মেয়ের গুণকীর্তন শুনে ল্যাংড়া বসির মুগ্ধ। আইচ্ছা দেখুম নে খাঁ-সাব। আপনেগো বাড়ির মাইয়ার লেইগা পোলা পাওয়া কোনও ব্যাপারই না। দেইখেন নে কীরকম পোলা জোগাড় করি।
তারপর হাতে এল মাঝিবাড়ির পোলা। পোলার নাম রফিক মাঝি। সম্বন্ধ নিয়া কান্দিপাড়া খানবাড়িতে গিয়া হাজির বসির। রশিদ খাঁ বাড়িতেই ছিলেন। বসিরকে দেখে খুবই আদর করে উঠানে জলচৌকি পেতে দিয়েছেন বসতে। নিজে বসেছেন বসিরের মুখামুখি হাতলআলা চেয়ারে। পরনে লুঙ্গি আর কোরাগেঞ্জি। মাথায় গোল সাদা টুপি, এক কাঁধে গেরুয়া রঙের পুরানা একখান আলোয়ান। পোলা পাইছো বসির?
বসির গদগদ গলায় বলল, হ পাইছি খাঁ-সাব।
কও কী? সত্যই পাইছো?
ওই দেখো খা-সাবে কয় কী? আরে পোলা না পাইলে এতদূর হাঁইট্টা আপনেগ বাড়িতে আমি আইনি?
হ কথা সত্য। তয় কোন গেরামের পোলা?
মেদিনমণ্ডলের।
পোলায় করে কী?
চাকরি করে।
কী চাকরি? কেরানি, এজিবি অফিসের কেরানি। থাকে ঢাকায়। সেগুন বাগিচায় অফিস। পোলায় থাকে মেসে। মেস অইলো কাকরাইলে। কাকরাইল থিকা সেগুন বাগিচা অইলো হাঁটাপথ। মেস থিকা অফিসে যাইতে তিন-চাইর মিনিট লাগে।
ভাল, ভাল। পোলার লেখাপড়া?
বিএ পাশ।
কোন কলেজ থিকা?
কায়দে আজম কলেজ। ওই কলেজটা অইলো ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে। স্বাধীনতার পর নাম বদলাইছে কলেজের। নতুন নামডা আমি জানি না।
কোন ডিভিশনে পাশ করছে?
বসির একটু দমল। আমি খাঁ-সাব আপনের লগে মিছাকথা কমু না। আমি ঘটকালি করি ঠিকঐ, তয় ভাল বংশের পোলা। অবস্থাও মন্দ না আমগো। মিছাকথা কইয়া ঘটকালি অনেকেই করে, আমি করি না। হাছা কথাই আপনেরে কই। ছেলের ডিভিশনটা ভাল আছিলো না।
রশিদ খাঁ চোখ তুলে বসিরের দিকে তাকালেন। তার অর্থ অইতাছে থাজ্জিবিশন? (থার্ড ডিভিশন)।
হ থাড্ডিবিশন। তয় চাকরি করে ভাল। পোলা দেখতে ভাল, রুজি রোজগার ভাল। চাকরিতে উপরি আছে ম্যালা।
না না এই হগলে কোনও অসুবিধা নাই। বিএ পাশ অইলেই অইল। বিএ পাশের নীচে খানবাড়ির মাইয়াগো বিয়া অয় না।
বসির হে হে করে হাসল। হেইডা তো আমি জানিই। বিএ পাশের নীচের পোলা অইলে সম্বন্ধ লইয়া আমি আপনের বাড়িতে আইতামই না। হে হে।
কথা বলতে বলতে আড়চোখে বড়ঘরের দিকে তাকাচ্ছিল বসির। বড়ঘরের কপাটের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে শেফালি। বাড়িতে ঘটক আসছে শুনেই কপাটের আড়ালে এসে দাঁড়িয়েছে। এখান থেকে মাইজ্জাকাকা আর ঘটকের বেবাক কথাই কানে যাচ্ছে তার। শেফালির মা-চাচিরা ঘটকের জন্য চা-নাস্তা বানাতে গেছে রান্নঘরে।
রশিদ খাঁ-র সামনে তখন পিতলের নলঅলা হুঁকা রেখে গেছে বাড়ির পুরনো গোমস্তা কালু। হুঁকার নলে টান দিয়ে তিনি বললেন, বেবাক কথাই কইলা, পোলার নাম কইলা না বসির। নাম কী পোলার?
বসির আবার সেই হে হে করা হাসিটা হাসল। পোলার নাম খাঁ-সাব রফিক।
পদবি?
পদবি অইতাছে খাঁ-সাব মাঝি।
মাঝি শব্দটা শুনে হুঁকার নল হাত থেকে পড়ে যেতে চাইল রশিদ খাঁ-র। কী কইলা? মাঝি?
হ খাঁ-সাব। মাঝি।
মেদিনীমণ্ডলের মাঝিবাড়ির পোলা?
হ।
হুঁকার নল ফেলে লাফ দিয়া উঠলেন রশিদ খাঁ। শালার পো শালা, এত বড় সাহস তর? খানবাড়ির মাইয়ার লেইগা মাঝিবাড়ির পোলার সমন্দ আনছস? ওই শেফালি, মুইরা পিছাড়া (ভাঙা ঝাড়) আন তো। চুতমারানির পো’রে পিছাদা পিডাই।
বসির তারপর আর একদণ্ড বসে নাই খানবাড়ির উঠানে পেতে দেওয়া জলচৌকিতে। ল্যাংড়া পা টেনে কোনওরকমে একটা দৌড় দিয়েছে। একদৌড়ে চকে।
রাগে তখন বসিরের গা জ্বলছিল। আইজকাইলকার পোলাগো আবার জাত-বেজাত কী? লেখাপড়া আর টেকাপয়সা থাকলেই তো অয়। খাঁ-বাড়ির মাইয়া অইছে তো কী অইছে? মাঝিবাড়ির পোলার শিক্ষাদীক্ষা আছে, ভাল চাকরি আর টেকাপয়সা আছে এই জোরে হেই পোলা তো খাঁ-বাড়ির ক্যান, চদরি (চৌধুরী) বাড়ির মাইয়াও বিয়া করতে পারে। আইজকাইল তো জাতে জাতে বিয়া অয় না, বিয়া অয় টেকায় টেকায়। কোনও গিরস্তে টেকা দিয়া জামাই কিনে, আবার কোনও গিরস্তে টেকা দিয়া কিনে বউ। আইজকাইল কি আর বংশগরিমা কোনও কামে লাগে!
চকে নেমে মনে মনে রশিদ খাঁ-কে বেদম গালাগাল করেছে বসির। এত গরিমা দেহাইচ না চুতমারানির পো? মাঝিবাড়ির পোলায় যে তর ওইরকম পেতনির লাহান ভাস্তিরে বিয়া করতে চাইছে হেইডাঐ তর সাত কপালের ভাগ্যি। ওই ভাস্তি তো তুই বিয়া দিতে পারবি ্না। ওই ভাস্তি দিয়া তর ঘরের খাম দেওন লাগবো হালা খাডাসের পো।
তবে ওই রাগ গালাগাল মনে মনেই। তারপর বাজার হাটে, গ্রামের রাস্তায় রশিদ খাঁর লগে দেখা দু’-চার বার হয়েছে বসিরের। বসির হাসিমুখে তাকে সালাম দিয়েছে। ভালমন্দ জিজ্ঞাসা করেছে। অপমানটা যে মনে আছে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেয় নাই সে-কথা। মুখে রাগের ছায়া পড়তে দেয় নাই।
মাস ছয়েক পর এক সকালে রশিদ খাঁ এসে হাজির বসিরের বাড়িতে।
লুঙ্গির ওপর হাফহাতা সাদা শার্টটা পরে মাত্র ঘর থেকে বের হবে বসির, চপচপ করে তেল দেওয়া চুল কাঁকুই দিয়া আঁচড়াচ্ছিল, উঠানে এসে দাঁড়ালেন রশিদ খাঁ। সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা, পায়ে পামশু। বৈশাখ না জষ্ঠিমাসের ঘটনা। বেজায় গরম। সকালবেলাই। রোদের তেজে জান বের হয়ে যায়। রশিদ খাঁ-র মাথার উপর ছাতি ধরা ছিল। বসিরদের বাড়িতে ঢোকার আগে ছাতা বন্ধ করেছেন।
