আতাহার বলল, না না আপনে খান। নিখিলা পরে খাইবো নে।
আলী আমজাদ কথা বলল না। ঠোঁটে সরু একখানা হাসি ফুঠে উঠল তার।
নিজেদের দলের মানুষ হওয়ার পরও, ছেলেবেলা থেকে একলগে বড় হওয়ার পরও, গভীর বন্ধুত্ব থাকার পরও আতাহাররা তিনজন নিখিলকে একটু অবজ্ঞা করে। লগে রাখে ঠিকই, সঠিক মর্যাদাটা দেয় না। কখনও কখনও চাকর বাকরের মতো খাটায়। হিন্দু বলে এই অবজ্ঞাটা যে নিখিলকে ওরা করতাছে পরিচয়ের পর পরই আলী আমজাদ তা বুঝে গেছে। তবে মুখে কখনও এই সব নিয়া কথা বলে নাই। নিখিলকে খেয়াল করে দেখেছে আতাহারদের অবজ্ঞা টের পায় সে। মুখটা বিষণ্ণ হয়ে যায়।
এখনও হল। সামান্য আনমনা দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইল নিখিল।
আড়চোখে নিখিলকে একবার দেখল আলী আমজাদ। চায়ে চুমুক দেওয়ার আগে। বুক পকেট থেকে সিগ্রেটের প্যাকেট বের করে নিজে প্রথমে ধরাল তারপর প্যাকেটটা ফেলে রাখল সামনে, ইচ্ছা হলে যে কেউ যেন ধরাতে পারে। কিন্তু নিখিল ছাড়া কেউ সিগ্রেট ধরাল না।
নিখিলের সিগ্রেট ধরান দেখে আলী আমজাদ বুঝে গেল মুখের বিষণ্ণতা কাটাবার জন্য সিগ্রেটটা এখন ধরিয়েছে সে। না হলে বন্ধুদের মতো চা খাওয়ার পরই ধরাত।
চায়ে চুমুক দেওয়ার ফাঁকে ঠোঁটে সরু হাসিটা আরেকবার ফুটল আলী আমজাদের। নিখিলকে উদ্দেশ্য করে মনে মনে সে বলল, মালাউন আইছস ক্যা বেডা? মোসলমান অইতে পারলি না? এইডা মোসলমানগো দ্যাশ। অহনতরি (এখন পর্যন্ত) যে তগো থাকতে দিছি এইডাঐত্তো বেশি। আবার যদি একখান রায়ট লাগে, যেই কয়জন মালাউন অহনতরি এই দ্যাশে আছে বেবাকটির গলা কাইট্টা হালামু। মাইয়াডিরে করুম গণধর্ষণ আর পুরুষডিরে কচু কাডা। মালাউনের জাত ফিনিশ। এই দ্যাশ মোসলমানগো দ্যাশ, এই দ্যাশে কোনও মালাউন রাখুম না। আমার লাহান ম্যালা মোসলমান আছে যারা হিন্দুগো দুই চোক্ষে দেকতে পারে না। উপরে উপরে খাতির দেহায় ঠিকঐ ভিতরে ভিতরে হিন্দুগো উপরে মহাখাপ্পা (ক্ষেপে থাকা)। চানস পাইলেঐ ফিনিশ কইরা দিব।
আলী আমজাদ অনেকক্ষণ চুপচাপ আছে দেখে আতাহার বলল, কী চিন্তা করেন কনটেকদার সাব?
চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে সামনে কেতলি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা বদরের হাতে কাপটা দিল আলী আমজাদ। নিখিলরে চা দে।
নিখিল বলল, আমি চা খামু না দাদা।
আলী আমজাদ কথা বলবার আগেই সুরুজ বলল, ক্যা?
এমতেঐ। সিগরেট ধরাই হালাইছি। অহন আর চা খাইতে ইচ্ছা করতাছে না।
আলমগির ছেলেটা ফুর্তিবাজ ধরনের। সারাক্ষণই গভীর আনন্দে আছে। তার কোনও দুঃখ বেদনা নাই। এই দলের মধ্যে দেখতে সবচেয়ে সুন্দর। গায়ের রঙ পাকা গয়ার (পেয়ারা) মতো। খাড়া নাক, টানা চোখ, মাথায় ঝাঁকড়া চুল। সুন্দর গলা গানের। একটা শিল্পী শিল্পী ভাব আছে। কাজির পাগলা হাইস্কুলে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছে।
নিখিল চা খাচ্ছে না দেখে সে বলল, খা বেডা। সিগরেডের লগে চা বহুত মজা।
নিখিল তবু চা নিল না।
আলী আমজাদ বলল, আরে খাও মিয়া। কীর লেইগা খাইতে চাইতাছো না বুঝি তো!
আতাহার তীক্ষ্ণচোখে আলী আমজাদের দিকে তাকাল। কীর লেইগা কন তো!
ঐযে তুমি কইলা নিখিলা পরে খাইবো।
কইছি কী অইছে? সব সময়ঐত্তো কই!
না তেমন কিছু অয় নাই। নিখিল মনে করতাছে ও হিন্দু দেইক্কা অরে তুমি সব সময় পিছে রাখো। আলমগির সুরুজ অগো লাহান দাম দেও না।
একথা শুনে হা হা করে উঠল নিখিল। ধুর দাদা কী কন? এই হগল ফালতু কথা আমি ভাবি না। অরা আমার ছোডকালের দোস্ত।
ভাবো ভাবো। আতাহার না বোজলে কী অইবো? আমি বুজি।
সুরুজ একটু থলথলা শরীরের। দেহে কথায় বোকা বোকা একটা ভাব আছে। আলী আমজাদের কথা শুনে সরল গলায় বলল, আতাহার বোজবো না এমুন জিনিস দুইন্নাইতে নাই। পলেটিকস করা পোলা। সিরাজ সিকদার পারটি করতো। বহুত রক্ষিবাহিনী মারছে।
আতাহার সম্পর্কে এই কথাটা একেবারেই নতুন শুনল আলী আমজাদ। অবাক হয়ে আতাহারের দিকে তাকাল। মুখটা দুইকান পর্যন্ত ছড়িয়ে হাসল। নিকি (তাই নাকি অর্থে)? ভাইয়ে তাইলে পলটিনেসিয়ান (পলিটিসিয়ান)? বা বা বা। জানতাম না তো!
আতাহার লাজুক গলায় বলল, আরে ধুর। কবে ছাইড়া দিছি ঐসব। তয় আমি যহন সর্বহারা পারটি করতাম তহন বিক্রমপুরে আমার বস্বের (বয়সের) ম্যালা পোলাপান ঐ পারটি করতো। শেক মজিবের মাথা আমরা খারাপ কইরা হালাইছিলাম। হাজার হাজার রক্ষিবাহিনী দিছিল বিক্রমপুরে। অরা তো আর আমগো ধরতে পারতো না, ধরতো দেশ গেরামের নিরীহ মানুষটিরে। ম্যালা অইত্যাচার রক্ষিবাহিনী বিক্রমপুরে করতাছে। তয় আমরাও ছাড়ি নাই। রক্ষিবাহিনী মাইরা বাজারের বটগাছের লগে উপরের দিকে ঠ্যাং দিয়া ঝুলাইয়া রাকছি। আপনেরা যাঐ কন, শেক মজিবররে আমি দেকতে পারি না। তার একটা হিন্দু হিন্দু ভাব আছিলো।
আলমগির সাধারণত রাগে না। রাগলে মুখ লাল হয়ে যায়, আর যার ওপর রাগে প্রথমে বেশ খানিকক্ষণ কটোমটো চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর রাগ ঝারে। আতাহারের কথা শুনে বেদম রাগল সে। মুখ লাল করে কটোমটো চোখে মাত্র আতাহারের দিকে তাকিয়েছে, আতাহার বলল, চক্কু গোরাচ (রাঙান) ক্যা বেডা? শেক মজিবের নামে মিছাকথা কইছিনি?
আতাহারের কথা শেষ হওয়ার লগে লগে বেশ জোরে তাকে একটা ধমক দিল আলমগির। নাম ঠিক মতন ক ব্যাডা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। হিন্দু হিন্দু ভাব আছিল তার, না? বেবাক ভুইল্লা গেছ? স্বাধীনতা যুইদ্ধের সময় মেলেটারিগো ঠেলা খাইয়া যহন ইণ্ডিয়ায় গেছেলা তহন এই হিন্দুরাই তোমগো জাগা দিছে। খাওয়াইয়া বাঁচাইছে। ইণ্ডিয়ার মোসলমানরা তোমগো জাগা দেয় নাই। বাংলাদেশ স্বাধীন হউক ইণ্ডিয়ান মোসলমানরা ওইডা চায় সাই। অরা চাইছে এইডা পূর্ব পাকিস্তান আছে পূর্ব পাকিস্তানই থাকুক। আর যেই মুক্তিযুইদ্ধ অইছে, মুক্তিযোদ্ধাগো টেরনিং অইছে কই রে বেডা? ইণ্ডিয়ায় অয় নাই? ইণ্ডিয়ান আর্মি হেলপ না করলে খালি আমগো মুক্তিযোদ্ধারা মাত্র নয় মাসে দেশ স্বাধীন করতে পারতো? বহুত সময় লাগতো স্বাধীন অইতে। আর বঙ্গবন্ধুর কাছে তো তগো লাহান মাইনষেরঐ বেশি রিনি (ঋণী) থাকনের কথা।
