বসিরের মাথার দিকে তাকিয়েছিল। হ তোমার চুল বিরাট ঘন। এইরকম ঘনচুলের মাথা গরম অয় বেশি।
হে হে, এর লেইগাইত্তো আমি মাথায় দুইবেলা সউষ্যার তেল দেই। মুলাম রইদ্রেও ছাতি মাথায় দেই। হে হে।
ততক্ষণে নিজের মাথার উপর ছাতি মেলে বেশ একখান ভাব ধরে ফেলেছে বসির। ফইজু বইঠা রেখে লগি হাতে উঠে দাঁড়িয়েছে। বইঠাটা বসে বসে বাওয়া যায়, লগি বাইতে হয় দাঁড়িয়ে। ছোট লগি হলে কেউ কেউ বসে বসেও বায়। এদিককার চকে পানি বেশি। ছোট লগি ঠাই (তল) পায় না। ছোট লগিতে কাজ হয় না। বসে বাওয়াও যায় না।
দবির একবার ফইজুর দিকে তাকিয়েছিল। লোকটার ব্যাজার মুখ তার ভাল লাগে নাই। অন্যদিকে মনের ভিতর দবিরের ভারী একখান ছটফটানি। ঘটকা বছির কুনসুম (কখন)। কইবো তার মতলবের কথা? নূরজাহানের লেইগা কোন গেরামের পোলা দেখছে সে?
আগ বাড়িয়ে কথাটা দবির জিজ্ঞাসাও করতে পারে না। করলে বসির তাকে আদেখলা (অতিউৎসাহী) লোক ভাববে। হয়তো অন্য রকমের একটা সুযোগ নেওয়ারও চেষ্টা করবে। ঘটকারা অইতাছে মদি দোকানদারগো লাহান। পিঁপড়ার পাছায় চিমটি দিয়া মিঠাই রাইখা দেয়। দবিরের আদেখলামি দেইখা মনে করতে পারে, পাইছি শালারে। অহন মাইয়ার বিয়ার কথা লইয়া দুই-চাইরশো খাওন যাইবো। সেন্টুর দোকানের চা-মিষ্টির দামটা হয়তো দবিরের ঘাড়ের ওপর দিয়াই পার করবে।
না দবির ওই রাস্তায় যাবে না। মনের ভাব মনে চেপে কোষানাওয়ের চারোটে বসে রইল। এদিক দেখে, ওদিক দেখে আর ভিতরে ভিতরে অপেক্ষা করে এই বুঝি কথাটা ঘটকায় তোলে। বসির ওসবের ধার দিয়েই যায় না। সে কথা বলে তার মাথা নিয়া, ছাতি আর মাথার চুল নিয়া। গরম মাথা ঠান্ডা করবার জন্য সউষ্যার তেল দুইবেলা দেয় মাথায়, ওই নিয়া। সড়ক বাঁহাতে রেখে নৌকা আগাচ্ছে দেখে হঠাই বলল, বুজলেন গাছিদাদা, বিক্রমপুরের লেইগা কামের কামডা করলো খানসাবেঐ। আর কেঐ তেমুন কিছু করে নাই।
দবির আনমনা ছিল। বলল, কোন খানসাবে?
বসির যেন এইমাত্র বর্ষার পানিতে একটা চুব খেয়েছে এমন ভঙ্গিতে বলল, ওই দেখো। গাছিদাদায় কয় কী? খানসাব কওনের পরও বোজেন নাই? আরে আমিনুল ইসলাম খানসাবের কথা কই।
এবার বুঝদারের মতন হাসল দবির। বুজছি, বুজছি।
ইসলাম সাব না অইলে বিক্রমপুরের উপরে দিয়া এই ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক অইতো না। আর এই সড়ক না অইলে বিক্রমপুরের কোনও উন্নতিও অইতো না।
হ এইডা সত্যকথা।
বিক্রমপুরে তো লিডার কম আছিলো না। শামজ্জেম সাব (শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন), কুরবান আলী সাব (কোরবান আলী)। তারও আগে আছিলো বি চদরী (বি চৌধুরী। বদরুদ্দোজা চৌধুরী) সাবের বাপ কফিলউদ্দিন চদরী। বি চদরী সাব নিজেও বিরাট লিডার। তয় বিক্রমপুরের লেইগা কামের কাম কেঐ করে নাই। করল খালি ইসলাম সাবে। এরশাদ সাবরে কইয়া সড়কটা সে মাওয়ার এইদিক দিয়া আনছে।
এই সড়ক অন্যদিকদা নেওনের কথা আছিলো নি?
না এই দিক দিয়াই নেওনের কথা আছিলো।
তয়?
তয় তো ঘটনা আপনেরে আগে থিকা কইতে হয় গাছিদাদা।
কও তো, হুনি। আমি তো হগল কথা জানি না। খালি দেখতাছি রাস্তা অয়, দেইখাই আমোদ পাই।
বসির হাসল। হে হে। আমোদ তো পাইবেনই। এইডা তো বিরাট আমোদের কথা। যেই দেশের মানুষ নাওদোন ছাড়া আর কিছু চোকে দেখে না, তারা অহন দেখবো বাস টেরাক আর পরাইভেট কার, রিশকা দেখবো, বেবিটেকি দেখবো। দিনে চাইরবার ফুরুত কইরা ঢাকা যাইবো, ফুরুত কইরা আইবো। তাগো লেইগা সড়কখান তো বিরাট আমোদের জিনিস। আরে এই সড়ক তো বহুত আগেঐ অওনের কথা আছিলো। সড়কের প্যালেন করছিলো শেকসাবে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান)। পাছাইততইর (পঁচাত্তর) সালে তারে মাইরা ফালানের পর জিয়াসাব (শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান) আইলো ক্ষমতায়। ক্ষমতায় আইসা সে কইলাম শেকসাবের প্যালেনটা বাতিল করলো না। রাইখা দিল। কামকাইজও মনে অয় তার আমলে একবার শুরু অইছিলো। জিয়াসাব একবার হেলিকাপটার লইয়া মেদিনমণ্ডল গেরামে আইছিলো না? আপনের মনে নাই হেই কথা?
