থালবাসন নিয়া পুকুরঘাটে যেতে যেতে দবিরকে হামিদা বলেছিল, নিজের তামুকখান আইজ নিজেই হাজাইয়া লইয়ো। আর নাইলে মাইয়ারে কও, মাইয়ায় হাজাইয়া দিবো।
নূরজাহান বলল, আমি পারুম না। আমার ঘুম আইতাছে। মুখ খিঁচিয়ে মাত্র মেয়েকে কিছু বলতে যাবে হামিদা, তার আগেই দবির বলল, না না কেঐর লাগবো না। আমিই হাজাইয়া লইতাছি।
হামিদার লগেই ঘর থেকে বের হল দবির। দরজার পাশে খাড়া করে রাখা থাকে হুঁকাটা। তামাক টিকার মালশা আছে হুঁকার লগে। জিনিসগুলি নিয়া রান্নাচালায় এল। মনোযোগ দিয়া তামাক সাজাতে লাগল।
তখন বৃষ্টি নাই তবে আকাশ থম ধরে আছে। থম ধরা আকাশের তলায়, নিজের ছোট্ট আঙিনার রান্নাচালায় বসে দবির তারপর থেকে আয়েশ করে তামাক টানছে। চোখে উদাস দৃষ্টি। তামাক টানছে আর দেখছে বাড়ির সামনের দিককার বর্ষাভাসা চকমাঠ। এই চকমাঠ ভেঙে, জঙ্গুলে শুকনা জমিটার আড়াল থেকে এসময় বের হয়ে এল ল্যাংড়া বসিরের কোষানাও। নিজের বাড়ির দিকে সেই কোষানাও আগাতে দেখে দবির খুবই অবাক। এত যে প্রিয় তামাক, সেই তামাক টানতে ভুলে গেল। নিজের মনে নিজেকে প্রশ্ন করলো, বছির ঘটক আমার বাইত মিহি (বাড়ির দিকে) আহে ক্যা? ঘটনা কী?
.
পুকুরঘাট বলতে এখন আর কিছু নাই।
বর্ষার পানিতে পুকুর ডোবা সব ভেসে গেছে। এখন চারদিকেই পুকুর, চারদিকেই ডোবা। যেদিকে চোখ যায় শুধুই পানি।
বাড়ির পশ্চিম দিককার ছোট্ট পুকুরটার ওপার তরি দবিরের অংশ। তারপর কাদির মাঝির বাড়ি। পুকুরের তিনদিকটাই জংলা। ছিটকি টোসখোলা আর বেত বউন্নার ঝোপে দিনরাত অন্ধকার হয়ে থাকে। কাদির মাঝির বাড়ি বরাবর সীমানায়, পুকুরের ওপারে আছে। চার-পাঁচটা হিজলগাছ, দুইটা বউন্নাগাছ, একটা ঝাঁপড়ানো ডালপালার ডুমুরগাছ। হিজল বউন্নার গাছ বুনতে হয় না, ডুমুরের গাছও বুনতে হয় না। পানিকাদায় একটুখানি জায়গা পেলেই দেদারছে জন্মায়। প্রথম প্রথম চোখেই পড়ে না। তারপর একদিন যেন হঠাৎ করেই ডালপালা ছড়িয়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
ওই গাছগুলিরও এই অবস্থাই হয়েছে। কবে জন্মাল, কবে বড় হয়ে উঠল উদিস পায় নাই কেউ। একদিন যেন হঠাৎ করেই চোখে পড়ল। আরে, এত ডাঙ্গর ডাঙ্গর গাছ হইলো কবে?
এপারে বাড়ির লাগোয়া দবিরের ঘাটলা।
এপারটা বেশ পরিষ্কার করে রেখেছে দবির। ঝোঁপজঙ্গল গজাতে দেয় নাই। দূর্বাঘাস, সেচি আর দুই-চারটা হাগরা (ঘাঘরা) গজায় কখনও কখনও। আগাছার স্বভাবই তো এমন, ফাঁক পেলেই গজায়। হাগড়া আগাছাটা খুবই বদস্বভাবের। পায়ে লাগলে ভালরকম খাউজায় (চুলকায়)। পাতায় পাতায় জন্মায় ছ্যাঙ্গা। হাগড়া পাতা খাওয়া শেষ করে সেই পোকা একসময় মেলা দেয় ঘরবাড়ির দিকে। সে এক ভালরকম যন্ত্রণা। এজন্য দূর্বা সেচি নিয়া মাথা ঘামায় না দবির, হাগড়া দেখলেই টানে টানে উপড়ায়। পায়ের খাউজানির চেয়ে বড় ভয় ছ্যাঙ্গার।
হামিদা নিজেও চোখের সামনে হাগড়া চারা গজাতে দেখলে থাবায় থাবায় উপড়ে ফেলে।
আজ দুপুরের পর ঘাটলায় এসে কেন যে এইসব তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় মনে আসছে হামিদার, কে জানে! কাজের ফাঁকে ফাঁকে কেন যে তিনপারের ঝোঁপজঙ্গল দেখছে, এপারের পয়পরিষ্কার ভিটামাটি দেখছে, কারণ কিছুই জানে না সে।
ঘাটলা বলতে পুরানা ভারী ধরনের বড়সড় একখানা তক্তা আড়াআড়ি করে ফেলা। বর্ষার পানিতে সেই তক্তা এখন ডুবা ডুবা। একটুখানি বাতাস বইলে, বর্ষার পানিতে একটুখানি টেউ উঠলে পানি গড়িয়ে যায় তক্তার উপর দিয়া। তবু সেই তক্তায় বসে ঘাটলায় বসার আনন্দটা পায় হামিদা। গুড়গুড়ার (গোড়ালি) উপর শাড়ি তুলে ধধায়া পাকলার কাজ করতে কীরকম যেন একটা ভাল লাগা টের পায়।
এখনও সেই ভাল লাগাটা সে টের পাচ্ছিল।
খরালিকালে ঘাটলার লগের পানিতে কিছু এলাইচ (হেলেঞ্চা) লতা ফেলেছিল দবির। কত বছর আগের কথা আজ আর তা মনে নাই। সেই লতা দিনে দিনে এত বাড়া বাড়ল, ঘাটলার তিনপাশের পাঁচ-সাত হাত জায়গা দখল করে ফেলল। ধোয়া পাকলা আর গোসলের জায়গাটাও ছাড়তে চায় না। ঘাটপার পুরাপুরি ছেয়ে ফেলে দেখে দবির একদিন। পানিতে নেমে তিন-চার হাত জায়গা পরিষ্কার করেছিল। সেই জায়গার টলটলে পানিতেই ধোয়া পাকলা আর নাওয়ার কাজটা করে তিনজন মানুষ। তবে খরালিকালে। বর্ষাকালে বাড়ির যেদিকটায় ইচ্ছা নামলেই হল। পানি তো চারদিকেই।
বর্ষার পানিতে এলাইচ শাক বেদম বাড়া বাড়ে। একদিকে পানি বাড়ে আরেকদিকে পালা দিয়া বাড়ে এলাইচ। দুই-চার-পাঁচদিনেই দখল করতে চায় হামিদার ধোয়া পাকলার জায়গাটুকু, ছিনিয়ে নিতে চায় গোসলের জায়গাটুকু। বর্ষার মুখে মুখে দবির তাই আরেকবার পরিষ্কার করেছে এলাইচ। কিছু রেখে কিছু উপড়ে ফেলেছে। সেই উপড়ানো এলাইচ শাক দুই-তিনদিন ধরে তরকারি করে খাওয়া হয়েছে। এখনও ঠেকা বেঠাকায় এলাইচ শাকটা যখন তখন তুলতে পারে হামিদা। ঘরে অন্য কোনও তরকারি নাই, ঘোপায় হয়তো জিয়ানো ছিল দুইটা টাকিমাছ, কোন ফাঁকে ঘোপার ভিতর মরে সিধা হয়ে গেছে উদিস পায় নাই কেউ। কোটার জন্য বের করতে গিয়া দেখে পচে গন্ধ ছুটছে। গরিবের সংসার, এই মাছই বা ফেলবে কেন? হামিদা ছুটে গেল ঘাটলায়। কয়েকমুঠ এলাইচ শাক তুলে আনল। তারপর কুইয়া (পচা) টাকিমাছের লগে এলাইচ শাকের মিশেল দিয়া এমন একটা চচ্চড়ি করল, খেয়ে দবির আর নূরজাহান তো মুগ্ধই, হামিদা নিজেও মুগ্ধ। একটু তিতা তিতা, তবে স্বাদ খুব।
