বড়বোনের সাত ছেলে। মেয়ে নাই। সেই ছেলেরা জোয়ান তাগড়া হয়ে কেউ বাপের মতন খলিফা হয়েছে, কেউ হয়েছে মিল কারখানার শ্রমিক। কেউ দিয়েছে মুদিদোকান। সব মিলে বোনের অবস্থা মন্দ না।
বোনের কথা শুনে দবির অসহায় গলায় বলেছিল, তোমার অবস্থা আল্লার রহমতে ভালই বুজি। পোলারা বড় অইছে, ভাল রুজি রোজগার করে। আমার কাছ থিকা এডু (এতটুকু) সম্পত্তি নিয়া তুমি কী করবা? আমার তো আর কিছু নাই। দশ গন্ডা জমিন আর তিন চাইর গন্ডা ভিডা। গাছির কাম না হিগলে না খাইয়া মরতাম। এডু সম্পত্তির দাবি তুমি আর কইরো না বুজি। ছাইড়া দেও।
দবিরের কথা শুনে ভালমন্দ কিছু বলে নাই বোন। তবে দাবি নিয়া আর আসেও নাই কোনওদিন। তারপর কত কত বছর কেটে গেছে, বোনের আর কোনও খবর নেওয়া হয়। নাই। এতদিনে বোন নিশ্চয় বেঁচে নাই।
তবে বোনদের কথা মাঝে মাঝে মনে হয় দবিরের।
আজ দুপুরেও মনে হয়েছিল। ওই যে হামিদা যখন আপন মনে গজর গজর করছিল, দবির তখন ছনের ঘরটার দিকে। এই ঘরটা বাঁশঝাড়ের ওদিকটায়। উপরে গোটা ছয়েক জংধরা পুরানা ঢেউটিন দিয়া চালা করা, চারদিকে খড়নাড়ার বেড়া। বাঁশের একটা ঝাঁপ আছে। ওই ঝপ সরিয়ে ভিতরে ঢুকতে হয়। ঘর খড়নাড়ার তয় বলা হয় ছনের ঘর।
বিক্রমপুর এলাকায় এরকমই বলে।
ছন জিনিসটা তেমন হয় না বিক্রমপুরে। নদীতীরে কাশ হয় বিস্তর। কাঁশ দিয়া কুঁড়েঘরের বেড়া দেয় গরিব গিরস্তলোক, পাটখড়ি দিয়া দেয়। আর খড়নাড়া, বাঁশকঞ্চির বেড়া তো আছেই। তবু ওই সমস্ত ঘর ছনের ঘর। লোকমুখে বহু বহু বছর ধরে চলছে।
দবিরের ছনের ঘরে লাকড়িখড়ি ছাড়া আর কিছু নাই। আজ সকাল থেকে সেই ঘরে লাকড়িখড়ি গুছগাছ করছিল দবির। একটুখানি রোদের মুখ দেখা গিয়েছিল সকালবেলা। ওই দেখে দবির ভেবেছিল লাকড়িখড়ি একটু রোদে দিলে হামিদার রান্নাবান্নার সুবিধা হবে। নূরজাহানকে নিয়া হাত লাগিয়েছিল। বাপমেয়ে মিলে রোদে মেলে দিয়েছে লাকড়িখড়ি, আধঘণ্টাও হয় নাই, বাঁশঝাড়ের মাথার ওপর ভেসে এল কালিবাউস মাছের মতন এক টুকরা মেঘ। সূর্যের আলো ঢাকা পড়ে গেল। বড় বড় ফোঁটায় হঠাৎ করেই ঝমঝমায়া এল বৃষ্টি। বাপ মেয়ে হচড়পাঁচড় করে লাকড়িখড়ি টেনে নিয়েছে ঘরে। নিতে নিতে লাকড়িখড়ি তো ভিজলই, বাপমেয়েও ভিজে চুবচুবা।
ওদিকে হামিদা রান্না সামলাতে পাগল হচ্ছে রান্নাচালায়।
খরালিকালে এইসব ঝামেলা নাই। লাকড়িখড়ির দিকে মনোযোগ দিতেই হয় না। উঠান পালানের যেখানে ইচ্ছা পড়ে থাকে। রোদে শুকিয়ে শুকিয়ে এমন অবস্থা হয়, চুলায় দেওয়ার লগে লগেই দাউদাউ করে জ্বলে উঠে। রান্না করতে বিরাট আরাম।
ছনের ঘরের পুবপাশে ছোট্ট একটা নাড়ার পালা। দবির অতিছোট গিরস্ত। দশ গন্ডা জমিতে ইরি ফলায়। ইরি হচ্ছে একফসলি। ধান যা হয় কষ্টেসৃষ্টে তিনজন মানুষের বছর। চলে। শীতের দিনে আছে রসের কারবার। সব মিলিয়ে দিন চলে যায় আর কী!
তবে ওই দশ গন্ডা জমির ধানের লগে ভঁটি নাড়াটাও অতিযত্নে বাড়িতে নিয়া আসে দবির। ছোট্ট করে একটা পালা দেয় ছনের ঘরটার পাশে। লম্বা একটা বাঁশ পুঁতে তার চারপাশে উঁটি নাড়া সাজিয়ে সাজিয়ে উঁচু করে পালা। বছর ভর এই পালার উঁটি আর নাড়া পোড়ে রান্নাচালায়। কখনও বউন্নার ডাল, হিজলের ডাল আর বাড়ির নামার দিককার ঝোঁপঝাড় কেটে এনে উঠান পালানে শুকিয়ে লাকড়িখড়ি করে দবির। শীতকালে খাজুরের ডালপালা বহন করে আনে বাড়িতে। সব মিলিয়ে এই হচ্ছে দবির গাছির সংসার জীবন।
এখন তামাক টানতে টানতে শ্রাবণ মাসের বৃষ্টি ভিজা দুপুরের পর নিজের এই সংসারটা চোখের উপর দেখছিল দবির।
ওই যে বাপের লগে লাকড়িখড়ি তুলতে গিয়ে ভিজে একসা হল নূরজাহান, তারপর সংসারের আর কোনও কাজই করে নাই সে। ভিজা কাপড়েই বাড়ির সামনের দিকটায় নেমে গেছে। সেখানে বর্ষার টলটলা পানিতে টুপুর টাপুর পড়ছিল বৃষ্টি। বৃষ্টি আর বর্ষার পানি দাপড়ায়া অনেকক্ষণ ধরে গোসল করেছে মেয়ে। ঘরে গিয়া শুকনা শাড়ি পরে ভিজা শাড়ি রেখে দিয়েছে চৌকাঠে। চিৎকার করে হামিদাকে বলছে, এই বিষ্টিতে আমি আর বাইর অইতে পারুম না মা। আমার কাপড় ধুইয়া দিয়ো।
একদিকে রান্না সামলানোর ঝামেলা আরেকদিকে মেয়ের ওই কথা, হামিদা যে কী চেতাটা চেতলো! তুবড়ির মতন মুখ ছুটল তার। ওই বান্দরনির ঘরের বান্দরনি, আমি তর চাকর? কীর লেইগা আমি তর কাপড় ধুইয়া দিমু? নিজের কাপড় নিজে ধুইতে পার না? ঠোকনা দিয়া চোপা ভাইঙ্গা হালামু!
এইসব গালাগাল নূরজাহানের গায়ে লাগে না। সে জানে যত গালাগাল আর চেতাচেতিই করুক ঠিকই তার কাজটা মা করে দিবে। তার বলা সে বলেছে, মা’র গালাগাল মা করছে, তারপরও কাজটা ঠিকই হবে। ওই নিয়া সে আর মাথাই ঘামায় নাই। পরিপাটি হয়ে চৌকিতে উঠে বসেছে।
তারপর ধীরে ধীরে একটার পর একটা কাজ শেষ হয়েছে সংসারের। ভাত তরকারি ঘরে এনে গোসল করতে গেছে হামিদা। যাওয়ার সময় ঠিকই হাতে করে নিয়া গেছে চৌকাঠে রাখা মেয়ের ডুরেশাড়ি। গোসল সেরে নিজের শাড়ির লগে কোনওরকমে মেলে দিয়েছে ঘরের ভিতর। লগে স্বামীর লুঙ্গি গামছাটাও ছিল।
দবিরের লুঙ্গি গামছা দবির অবশ্য নিজেই ধুয়ে এনেছিল।
তিনজন মানুষ তারপর চট করেই তাদের খাওয়াদাওয়া শেষ করেছে। খাওয়াদাওয়া শেষ হওয়ার পর জুঠা থালবাসন নিয়া পুকুরঘাটে রওনা দিয়েছে হামিদা। এই কাজটা সে ধীরেসুস্থে করে। আজ বৃষ্টির যা ভাবগতিক, ধীরেসুস্থে করার জো নাই। কখন ঝমঝমায়া আসবে, দেখা গেল সন্ধ্যা হয়ে গেছে তাও থামছে না, তখন কাজটা আটকে যাবে। জুঠা থালবাসন ঘরে পড়ে আছে, কল্পনাই করতে পারে না হামিদা।
