ঘরের কোণে দড়িতে ঝুলছে দবিরের নীল ঝুলপকেটআলা শার্টটা। সেই শার্ট টেনে গায়ে দিতে দিতে বলল, ঘটকায় যে কীর লেইগা আইছে কিছুই বুজতাছি না। কইলো কথার কাম আছে। বাইত্তে বইয়া কথা কইতে চায় না। কয় লন দাদা, আমার লগে বাজারে লন। চা-মিষ্টি খাইতে খাইতে কমু নে। যাই, হুইন্নাহি (শুনে আসি) কী কয়। বাইত্তে আইয়া তোমারে কমু নে।
মনে লয়…
হামিদার কথা শেষ করতে দিল না দবির। চোখ ইশারায় নূরজাহানকে দেখাল। অহন প্যাচাইল পাইড়ো না। আগে ঘটকার কথা হুইন্নাহি।
দবিরের ইশারা বুঝল হামিদা। বলল, আইচ্ছা যাও যাও। আমগো নাও লইয়া যাইতাছো না?
না। বছিরের নাওয়েই যাইতাছি। ও ঐ আবার বাইত্তে দিয়া যাইবো।
আইচ্ছা আইচ্ছা।
ঘর থেকে বের হয়ে দবির যখন ল্যাংড়া বসিরের কোষানাওয়ে চড়ছে তখন হঠাৎ করেই অদ্ভুত একটুখানি রোদ উঠেছে। বিকাল হয়ে আসা রোদের রংটা আশ্চর্য সুন্দর। ভরা বর্ষার পানিতে পড়েছে সেই রোদ, গাছপালা আর গিরস্ত বাড়ির উঠান পালানে। পড়েছে। শ্রাবণ মাসের মেঘলা আকাশের তলায় মন খারাপ করে পড়ে থাকা মেদিনীমণ্ডল গ্রামখানি যেন হঠাৎ করেই হেসে উঠেছে। এই আলোয় দবিরের মনে হল নূরজাহানের জন্য নিশ্চয় পছন্দসই কোনও সমন্দ নিয়া আসছে বসির। তার মন অচেনা এক আনন্দে ভরে গেল।
.
নূরজাহান জেগেই ছিল।
শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে শুয়ে পড়েছিল ঠিকই, ঘুমায় নাই। অন্যান্য দিন এভাবে শুয়ে পড়ার পর ঘুমে কাদা হয়ে যেতে সময় লাগে না। আজ সেই সাধের ঘুম এলই না। বসির ঘটকের কোষানাও নিজেদের বাড়ির দিকে আসতে দেখেই মনের ভিতরটা এলোমেলো হয়ে গেছে। যে বাড়িতে ডাঙ্গর মেয়ে আছে সেই বাড়িতে মতলব নিয়াই আসে ঘটক। কথায় কথায় মেয়ের খোঁজখবর নেওয়া। বয়স কত হল, এখনই বিয়াশাদির চিন্তা ভাবনা আছে কি না গিরস্তের, সমন্দ আনলে কীরকম আনতে হবে, ময়মুরব্বির লগে এসব আলোচনাই করে বাড়ির উঠানে বসে। পান তামাক খায় আর আড়চোখে এদিক ওদিক চায়, মেয়েটাকে যদি একপলক দেখা যায়। মেয়ে কালো না ফরসা, নাকি শ্যামবর্ণ! উঁচা লাম্বা কেমুন? বেশি উঁচা। লাম্বা অইলে জামাইও তো লাগবো ওই পদের!
এসব ভেবে অদ্ভুত এক লজ্জায় কুঁকড়ে গেল নূরজাহান। যেন নিজের মুখের দিকে তাকাতে পারবে না সে। নিজের হাত পা শরীরের দিকে তাকাতে পারবে না। চোখ তুলে অন্য মানুষের দিকে তাকানো তো দূরের কথা আপনা মা-বাপের মুখের দিকেই তাকাতে পারবে না। এই অবস্থায় বসির ঘটককে যদি ঘরে এনে বসায় বাবায়, তা হলে? বাড়িতে তো বসার মতন ঘর একটাই!
নূরজাহান তারপর আর কিছুই ভাবে নাই। যেখানে বসে ছিল সেখানেই শুয়ে পড়েছে। শুয়ে এমনভাবে ঢেকেছে মুখ, কিছুতেই বোঝার উপায় নাই জেগে আছে না ঘুমিয়ে গেছে।
এই অবস্থায় দবির হামিদার টুকটাক কথাবার্তা সে শুনেছে। শুনে বুঝতে পারে নাই কিছুই। মায়ের অস্থিরতা আর বাবার কথা চেপে যাওয়ার কায়দাটা সে ধরে ফেলেছে। তারপর প্রায় দমবন্ধ করে পড়েছিল। কানখাড়া করে রেখেছিল কখন ঘর থেকে বের হয়। বাবা, কখন গিয়া ওঠে বসির ঘটকের নৌকায় আর কখন বর্ষার পানিতে পড়ে বইঠার চাব (চাড়ি, বইঠা বাওয়া), কখন বাড়ির ঘাট থেকে নৌকা মেলা দেয় চকপাথালে।
সব মিলিয়ে অতি সামান্য সময়। তবু নূরজাহানের মনে হল সময়টা যেন শেষই হচ্ছে। দড়ি থেকে নীল পিরান টেনে নিয়া গায়ে দিতেই যেন অনেকটা সময় নিচ্ছে বাবা। মা’র কথা যেন শেষই হচ্ছে না। পিরান গায়ে দিয়া ঘর থেকে বের হয়ে ওইটুকু উঠান পার হয়ে বসির ঘটকের নাওয়ে গিয়া চড়তে যেন এক-দেড়ঘণ্টা লেগে যাচ্ছে বাবার। নৌকা ছাড়তেই বা এত দেরি করছে কেন ওই ম্যাড়া (রোগা, দুর্বল) কামলাটা!
বইঠার শব্দ যখন দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে, মুখ থেকে শাড়ির আঁচল সরাল নূরজাহান। উঠে বসল।
এই এতক্ষণে একটু সুস্থির হয়ে বসেছে হামিদা। দরজার সামনে আমকাঠের পুরানা পিড়ি পেতে কপাটে ঢেলান (হেলান) দিয়া বসছে। মুখে কোন ফাঁকে দিয়েছে এক টুকরা পান। এখন পান চাবাতে চাবাতে বাইরের দিকে তাকিয়ে চিন্তিত হয়ে গেছে।
মা’কে কয়েক পলক দেখল নূরজাহান। আচমকা বলল, কে আইছিল মা?
মেয়ের কথায় পলক চমকাল হামিদা। চিন্তিতভাব কেটে গেল। তুই দেহচ নাই কে আইছিলো?
নূরজাহান অবাক হওয়ার ভান করল। আমি কেমতে দেহুম? আমি না ঘুমাইতাছিলাম!
হামিদা ভুরু কুঁচকাল। তয় বুজলি কেমতে বাইত্তে কেঐ আইছিলো?
শুরুতেই কি চালাকিটা ধরা পড়ে যাবে নূরজাহানের?
এত্ত সোজা না!
মুখের অতিসরল একখান ভঙ্গিমা করল নূরজাহান। বাড়ির ঘাডে মনে অইলোনাওয়ের আওজ (শব্দ) পাইলাম। বাবার লগে কে জানি কথা কইলো? তোমার গলার আওজও পাইলাম।
ঘুমে থাকলে এই হগল আওজ পাইলি কেমতে?
ঘুমের মইদ্যেই পাইছি। তুমি জানো না আমার ঘুম পাতলা?
না তর ঘুম পাতলা না। একবার ঘুমাইয়া পড়লে লাডিদা (লাঠি দিয়ে) পিডাইলেও তুই উটতে চাচ না।
কে কইছে তোমারে?
কে আবার কইবো? আমিই কইতাছি। আমার পেডের মাইয়া আমি চিনি না?
নূরজাহান সরল মুখ করে হাসল। না মা। আমার ঘুম সত্যই পাতলা। আমি নাওয়ের আওজ পাইছি, কোন এক বেডার গলার আওজ পাইলাম। তুমি আর বাবায় কথা কইতাছিলা…
নূরজাহানের কথা শেষ হওয়ার আগেই হামিদা বলল, তুই হুইছস কুনসুম (শুয়েছিস কখন)?
