নূরজাহানকেও জাত সাপের কায়দায়ই দংশাবে মান্নান মাওলানা। সেই পথ তৈরির জন্যই ধরেছে ল্যাংড়া বসিরকে। বসির ঘটক মানুষ। কোন সাপে কোন ব্যাং খেল ওই নিয়া তার কোনও মাথাব্যথা নাই। তার একমাত্র মাথাব্যথা ঘটকালি। কাজ সারতে পারলেই টাকা। এই কাজ সারতে পারলে দশ দশটি হাজার টাকা দিবেন মান্নান মাওলানা। একত্রে তিনটা কাজ দিয়েছিলেন। দুই ছেলে আর তার নিজের বিয়া। এক ছেলের বিয়া আটকে গেছে। ওই যে আজাহার, জাপানে থাকে। সে এখন বিয়া করবে না। তার অসুবিধা আছে। কী অসুবিধা সেটাও পরে একদিন বসিরকে হুজুর ডেকে বলেছেন। এখন কাজ হল দুইখান। আতাহারের বিয়া, হুজুরের বিয়া। দুইখান বিয়াই ভেজাইলা। আতাহারের লগে ভাবভালবাসা তার ভাবির। তিনখান পোলাপান সেই ভাবির। দেশগ্রামের বেবাক মাইনষেই জানে পোলাপান তিনডা আতাহারের। মোতাহার বাঁইচা থাকতেই ভাবির লগে কারবারখান আতাহার শুরু করছিল। ভাই জানত সবই। নিজের পুরুষত্ব নাই, বউর দেহ আগুনের লাহান। সেই আগুনের তাপ সামলাইতো আতাহার। এই দুঃখেই গ্যাসটিকের (গ্যাসট্রিক) অসুখ অইলো। পেট ফুইল্লা মইরা গেল।
তয় জুয়ান পোলাপানগো এই হগল কারবার থাকেই। কেউ বাড়ির বাইরে করে, কেউ করে বাড়ির ভিতরে। আতাহার নাইলে বাড়ির ভিতরেই করছে। এই হগলে বিয়া আটকাইবো না। মাইয়া একখান প্রায় ঠিক করে ফেলেছে বসির। বেলতলির মাইয়া। বিয়াটা মনে অয়। অইয়া যাইবো আতাহারের। সমস্যা দেখা দিব হুজুররে লইয়া। নূরজাহানের লগে তার বিয়াটা, কামটা একটু য্যান কঠিনই লাগে বসিরের। তারপরও চেষ্টা সে করবে। তার স্বভাব হচ্ছে কাউদ্ভার (কচ্ছপ) মতন। একবার কামড় দিয়া কোনও কিছু ধরলে সহজে ছাড়তে চায় না। নূরজাহানের ব্যাপারে কামড়টা সে আজ দিতে আসছে। দেখা যাক কী হয়!
বসির আবার তার হে হে হাসিটা হাসল। হারাদিন বাইত্তে বইয়া বইয়া করেন কী গাছিদাদা? হে হে। বাড়িত থিকা বাইর বুইর অন না?
তেমুন অই না। কাম কাইজ কিছু নাই। পশশুদিন ইট্টু মাওয়ার বাজারে গেছিলাম। কও বছির, কামের কথা কও।
এহেনে কইতে চাই না দাদা।
তয় কই কইবা?
লন বাজারমিহি যাই। সেন্টুর দোকানে বইয়া চা খাইতে খাইতে কমু নে।
বাজারে যাওনের কাম কী? তোমার ভাবিছাবে চা বানাইয়া দেউক, বাইত্তে বইয়াই। খাও।
আরে না, এই অবেলায় ভাবিছাবরে কষ্ট দিয়া লাভ নাই। আর বাইত্তে বানাইন্না চা খাইতে আমার ভালও লাগে না। বাজারে গিয়া আরাম কইরা বহি, চা’র লগে দুইডা কইরা রসোগোল্লাও খাইলাম। তারবাদে চা সিকরেট খাইতে খাইতে…
দবির চিন্তিত গলায় বলল, তয় আমি আবার বাজার থিকা আমুনে কেমতে? আমার কোষানাও লইয়া লমু?
ওই দেহো দাদায় কয় কী? আরে আপনেরে লইয়া যাইতাছি আমি, আপনেরে ফিরত দিয়া যাওনের দায়িত্বও আমার। আপনে খালি লন।
দবিরের মনে তখন শুধু একটাই ভাবনা। কী এমুন কথা কইতে চায় বছির যেই কথা চা মিষ্টি খাইতে খাইতে কওন লাগে? ভাল খবরের লগে মিষ্টির একখান সমন্দ আছে। ঘটকের মুখে ভাল খবর অইলো বাড়িতে ডাঙ্গর পোলা থাকলে হেই পোলার লেইগা পছন্দসই মাইয়া, আর ডাঙ্গর মাইয়া থাকলে তার লেইগা পছন্দসই পোলা। তয় কি নূরজাহানের লেইগা কোনও পছন্দসই পোলা পাইছে বছির? হেই কথা কওনের লেইগাই তারে বাজারে লইয়া যাইতে চাইতাছে, চা-মিষ্টি খাওয়াতে চাইতাছে?
ভিতরে ভিতরে ভাল রকমের একটা অস্থিরতা শুরু হল দবিরের, ভাল রকমের একটা ছটফটানি। নূরজাহানের লেইগা কোন গ্রামের পোলার সমন্দ লইয়াইছে বছির? পোলার জাতবংশ কী? করে কী পোলা? চাকরিবাকরি না কায়কারবার? নাকি গিরস্তি করে?
একমনে এইসব কথা, আরেক মনে দবিরের মনে হয়, হায় হায় মাইয়াডা তো ডাঙ্গর অইয়া গেছে? মাইয়াডার তো বিয়ার বস (বয়স) অইয়া গেছে। বিয়া অইয়া গেলে মাইয়াডা জামাইবাড়ি যাইবো গা। বাড়িডা খালি অইয়া যাইবো। বাড়িতে তহন আমরা দুইজন। আমি আর নূরজাহানের মা’য়। হায় হায়, নূরজাহান যেই বাইত্তে নাই হেই বাইত্তে আমি থাকুম কেমতে? খেতখোলার কাম কইরা, বাজারহাট কইরা বাইত্তে আইয়া যে মাইয়াডারে ডাক দেই, কো রে, নূরজাহান? কই মা? এই ডাকহান তহন আমি কারে দিমু? শীতের দিনে পয়লা যেদিন রস পড়ে হেই রস আমি বেচি না। বাইত্তে লইয়াহি। পয়লা গেলাস রস মাইয়াডারে খাওয়াই। বিয়া অইয়া গেলে, জামাইবাড়ি চইলা গেলে আর বছরের শীতের দিনে পয়লা রস আমি কারে খাওয়ামু?
এসব কথা ভেবে আনমনা হয়েছে দবির, ব্যাপারটা খেয়াল করল বসির। হে হে, কী চিন্তা করেন গাছিদাদা?
দবির যেন বাস্তবে ফিরল। না না কিছু চিন্তা করি না।
তয় লন যাই।
হ হ লও। তুমি নাওয়ে গিয়া বহো আমি পিরনডা গায়দা (গায়ে দিয়ে) আহি।
আইচ্ছা আইচ্ছা।
পা টেনে টেনে বসির গেল কোষানাওয়ের দিকে আর দবির এসে ঢুকল ঘরে।
কপাটের আড়ালে দাঁড়ানো হামিদার তখন আর তর সইছে না। হরতরাইস্যা (অতিঅস্থির) গলায় বলল, ঘটকায় আইছে ক্যা? সমবাদ (খবর) কী?
দবির আড়চোখে চৌকির দিকে তাকাল। জানালার ধারে কখন শুয়ে পড়েছে নূরজাহান কে জানে। শাড়ির আঁচলে মুখ এমন করে ঢেকে রেখেছে, দেখে বোঝার উপায় নাই জেগে আছে না ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে থাকলে ঠিক আছে, জেগে থাকলে ঠিক নেই। যত নিচা গলায়ই কথা বলুক, দবির-হামিদার সব কথাই তার কানে যাবে। মেয়ের বিয়ার প্রস্তাব নিয়া আসছে ঘটক, কী বিষয় কী বিত্তান্ত কিছুই পরিষ্কার জানে না দবির, আন্দাজ অনুমানে বুঝতে পারছে। সেই আন্দাজ অনুমানটা সে বলতে চায় না। আগে বসির ঘটক সব খুলে বলুক, সব শুনুক দবির তারপর হামিদাকে বলবে।
