নূরজাহান বুঝে গেল অন্যদিক দিয়া মা তাকে আটকাবার চেষ্টা করছে। সেই দিকটাও বন্ধ করল সে। ওইত্তো, তুমি যহন থালবাসন ধুইতে গেলা। বাবায় গেল তামুক খাইতে।
এবার হামিদার সন্দেহ কিছুটা কমল। হ্যাচাঐ?
তয় মিছানি? ঘুম লইয়া মিছাকথা কমু ক্যা?
হামিদা আবার একটু চিন্তিত হল। দরজা দিয়া তাকালে চোখ প্রথমেই যায় বাঁশঝাড়টার ওদিকে। বাঁশঝাড়ের মাথার উপর এসে পড়েছে বিকালের একটুখানি রোদ। সেই রোদে ঝিরঝির করছে বাঁশপাতা। মুখের পান এতক্ষণে একেবারে ছোবড়া হয়ে গেছে। সেই ছোবড়া একগাল থেকে আরেক গালে আনল হামিদা। ঘটকায় আইছিল।
কোন ঘটকায়?
ওইত্তো, ওই ল্যাংড়া। বছির।
ক্যা, সেয় আইছে ক্যা?
হেইডা আমি কেমতে কমু?
তুমি না বাবার লগে কথা কইলা?
হ কইছি। তয় ঘটকার কথা তর বাপে কিছু কয় নাই। ঘটকায়ও মনে অয় তারে কিছু কয় নাই।
কিছু না কইলে বাবায় তার লগে গেলো ক্যা?
হামিদা আবার ভুরু কুঁচকাল। তর বাপে যে তার লগে গেছে হেইডা বুঝলি কেমতে?
ইস মা! তুমি এত বলদা? কইলাম না তোমার আর বাবার বেক (বেবাক) কথা আমি হুনছি।
তয় তো তুই আগে থিকাই জানচ বাইত্তে কে আইছিলো। তর বাপে আমার লগে ঘটকার প্যাচাইলঐত্তো পারতাছিলো!
এবার নূরজাহান হাসল। না না, তুমি বলদা না। তুমি বহুত চালাক। আমার চালাকি ঠিকঐ বুইঝা হালাইছো। বাইত্তে যে বছির ঘটকায় আইছিলো এইডা আমি তোমগো আগে। থিকাঐ জানি।
এবার হামিদা যেন বড় রকমের একটা ধাক্কা খেল। আমগো আগে থিকা জানচ?
হ।
কেমতে? ঘটকায় কি তরে জানাইয়াঐ এই বাইত্তে আইছেনি?
বলদার লাহান কথা কইয়ো না। হেয় আমারে কেমতে জানাইবো? আমি কি বাইত থনে বাইর অইনি?
তয়?
আরে হোওনের আগে কইফফার ছাড়ার (কফিলউদ্দিন নামের একলোকের ছেড়ে যাওয়া বাড়ি) ওইমিহি থিকা ঘটকার নাও আমি আমগো বাড়ি মিহি আইতে দেকছি। ওইডা দেইক্কাঐ মুখ ঢাইক্কা হুইয়া পড়ছি। ঘুম আমার আহেই নাই। তোমার আর বাবার বেক কথাই আমি হুনছি।
নূরজাহান আবার হাসল।
তার হাসি দেখে রেগে গেল হামিদা। ওই মাগি, ভেটকাবি (হাসি) না। তোর ভেটকান দেকলে আমার শইল জ্বলে। তুই বহুত টেটনি অইছস। বহুত পাকা পাকছস তুই। ঘটকায় বাইত আইছে হেই লইয়া এতপদের প্যাচাইল পাড়লি।
মায়ের এইসব বকা গায়ে লাগে না নূরজাহানের। সে আগের মতোই হাসিমুখে বলল, তোমার লগে বারোপদের প্যাচাইল পাড়তে আমার বহুত আমোদ লাগে।
ঠোকনা দিয়া আমোদ ছুড়াইয়া দিমু। এই হগল আমোদ করিচ জামাইবাইত্তে গিয়া।
নূরজাহান গম্ভীর হল। ঘটকায় কি বিয়ার সমন্দ লইয়া আইছিলো?
তুই বলে বেক কথা হোনছস? তয় জানচ না সমন্দ লইয়া আইছে না কী লইয়া আইছে?
বাবায় তো তোমার লগে সমন্দর প্যাচাইল পাড়ে নাই।
হ পারে নাইঐত্তো।
তয় আমি বুজুম কেমতে?
তর বোজনের কাম নাই।
ক্যা কাম থাকবো না? আমার সমন্দের কথা আমি বুজুম না?
চৌকি থেকে নামল নূরজাহান। হামিদার সামনে এসে দাঁড়াল। তোমারে একখান কথা জিগাই মা?
মেয়ের মুখের দিকে তাকাল না হামিদা। উঠানের দিকে তাকিয়ে বলল, কী?
ঘটকায় যুদি আমার লেইগা কোনও সমন্দ আনে তয় তোমরা কী করবা?
কী করুম আবার?
বিয়া দিয়া হালাইবা আমারে?
সমন্দ যুদি ভাল অয় তয় দিমু।
এত ছোড বসে বিয়া দিবা আমারে?
কীয়ের ছোড বস? বিয়ার বস অইয়া গেছে তর। আগিলা দিনে তর থিকা কত ছোড মাইয়ার বিয়া অইতো।
তোমার বিয়া অইছিল কোন বস্সে?
তর সমান বসেই। দুয়েক বচ্ছরের ছোডও অইতে পারি।
মিছাকথা কইয়ো না।
কীয়ের মিছাকথা?
অহন বস কত তোমার?
তিরিশ-পঁইতিরিশ অইবো।
বিয়ার কয় বচ্ছর বাদে আমি অইছি?
বিয়ার পরের বচ্ছরঐ।
তয়?
তয় কী?
তয় তুমি আমার থিকা ছোড আছিলা কেমতে? আমার অহন চৌদ্দ-পোনরো বচ্ছর বস। তোমার যুদি পঁইতিরিশ অয়, তয় তোমার বিয়া অইছে উনিশ-কুড়ি বচ্ছরে। একইশ নাইলে বাইশ বচ্ছর বসে আমি অইছি। যহন আমি হইছি তহন তুমি আমার এই বসূসের থিকা সাত-আষ্ট বচ্ছরের বড়।
হামিদা ততক্ষণে মোলায়েম হয়ে গেছে। মেয়ের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল, কী জানি! অইতে পারে।
তয় নিজে বিয়া বইছো আসল বসে আর মাইয়াডারে এমুন পোলাপাইন্না বসে বিয়া দিতে চাইতাছো ক্যা?
এবার গলা একেবারে কোমল হয়ে গেল হামিদার। অপলক চোখে মেয়ের মুখের দিকে তাকাল। হাসিমাখা মায়াবী গলায় বলল, আমি তরে বিয়া দিতে চাইতাছি এইডা তরে কে কইলো?
কেঐ কয় নাই।
তয়?
তোমার কথার ভাবে বোজলাম।
এবার হাসল হামিদা। তরে যত তাড়াতাড়ি বিয়া দিতে পারি তত তাড়াতাড়ি আমরা জানে বাঁচি।
নূরজাহান মুখ ঝামটাল। ক্যা, আমি তোমগো কোন পাকা ধানে মই দিছি?
পাকা ধানে নাই দেচ মই, তয় যেইডা করছস ওইডা পাকা ধানে মই দেওনের থিকা বহুত বেশি।
কোনডার কথা কও?
ভুইল্লা গেছস?
নূরজাহান গম্ভীর হল। বুজছি তো, ঐ একখান কথাই কইবা। হুজুরের মোকে ছ্যাপ দিছিলাম।
হ ওই একখান ঐত্তো দশখানের সমান। দশখান কীয়ের, একশোখানের সমান। তরে যে আজরাইলডার হাত থিকা বাঁচাইয়া আনতে পারছি এইডা আমগো সাত কপালের ভাগ্যি। তুই তো গেছিলি। আজরাইলডায় তো তরে খাইয়া হালাইতো।
ঘটনাটা মনে হলে এখনও নূরজাহানের বুক কাপে। কেমন করে ওরকম একখানা কাজ করতে পেরেছিল সে? কোথা থেকে আসছিল তার ওই সাহস? কাজটা করবার আগে একবারও ভয়ে কেন বুক কাঁপে নাই তার? একবারও কেন ভাবে নাই তারপর কী হতে পারে? ইস মরনি আম্মায় যে কী বাঁচানটা বাঁচায়াছিল তারে!
