ফইজু নিরস মুখে বলল, পরিবারের (বউ অর্থে) লগে কাইজ্জা অইছে। দোফরে ভাত দেয় নাই।
কচ কী?
হ।
তয় আগে কবি না! বাইত থিকা তরে ভাত খাওয়াইয়া আনতাম।
অহন থিকা হেইডাই কইরেন। বাইষ্যাকালে যতদিন আপনের নাও বামু, টেকাপয়সা যা দেওনের দিয়েন, তিনওক্ত খাওনডাও দিয়েন। সংসার আমার রুজিতে চলে না, চলে পোলাগো রুজিতে। এর লেইগা পরিবার অহন আর আমারে দুইচোক্ষের নিলায় (দৃষ্টিতে) দেখতে পারে না। ভাত চাইলে চক্ষু গোড়াইয়া (চোখ রাঙিয়ে) চায়। পাতিলায় ভাত। থাকনের পরও একমুঠ ভাত বেশি চাইলে কয়, ভাত নাই। আর আপনের পেডে কি রাক্কস। হানছে নি (রাক্ষস ঢুকেছে নাকি? এত ভাত ভাত করেন ক্যা?
ছাতি বন্ধ করে বসির তখন পাঞ্জাবির পকেট থেকে গোলাপি রঙের কাকুই বের করে তেলেভিজা মাথা পরিপাটি করে আঁচড়াচ্ছে। ফইজুর কথা তার কানেই গেল না। সে আছে এখন রশিদ খাঁ-র উলটা তরিকায়।
.
ল্যাংড়া বসিরের কোষানাও সত্যি সত্যি তার বাড়ির ঘাটে এসে লাগছে দেখেই তামাক টানা থামিয়েছে দবির। কলকিতে তামাক টিকা দুইটাই বেশ আগে পুড়ে ছাই হয়েছে। তবু টানে টানে ধুমা একটু আসছিল। সেই ধুমায় তামাক বলতে কিছু ছিল না, শুধু তামাকের একটুখানি গন্ধ। নেশাখোর মানুষের কাছে ওইটুকু গন্ধই বা কম কীসে।
দবিরের খুব ইচ্ছা করছিল আরেক ছুলুম (ছিলিম) তামাক সাজাবে। হুঁকা তো হাতে আছেই, তামাক টিকার মালসাও আছে হাতের কাছে। চুলার তলার দিকে এখনও রয়ে গেছে নাড়ার আগুনের ধিকিধিকি। ছাইদাঁড়া (চুলার ভিতর যে দণ্ডটা দিয়ে খুঁচিয়ে ছাই ওলট পালট করা হয়) দিয়ে খানিক খোঁচাখুঁচি করে ওই জিনিস কিছুটা তুলে কলকিতে দিলেই হল। তারপর টানতে শুরু করলে টানে টানে তামাক পুড়বে, গলগল করে ধুমা বের হবে। নেশায় ভরতে থাকবে বুক আর মাথা। টিকা পোড়াবার দরকারই হবে না।
কাজটা করা হল না। দ্বিতীয়বার তামাকের নেশা বুকে মাথায় ঢুকাতে পারল না দবির। বসিরের কোষানাও এসে বাড়ির ঘাটে লাগছে দেখে হুঁকা রেখে উঠে দাঁড়াল। রান্নাচালা থেকে বের হয়ে ধীরপায়ে এল কোষানাওয়ের কাছে।
ততক্ষণে মাথা আঁচড়ে পাঞ্জাবির জেবে (পকেটে) কাকুই ভরেছে বসির। ছাতি বুজিয়ে রেখেছে বাঁশের চটি দিয়া তৈরি কোষানাওয়ের পাটাতনে। দবিরকে আগায়া আসতে দেখে ল্যাংড়া পা টেনে নৌকা থেকে নামল। হে হে গাছিদাদা, আছেন কেমুন? হে হে। শইলডা ভাল? হে হে।
দবির তীক্ষ্ণচোখে বসিরের দিকে তাকাল। আছি তো ভালই রে দাদা। তোমার খবর কী? কী মনে কইরা এই বাইত্তে?
আইলাম আপনের লগে ইট্ট দেহা করতে। হে হে। ইট্ট কথার কাম আছে। হে হে।
লও ঘরে লও। ঘরে গিয়া বহি। নাকি উডানেই বইবা? ফিরি (পিড়ি) আইন্না দিমু?
না ফিরিফুরির কাম নাই। হে হে। নাওয়ে ম্যালা টাইম ধইরা বইয়া আছিলাম। মাজামোজা বেদনা অইয়া গেছে। অহন ইট্টু মাজা টানা দিয়া খাড়ই। হে হে। খাড়ই থাকলে আরাম লাগবো। হে হে।
এইডা কোনও কথা অইলোনি মিয়া? বাইত্তে আইছো, ইট্টু বইবা না? পান তামুক খাইবা না?
আরে খামু নে। পান তামুক খাওনের বহুত টাইম পইড়া রইছে।
তয় কও দিহি (দেখি) কী কইবা? বইতে যহন চাও না, খাড়ই খাড়ইয়াই কও।
হামিদা তখন মাথায় ঘোমটা দিয়া বড়ঘরের কপাটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পুরানা কাঠের কপাটের দুইখানের একখান পুরাপুরি আবজানো (ভিড়িয়ে রাখা), আরেকখানের অর্ধেকটা খুলে বাকি অর্ধেকটার আড়ালে দাঁড়িয়েছে সে। দবির আড়চোখে একবার হামিদাকে দেখল। তার চোখ অনুসরণ করল বসিরের চোখ। তবে সে যাকে দেখতে চাইল তাকে দেখতে পেল না। বাড়িতে ঘটক এলে বাড়ির বিয়ার উপযুক্ত মেয়ে কান্দিপাড়ার শেফালির কায়দায় ঘরের দরজায় শরীর অর্ধেক লুকিয়ে দাঁড়ায়। কোনও কোনও বাড়িতে মা-চাচিরাও দাঁড়ায় আর তাদের আড়ালে দাঁড়ায় মেয়ে।
এই বাড়িতে মেয়ের মা দাঁড়িয়েছে, মেয়ে দাঁড়ায়নি। কোথায় সে? বাড়িতে নাই নাকি?
বসির ঘটকের খুবই ইচ্ছা হল নূরজাহানকে একটু দেখে। মেয়েটাকে দুয়েকবার দেখেছে তয় চেহারা মনে নাই। তার কীর্তিকাহিনি সবই শুনেছে সে। দেশগ্রামের শয়ে শয়ে মানুষের সামনে মেয়ে মান্নান মাওলানার মুখে থুতু ছিটিয়ে দিয়েছিল। তারপর থেকে মেয়েটাকে বাড়ি থেকে বের হতে দেয় না দবির আর তার পরিবার। গ্রামের ময়মুরব্বির হাতেপায়ে ধরে মান্নান মাওলানাকে ঠান্ডা করেছে, তার হাত থেকে বাঁচিয়েছে মেয়েকে।
এই বাঁচানোর কথাটা মনে করে ভিতরে ভিতরে খুব একচোট হাসল বসির। মান্নান মাওলানার হাত থিকা বাঁচবো নূরজাহান, কয় কী! মান্নান মাওলানা অইলো জাইত সাপের জাত। জাইত সাপরে দুক্কু (ব্যথা দেয়া অর্থে) দিলে, বেশি মানুষজনের আওয়াজ পাইলে জাইত সাপ তহনকার লাহান ফণা তোলা মাথা নামাইয়া কোনওমিহি যায় গা। যে তারে দুক্কু দিছে তার বাড়ি চিন্না রাখে, ঘর চিন্না রাখে। রাইত্রে আইসা ঢোকে হেই বাড়িতে। যে তারে দুকু দিছে তারে বিচড়াইয়া বাইর করে। তারবাদে ফোঁস কইরা মাথা তুইল্লা খালি একহান ঠোকর দেয়। ওই এক ঠোকরে কারবার শেষ। বিয়ানবেলা বাড়ির মাইনষে উইট্টা দেহে তাগো বাড়ির একজন মানুষ বিচনার মইদ্যে মইরা সিদা অইয়া রইছে। শইলখান সাপের বিষে কালীবন্ন। কী সাপে দংশিল লখাই রে…
