তিনজন মানুষের থালবাসন ধুতে সামান্যই সময় আজ লাগল হামিদার। হাঁড়ি পাতিল তো আর ধুতে হচ্ছে না। বৃষ্টি বাদলার দিনে একবেলাতেই দুইবেলার রান্না করে রাখে দেশগ্রামের মানুষ। বিকাল সন্ধ্যায় রাতের রান্না এইদিনে করে না কেউ। বাড়িতে হঠাৎ করে কুটুম এলে অন্য কথা। তখন বাধ্য হয়েই করতে হয়। এমনিতে দুপুরবেলার লগে রাতের রান্না করে রাখে গিরস্ত বউরা। হামিদাও তাই করে। ফলে ভাতের হাঁড়িতে রাতের ভাতটা থেকে যায়, তরকারির পাতিলে থেকে যায় রাতের তরকারি। রাতের খাওয়া দাওয়ার পরও ভাত তরকারি কিছু থেকে গেলে ভাতের হাঁড়িতে পানি দিয়ে রাখলে সেটাই হয়ে গেল পান্তা। পরের দিন সকালে বাসি তরকারি দিয়া পান্তা খাওয়া চলে। আর হাঁড়ি পাতিল ধধায়াও হয় তখনই। এজন্য বর্ষাকালের দুপুরবেলায় খাওয়াদাওয়ার পর গিরস্তবউদের ধোয়া পাকলার কাজ কম। শুধুই থালবাসন আর দুয়েকটা গেলাস বাটি ধুতে হয়, হাতা খুন্তি ধুতে হয়।
ওইটুকু কাজ নিয়াই হামিদা আজ যেন একটু বেশিই অস্থির ছিল। স্বামীর তামাক তরি সাজায়া দিতে পারে নাই।
কাজ শেষ হওয়ার পর বেশ একটা স্বস্তি হামিদার। যাউক, অহন একদোম কাইল বিয়ান তরি আজাইর। আর কোনও কাম নাই।
বেশ একটা ফুর্তির ভাব নিয়া হামিদা তারপর উঠানের দিকে আসছে। থালবাসন আলগা করে ধরা বুকের কাছে। ঘরে মাত্র ঢুকতে যাবে, দেখে বাড়ির বিশ-তিরিশ কদমের মধ্যে। এসে পড়েছে একটা কোষানাও। সেই নাওয়ে ছাতি মাথায় দিয়া বসে আছে ল্যাংড়া বসির। যে লোকটা নৌকা বাইছে তার চেহারায় দুনিয়ার বিরক্তি। যেন নৌকা বাওয়ার চেয়ে খারাপ কাজ আল্লাহর দুনিয়াতে আর নাই।
কিন্তু ল্যাংড়া বসির এই বাড়িতে আসছে কেন?
এখনও বাড়ির ঘাটে ভিড়েনি বসিরের কোষানাও, তবু দুই হাতে ধরা থালবাসনের আড়াল থেকে একটা হাত মুক্ত করল হামিদা। গ্রামের বউঝিদের চিরকালীন রীতি অনুযায়ী নিজের অজান্তেই যেন শাড়ির আঁচল টেনে মাথায় ঘোমটা দিল।
.
কোষানাওখান একটু যেন জোরেই ঠেকল দবির গাছির বাড়ির ঘাটে।
ভালরকম ধাক্কা লাগল নাওয়ে। সেই ধাক্কায় ল্যাংড়া বসির বসা অবস্থাতেও প্রায় টলে পড়ছিল। ছাতি ধরা হাত থেকে ছিটকে পড়তে চাইল ছাতি। বসির হচ্ছে ঘটক মানুষ। রাগ কাকে বলে জানে না। এই পেশায় রাগ থাকতে নাই। বিয়ার সমন্দ নিয়া গেলে কোনও কোনও বাড়ির গিরস্তে এত বিরক্ত হয়, জাতপাত না বলে, বংশগরিমায় আঘাত লাগলে শালা শুয়োরের বাচ্চা বলে গালাগাল দিয়া বিদায় করে। কেউ চুতমারানির পো পর্যন্ত বলে। চড় মারার জন্য হাত তোলে কেউ, জুতা মারার জন্য পা থেকে জুতা খোলে। দুই-চারবার। ঘেটিতে ধাক্কাও খেয়েছে বসির। ল্যাংড়া পায়ে ধাক্কা সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে। পড়েছে গিরস্তবাড়ির উঠানে। তারপরও উঠে জামাকাপড় ঝাড়তে ঝাড়তে হাসিমুখে পথ ধরেছে।
এই পেশায় মুখে হাসিটা থাকতেই হয়। হাসিমুখের জোরেই মেয়েপক্ষ ছেলেপক্ষের খাতির তোয়াজও বেদম পাওয়া যায়। পছন্দ মতন সমন্দ একটা করে দিতে পারলে দুইপক্ষের মানুষ পারলে কোলে তুলে রাখে। ঘটকসাব ছাড়া কথা বলে না। রাস্তাঘাটে দেখা হলে বিড়ি সিগ্রেট খাওয়ায়, হাটবাজারে দেখা হলে টেনে নিয়া যায় চা-মিষ্টির দোকানে। দুইডা রসোগোল্লা খান ঘটকসাব, এককাপ চা খান। এই নেন কুড়িডা টেকা দিয়া রাখলাম, বড় মাইয়াডারে যেমুন ভাল একখান পোলার লগে বিয়া দিছেন, মাজারোডারেও ওইরকম একখান পোলার লগে বিয়ার বন্দবস্ত করেন।
কেউ কেউ বলে, আমার বড়ভাইর পোলাডারে যেমুন লক্ষ্মী একখান বউ আইন্না দিছেন, হৌরের অবস্থাও ভাল। ওইরকম টেকাপয়সাআলা ঘরের ভাল একখান মাইয়া আমার পোলার লেইগাও আইন্না দেন। হৌরবাড়ি থিকা পোলায় যেন নগদ টেকাপয়সা কিছু পায়।
ঘটকালির কাজে খাতির তোয়াজটাই বেশি। অখাতিরের কাজ, জুতার বাড়ি খাওয়ার মতন পরিস্থিতিও হয় কখনও কখনও। এইটাই দুনিয়ার নিয়ম। যে-কোনও কাজেরই ভালমন্দ দুইটা দিক থাকবে।
একবার কান্দিপাড়ায় খানবাড়িতে গেছে সেই বাড়ির মেয়ে শেফালির বিয়ার সমন্দ নিয়া। ছেলে হচ্ছে দবিরের পড়শি ওই কাদের মাঝির চাচাতো ভাই। বিএ পাশ করে সেই ছেলে ঢাকার এজিবি অফিসে কেরানির চাকরি করে। লম্বাচওড়া স্বাস্থ্যবান সুপুরুষ ধরনের ছেলে। চাকরিতে উপরি আয়ও আছে। হাতে দামি ঘড়ি, চোখে দামি ফ্রেমের চশমা, পায়ে চকচকা কালো জুতা আর কালো প্যান্ট সাদা ফুলহাতা শার্ট পরে চলাফেরা করে ছেলে। শিক্ষাদীক্ষা টাকা পয়সা সবই হয়েছে। এখন ভাল বংশের মেয়ে বিয়া করে মাঝিবাড়ির ছেলে জাতে উঠতে চায়। বসিরকে ধরেছে। ভাল বংশের মেয়ে এনে দিতে পারলে ডবল পয়সা দিবে ঘটকালির। বসির মহা উৎসাহে কাজে লেগেছে। শীতকালের দুপুরের ভাত খেয়ে কাজির পাগলা থেকে মেলা দিয়েছে কান্দিপাড়া। সীতারামপুর মেদিনীমণ্ডল হয়ে বিলপাথালে পথ ধরেছে। ল্যাংড়া পায়ে হাঁটা তেমন জোরে হয় না। তবু বিকালের মুখে মুখে গিয়া পৌঁছাইছে কান্দিপাড়া খানবাড়ি। সেই বাড়ির বিয়ার উপযুক্ত মেয়ে শেফালির জন্য ছেলে দেখতে বলেছিলেন মেয়ের মেজোচাচা রশিদ খাঁ। রশিদ খাঁ-র লগে বসিরের দেখা হয়েছিল গোয়ালিমান্দ্রার হাটে। কথায় কথায় বসিরকে বলেছিলেন, আমার বড়ভাইর মাইয়াডার লেইগা পোলা দেইখো তো বসির। ভাল পোলা পাইলে বিয়া দিমু। আমার ভাস্তি দেখতে মন্দ না। খাবাড়ির মাইয়া। বোঝোই তো, আদব লেহাজ জানে। কেলাস নাইন তরি পড়ছে। পাঁচওক্ত নমজ পড়ে, কোরআন শরিফ পড়ে।
