বসির বলল, এইবার কন খাঁ-সাব। ভাস্তির লেইগা আবার সমন্দ দেহুম?
রশিদ খ বসিরের দিকে চোখ তুলে তাকালেন। না।
তয়?
সমন্দ তো তুমি দেইখাই রাখছো।
জে?
হ। মাঝিবাড়ির একটা পোলা তুমি দেখছিলা না?
লগে লগে সেই দুঃখের স্মৃতি বসিরের মনে পড়ল। মুইড়া পিছার বাড়ি খেতে খেতে বেঁচে গিয়েছিল। ল্যাংড়া পা নিয়া দৌড় দিয়া চকে না নামলে কপালে কী ছিল আল্লাই জানে। এখন সেসব কথা ভেবে বসির টের পেল তার মুখের ভিতরটা তিতা তিতা লাগছে। তিতাভাব কাটাবার জন্যই যেন রসগোল্লার প্রায় অর্ধেকটা চামচে কেটে মুখে পুরে দিল। চাবাতে চাবাতে বলল, আরে হ। রফিক মাঝি। বিএ পাশ। এজি অফিসের কেরানি। চাকরিতে উপরি আছে ম্যালা।
আমি খবর লইছি হেই পোলায় অহনও বিয়া করে নাই।
হ। আমিঐত্তো তার লেইগা মাইয়া দেখতাছি। কাদির মাঝি পেরায় পেরায়ই আমার কাছে আহে। আমার ভাইয়ের বিয়ার কী করলা ঘটক? ভাল জাতের একখান মাইয়া দেও।
মিষ্টি খাওয়া শেষ করে আথকা বসিরের একটা হাত চেপে ধরলেন রশিদ খাঁ। এই সমড়া তুমি কইরা দেও বসির। শেফালির লেইগা পোলাড়া তুমি আইন্না দেও।
বসির ঘাঘুলোক। এতক্ষণের কথাবার্তায় ঘটনা কিছুটা আঁচ করেছিল। পুরাটা বোঝে নাই। এখন সব বুঝেও একেবারেই বলদা (বোকা) একখান মুখ করে ফেলল। কন কী খাঁ-সাব? আপনেগো বাড়ির মাইয়া বিয়া দিবেন মাঝিবাড়ির পোলার কাছে? জাইত যাইবো না?
আইজকাইল আবার জাইত কীয়ের? শিক্ষিত টেকাআলা পোলা, ভাল চাকরি করে, ভাল উপরি পায়, দেখতে শোনতেও ভাল। আমার ভাস্তি তো অত সোন্দর না। মাঝিরা যে আমগো লগে সমন্দ করতে চাইছে, এইটাই বিরাট ঘটনা। আমরা খা-বংশের লোক, তয় অহন পড়তি। টেকাপয়সা আগের লাহান নাই। জাগাসম্পত্তিও কইম্মা গেছে। আরেকদিকে ভাস্তি যাইতাছে বুড়া অইয়া…।
ময়মুরব্বির সামনে পকেটে রমনা সিগ্রেটের প্যাকেট নিয়া ঘুরলেও সিগ্রেটটা বসির ধরায় না। ধরায় আড়ালে আবডালে গিয়া। আজ আর সেটা করল না। চায়ে ফুরুক করে চুমুক দিয়া পকেট থেকে সিগ্রেট বের করে ধরাল। ভাবটা এইরকম যেন সেই এখন রশিদ খাঁ-র মুরব্বি।
আসলে ব্যাপারটা বসির ইচ্ছা করেই করল। সেদিনকার সেই অপমানের এটা হল প্রথম প্রতিশোধ। পরের প্রতিশোধগুলি সে ধীরে ধীরে নিবে।
সিগ্রেটে টান দিয়া রশিদ খাঁ-র মুখ বরাবর ধুমা ছেড়ে পরিষ্কার গলায় বসির বলল, ঘটনাডা অইলো খাঁ-সাব হেই ডাকের কথার লাহান।
হাততে কাডল খায় না
মোথা লইয়া টান পারে।
(সাধতে কাঁঠাল খায় না, পরে মোথা নিয়ে টানাটানি করে)
তারপর দ্বিতীয় প্রতিশোধটা নিল বসির। আপনে কইছিলেন দেইখাই আপনের ভাস্তির লেইগা ছেইলা দেকছিলাম আমি। ভাল ছেইলা পাইছি, গেছি সল্লমন্দ লইয়া আপনের কাছে, আর আপনে আইলেন আমারে মুইড়া পিছা লইয়া। আপনে যেই কথাডা ইকটু আগে কইলেন এইডা তো আমি বহুত আগে থিকাই জানি। আপনেরা অইলেন অহন পড়তি খা বংশ। আগের বংশগরিমা টেকাপয়সা আর কিছুই নাই আপনেগো। আপনেগো থিকা অহন মাঝিরা অনেক উপরে। মাঝিবাড়ির পোলায় যে আপনের ওই পেতনির লাহান ভাস্তিরে বিয়া করতে চাইছে এইডাই তো বেশি। আর আপনে কী করলেন? আপনে গেলেন ঘটকরে মুইড়া পিছা লইয়া পিডাইতে।
বসিরের কথার খোঁচায় রশিদ খাঁ তখন কাটা কচুপাতার মতন নুইয়ে পড়েছেন। মাথা নিচু করে ফুরুক ফুরুক করে চা খাচ্ছেন। কথা বলতে যেন ভুলে গেছেন। অন্যদিকে বসিরের মনে বেদম ফুর্তি। মনে মনে বলছে, কী রে হালার পো হালা, অহন কেমুন লাগে?
তারপরই বাণিজ্যের কথাটা তুলল বসির। আপনে মুরব্বি মানুষ, ভুল কইরা অপমান করছিলেন আমারে, ঠিক আছে আমি ওইটা মনে রাখলাম না। মাঝিবাড়ির পোলার লগে ধইরা নেন আপনের ভাস্তির বিয়া অইয়া গেছে। যেই মাসে চাইবেন ওই মাসেই বিয়া। তয় টেকা আমারে দেওন লাগবো আষ্ট হাজার।
রশিদ খাঁ-র পায়ে যেন মান্দার কাটা বিনধা গেছে এমন করে চমকালেন তিনি। আষ্ট হাজার?
হ। দশ হাজারই চাইতাম। আপনে মুরব্বি মানুষ দেইখা দুই হাজার কমাইছি।
টাকাপয়সার ব্যাপারে রশিদ খাঁ খুবই খাইষ্ঠা (কৃপণ অর্থে) লোক। শুরু করল তিন হাজার থেকে। শেষ তরি পাঁচ হাজারে সাব্যস্ত হল। দেড়মাসের মাথায় রফিক মাঝির বউ হয়ে খানবাড়ির শেফালি চলে গেল ঢাকার টাউনে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই কোল জুড়ে ওঁয়া ওঁয়া।
তবে রশিদ খাঁ হচ্ছেন বসিরের ঘটক জীবনের বড় রকমের অভিজ্ঞতা। সময় সময় ঘটনাটা বসিরের মনে পড়ে। আর ওই যে বাড়ি থেকে ডাইকা নিয়া গান্ধির দোকানে চা মিষ্টি খাওয়াতে খাওয়াতে যেভাবে শেফালির বিয়ার কথা তিনি তুলেছিলেন, সেই ঘটনার বছর দেড়েক পর আজ ঠিক তার উলটা কায়দায় নূরজাহানের বিয়ার কথা বসির তুলবে। সেই জন্যই দবির গাছির বাড়িতে আসছে।
তবে ওই হারামজাদা ফইজু দিল বাড়ির ঘাটে কোষা লাগাতে গিয়া বিরাট এক ধাক্কা। ইচ্ছা করলেই ধাক্কাটা ফইজু বাঁচাতে পারত। দূর থেকে বইঠার চাড়িটা একটু কমায়া আনলেই পারত। আর নয়তো চাড়ি না দিলেই হত, নৌকাটা আপছে এসে লাগত বাড়ির ঘাটলায়। উদিসই পাওয়া যেত না যে নৌকা ঘাটে লাগছে।
তবু ফইজুর উপর রাগল না বসির। ছাতি বন্ধ করতে করতে বলল, তর অইছে কী রে ফইজ্জা? খ্যাল করচ না কিছু? নাকি নাও বাওয়ায় মন নাই?
