নূরজাহান তারপর বাঁশঝাড়টার দিকে তাকাল।
বাঁশঝাড়ের এদিক ওদিক ছড়ানো তিনটা আমগাছ। দক্ষিণ দিককার নামার দিকে একটা কদমগাছ, একটা বউন্না (বরুণ) আর গলা জড়াজড়ি করা দুইটা হিজলগাছ। বৃষ্টিতে ধুয়ে চকচকা হয়ে আছে আমের গাঢ় সবুজপাতা আর গোটায় গোটায় ভরে গেছে হিজল বউন্নার গাছ। বউন্নার গোটাগুলি রাজহাঁসের ডিমের মতন। হিজলগোটা সবুজ, ছোট ছোট। সেই। গোটা টুপটাপ ঝরছে বর্ষার পানিতে, স্রোতের টানে চলে যাচ্ছে এদিক ওদিক। পচে গলে পানিতে মিশছে।
কদমগাছটা ভরে গেছে ফুলে ফুলে। হাওয়ায় কদমফুলের মৃদু গন্ধ। বাঁশঝাড়ের উপর শ্রাবণ মাসের আকাশ পোড়ামাটির মতন। সাদা কালো মেঘ একাকার হয়ে আছে। মেঘের ছায়ায় আকাশের তলায় পড়ে থাকা দুনিয়া বিষণ্ণ হয়েছে। সেই আলোয় জঙ্গলের আড়াল থেকে বের হয়ে এল একটা কোষানাও। নাওয়ের মাঝখানে সবুজ লুঙ্গি আর সাদা পাঞ্জাবি পরা যে মানুষটা বসে আছে তাকে কেমন চেনা চেনা লাগে। রোদবৃষ্টি নাই তবু মাথার উপর ছাতি ধরে রেখেছে। নাও বাইছে কামলা ধরনের একজন লোক। তার কালো রঙের শরীর রোগাপটকা, মুখ অন্ধকার হয়ে আছে দাড়িমোচে। কোষানাও যত আগায় লোকটার বইঠার শব্দ তত স্পষ্ট হয়।
কোষানাওটা কি এই বাড়ির দিকেই আসছে!
নৌকা যত আগায় লোকটা তত স্পষ্ট হয়। পাঞ্জাবি পরা লোকটাকে তারপর চিনতে পারল নূরজাহান। কাজির পাগলার ল্যাংড়া বসির, বসির ঘটক!
সে কেন এই বাড়ির দিকে আসছে!
বুকটা ধক করে উঠল নূরজাহানের। তা হলে কি তার বিয়ার সমন্দ নিয়া আসছে বসির? এই বয়সেই কি বিয়া হয়ে যাবে নূরজাহানের! কার লগে হবে? জামাই কেমন হবে? কোন গ্রামের পোলা?
পলকের জন্য মজনুর কথা মনে পড়ল নূরজাহানের। মজনুর সরল সুন্দর মুখোন ভেসে উঠল চোখের সামনে। কতদিন সেইমুখ দেখে না নূরজাহান। সেই যে মান্নান মাওলানার মুখে থুতু ছিটিয়ে দিল, সেই যে বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ হল, তারপর কতদিন কেটে গেছে। শীতকাল খরালিকাল গিয়া বর্ষাকাল এল, এই এতদিনে নিশ্চয় কয়েকবার বাড়ি আসছে মজনু, নূরজাহানের লগে দেখা হয় নাই।
মজনুর কথা ভেবে আশ্চর্য এক অভিমানও হল নূরজাহানের। সে নিশ্চয় শুনেছে নূরজাহানের কথা। মরনি আম্মা কি আর না বলছে! সব শুনেও সে একবার এই বাড়িতে এল না! নূরজাহানের একটু খবর নিল না! নূরজাহান কেমন আছে জানার চেষ্টা করল না! কী হত একবার এলে!
ঠিক আছে, না আইছে না আহুক। আমিই বা ক্যান ভাবুম তার কথা। সে আমার কে!
মজনুর কথা মন থেকে মুছে ফেলতে চাইল নূরজাহান, চোখ থেকে মুছে ফেলতে চাইল তার মুখখানি।
ল্যাংড়া বসিরের কোষানাও তখন সত্যি সত্যি নূরজাহানদের বাড়ির দিকে আগাচ্ছে।
.
খাওয়াদাওয়ার পর নিজের তামাকটা আজ নিজেই সাজিয়েছে দবির।
হামিদাকে যে বলবে, ও নূরজাহানের মা, আমার তামুকটা হাজাইয়া দেও, বলতে পারে নাই। বৃষ্টিবাদলার দিনে সংসারের ম্যালা কাজ আগেভাগেই সেরে রাখতে হয়। কখন বৃষ্টি নামবে, কখন আটকে যাবে হাতের কাজ, এই এক ভয়।
এই ভয়েই হামিদা ব্যস্ত হয়ে গেছে তার কাজে। দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর কিছুটা সময় অলস কাটে তিনজন মানুষের। দবির বসে থাকে দাওয়ায়, হামিদা আর নয়তো নূরজাহান সাজিয়ে দেয় তার তামাক। আরও কিছুক্ষণ পর নূরজাহান একটু ঘুমায়, হামিদা জুঠা থালবাসন নিয়া যায় পুকুরঘাটে আর দবির বসে বসে অনেকক্ষণ ধরে তামাক খায়।
আজ ব্যাপারটা গেছে উলটাপালটা হয়ে।
সকাল থেকে এই আসে বৃষ্টি, এই যায়। রান্নাচালায় বসে অতিকষ্টে দুপুরের রান্না করেছে। হামিদা। চারদিক খোলা চালার এদিক দিয়া বৃষ্টির হেচলা (ছাট) আসে, ওদিক দিয়া আসে। চুলার আগুন এই নিভে, ওই নিভে। ভাত তরকারির হাঁড়ি থেকে সরা উঠাবার জো নাই। সরা উঠালেই হেচলায় হেলায় বৃষ্টির পানি এসে পড়বে হাঁড়িতে। ওদিকে লাকড়িখড়ি ভিজে একসা। যে রান্না ঘণ্টাখানেকের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা সেই রান্না শেষ হতে লেগে যায় দুইঘণ্টার উপর। ততক্ষণে হামিদার মেজাজ দাঁড়াশ সাপের মতন তিরিক্ষি। বৃষ্টির হাত থেকে রান্না সামলায় আর খ্যাচর খ্যাচর করে। এমুন মাইনষের লগে সংসার কইরা গেলাম, একখান। ভাল রানঘরও বানাইয়া দিতে পারলো না। জিন্দেগিডা গরবাদ (বরবাদ) অইয়া গেল!
হামিদার এসব কথায় দবিরের মনও যে খারাপ না হয় তা না। হয়, খারাপ হয়। কী করার আছে। গরিব মানুষের ঘরে জন্মেছিল। বাপের আমলের জায়গা সম্পত্তি বলতে এইটুকু ভিটা আর ওইটুকু জমিন। তাও আল্লায় রহম করছে, আর কোনও ভাই নাই দবিরের। দুইটা বোন ছিল। দুইজনই দবিরের বড়। অল্পবয়সেই দুইজনকে বিয়া দিয়া দিছিল বাবা। একজনের স্বামী ছিল খলিফা (দরজি)। বিক্রমপুরেরই লোক। বাড়ি ছিল নওপাড়া। খলিফাগিরি করত লালমণির হাটে। বিয়ার পর বউ নিয়া লালমণির হাটে চলে যায়। সেখানেই ঘরবাড়ি করে, সেখানেই থেকে যায়। মা-বাবা বেঁচে থাকতে বোনটা দু’-চার বছরে এক-আধবার আসত। হামিদাকে বিয়া করে দবির যখন নিজের সংসার সাজিয়েছে তারপর আর কোনওদিন আসে নাই। বেঁচে আছে না মরে গেছে সেই খবরও জানে না দবির।
মেজোবোনটার বিয়া হইছিল ভাঙ্গা থানার ওদিককার এক গ্রামে। বিয়ার পরের বছরই বাচ্চা হওয়ার সময় মারা যায়। দবিরের এইটুকু সম্পত্তির সামান্য ওয়ারিশ বোনরাও। তবে কেউ কখনও সেই দাবি নিয়া আসে নাই। মেজোবোনটা তো মারাই গেল। বাচ্চাকাচ্চা রেখে যায় নাই। বোনের মৃত্যুর মাস তিনেক পর বোনজামাই আবার বিয়া করল। সেই বোনের পক্ষ থেকে কে আসবে জায়গাসম্পত্তির দাবি নিয়া! বড়বোন অবশ্য একবার চাড়ি (হুজুগ) তুলছিল। বাবার মৃত্যুর পর একবারই আসছিল সে। বলছিল, কী রে দউবরা, আমার ভাগের সম্পত্তি আমারে দিবি না?
