রশিদ খাঁ-কে দেখে হতভম্ব বসির। খাঁ-সাব আপনে আমগো বাড়িতে? কী মনে কইরা?
তোমার লগে কথার কাম আছে বছির।
গলার স্বর খুবই নরম কোমল। গোপনে একটা তোয়াজের ভাবও যেন টের পাওয়া যাচ্ছে গলায়। একটু যেন সমীহের ছোঁয়া।
বসির তার স্বভাবসুলভ হাসিটা হাসল। হে হে, কইয়া ফালান খাঁ-সাব, কইয়া ফালান।
তার আগে কও আমার উপরে তোমার রাগটা কমছে?
বসির যেন আকাশ থেকে পড়ল। কীয়ের রাগ?
ওই যে আমগো বাইত্তে তোমারে….
আরে ধুরো! কী যে কন খাঁ-সাব? ওই হগল আমি মনে রাখছি নি? ক্যা তারপর আপনের লগে আমার দেহা অইছে না? দেহা অওনের পর আমি আপনেরে সেলামালায়কুম দেই নাই? কথাবার্তা কই নাই?
মিছাকথা কমু না। কইছো।
তয়?
এই আর কী! মনে অইলো আর কী?
না না ওই হগল লইয়া আপনে চিন্তা কইরেন না। বাইত্তে বইবেন? চা দিতে কমু এককাপ? নাকি একগেলাস পানি খাইবেন? এতদূর হাঁইট্টা আইছেন, আদাইয়া (হাঁপিয়ে) গেছেন না?
না বাজান, কিছু অয় নাই। খামু না কিছুই। তোমার লগে কথাডা সারি।
তয় লন বাজারমিহি যাই। যাইতে যাইতে আপনের কথা আপনে কন, আমার হোনন আমি হুনি।
খালি হোনলে অইবো না, কামডা কইরা দেওন লাগবো।
অইলো। আগে আপনে কন।
রশিদ খাঁ-কে নিয়া বাড়ির উঠান থেকে নেমে বসিরও মাথার ওপর মেলেছে ছাতা। খালপারের পথ ধরে দুইজন মানুষ মেলা দিয়েছে কাজির পাগলা বাজারের দিকে। কাজির পাগলা স্কুলের বিশাল মাঠ তখন সকালবেলার রোদে ঝিমঝিম করছে। কয়েকটা গোরু বরকি আর কোন গিরস্তের যেন একটা ভেড়া অলস ভঙ্গিতে চরছে।
হাঁটতে হাঁটতে রশিদ খাঁ বললেন, বছির তুমি আমার ছেইলার বয়সি। যেই কামে তোমার কাছে আইছি, কামডা তোমার করনই লাগবো।
বসির বুঝতেই পারছিল না, এত তোয়াজের কী আছে। রশিদ খাঁ এতটা পথ ভেঙে, রোদ ভেঙে তার কাছে আসছে তো একটাই কাজে। ঘটকালির কাজ। বসিরের পেশা ঘটকালি। টাকাপয়সা ঠিকঠাক মতন পেলে কাজ করতে তার অসুবিধা কী? এই নিয়া এত প্যাচালের কী আছে?
আসল কথাটা শোনার জন্য একটু যেন অধৈর্যই হচ্ছিল বসির। তবু স্বভাব অনুযায়ী অধৈর্য ভাব দেখাল না। হাসিমুখে ঠান্ডা গলায় বলল, এত কথার কাম নাই। আসল কথাডা আপনে আমারে কন। আপনের ভাস্তি শেফালির লেইগা সমন্দ দেখতে কইতাছেন তো? মাইয়ার বস (বয়স) অইয়া গেছে, অহন বিয়াশাদি না অইলে দিনে দিনে মাইয়ার চেহারা সুরত যাইবো বিগড়াইয়া। তখন পোলাই পাওয়া যাইবো না, এই হগলই তো কইতে চান, না কি?
রশিদ খাঁ ডানহাত থেকে বাঁহাতে আনলেন ছাতি। দোনেমোনে গলায় বললেন, তোমার অনুমান ঠিকই আছে, তয় ঘটনা একটু অন্যপদের।
হে হে, পদটা কইয়া ফালান।
লও বাজারে গিয়া কই। গান্ধির দোকানে বইয়া দুইখান রসোগোল্লা খাও, এককাপ চা খাও, বিড়ি সিগ্রেটের অব্বাস থাকলে খাও। খাইতে খাইতে কথা হোনো।
বসিরের বুকপকেটে সব সময় থাকে রমনা সিগ্রেটের প্যাকেট। এখনও আছে। আর ওই জিনিস চোখে না পড়ার কথা না। রশিদ খাঁ-র চোখেও পড়েছে। তা ছাড়া রাস্তাঘাটে বাজারহাটে বসিরের হাতে সিগ্রেট তিনি দেখেছেন। ফুক ফুক করে টানতেও দেখেছেন। তবু ময়মুরব্বির ভঙ্গিতে কথাটা বললেন।
বসির তখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না রশিদ খাঁ-র আসল মতলবটা কী? ভালরকম একটা ধন্দের মধ্যে সে পড়ে রইল।
গান্ধিঘোষের দোকানে একজনও কাস্টমার নাই। কাঁচের আলমারিতে থরে থরে সাজানো গামলা ভরা রসোগোল্লা লালমোহন ছানার আমিরতি (অমৃতি)। বড় বড় কাঁসার থালায় সাজানো চমচম বালুসাই আর আমিরতি। দোকানের পিছনদিকে বিশাল সাইজের কয়েকটা কড়াই অ্যালুমিনিয়ামের ঢাকনা দিয়া কোনওটা পুরো ঢাকা, কোনওটা একটুখানি। দু’ চারটা বল্লা মৌমাছি আর বিস্তর নীল কালো ভোমা মাছি ভ্যানভ্যান করছে কড়াইগুলির সামনে। কাঁচের আলমারির পাশে আলগা চুলায় চায়ের পানি ফুটছে। টিনের বড় একটা থালায় কাপ পিরিচ আর চামচ সাজানো। চিনির বয়ামটা রাখা দোকানের কর্মচারী গৌরার হাতের কাছে। দোকানে কাস্টমার নাই দেখে একটা হাতপাখায় মাছি তাড়াবার নামে নিজেকে বাতাস করছে গৌরা। খালি গায়ের কালো কুচকুচা গৌরার পেট একেবারে ঝুলে পড়েছে। কোরা রঙের ধুতি লুঙ্গির কায়দায় পরা।
রশিদ খাঁ-কে গৌরা চিনে না, দূর গ্রামের লোক, চিনে বসিরকে। তবে বসিরের লগে রশিদ খাঁ-কে দেখে তার খবর হয়ে গেল, চা মিষ্টি এখন দুই-চারখান বিক্রি হবে। বসির ঘটকের কাছে নিশ্চয় পোলা মাইয়ার বিয়ার ব্যাপারে আসছে দেশগ্রামের কোনও গিরস্ত। চা-মিষ্টি খেতে খেতে এখন সেকথাই হবে। চা-মিষ্টির দাম গিরস্ত লোকটাই দিবে। ঘটকরা। কখনও খাওয়ায় না, তারা শুধু খায়।
দোকানে ঢুকেই মুখামুখি বসল দুইজন। রশিদ খাঁ আদেশের গলায় বললেন, দুইডা কইরা রসোগোল্লা দেও। তারবাদে চা দিয়ো।
চিনামাটির পিরিচে করে রসগোল্লা নিয়া এল গৌরা। লম্বা টেবিলটার ওপর রাখতে রাখতে বলল, কত্তা কোন গেরামের?
রশিদ খ না, জবাব দিল বসির। কচ কী রে গৌওরা, খাঁ-সাবরে তুই চিনচ না? আরে সেয় (সে কিংবা তিনি) অইলো কান্দিপাড়ার রশিদ খাঁ।
গৌরা চিনল কি চিনল না বোঝা গেল না। হাসিমুখে বলল, বুজছি বুজছি।
তারপর চা বানাতে চলে গেল।
রশিদ খাঁ তখন চামচে করে একটু একটু করে রসগোল্লা কাটছেন, একটু একটু করে মুখে দিচ্ছেন।
