ওই নিয়া কোনও মনোকষ্ট নাই বসিরের। সে আছে বেশ। ঘটকালির কাজে খুব নাম করেছে। রুজি রোজগার ভাল। এমনিতে গিরস্তি করে, ফাঁকে ফাঁকে করে ঘটকালি। দুইদিক দিয়া রোজগার। বাড়িতে দোতালা ঘর তুলছে।
বসির এসে এই ঘরে ঢোকার পর বেশ খানিকটা সময় কেটেছে, মান্নান মাওলানা তাকে বসতে বলেন নাই। তবু একসময় পালঙ্কের কোণে বসল বসির। বসে বলল, হুজরানি মরণে আপনে মনে অয় এক্কেরে ভাইঙ্গা পড়ছেন হুজুর, না?
মান্নান মাওলানা চমকালেন। কেমতে বুজলি?
অনেকক্ষুন খাড়ই রইলাম, আপনে আমারে বইতে কইলেন না!
সত্যঐ?
হ।
ওই দেক, আমি খ্যাল করি নাই।
হেইডা আমি বুজছি। বুইজ্জা নিজেঐ বইয়া পড়লাম। আপনের লেইগা ইট্টু মায়াও লাগল।
ক্যা?
আপনে মাশাল্লা অহনও আমগো থিকা বেশি জুয়ানমর্দ। এই বয়সে হুজরানি মইরা গেল, আপনের দশা তো খারাপ অইয়া যাইবো।
মান্নান মাওলানা কপট দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। যাইবো কী রে, গেছেঐত্তো। আমার দশা তো আসলেঐ খুব খারাপ।
হ হেইডা আমি আপনের মোক দেইক্কাঐ বুজছি। তয় বেদ্দপি লইয়েন না হুজুর, একহান কথা কই। আপনে আবার বিয়া করেন।
মান্নান মাওলানা হাসলেন। ধুর বেড়া। মাইনষে কইবো কী?
কী কইবো মাইনষে! আমগো ধর্মে চাইরহান বিয়া জায়েজ। আপনে একহান করছিলেন, বউ মইরা গেছে দেইক্কা আরেকহান করছেন। এইডা লইয়া কে কী কইবো?
মান্নান মাওলানা গম্ভীর হলেন। আরে না বেডা, আমারে আবার কে কী কইবো! ওই হগল কওয়াকওয়ির আমি ধার ধারিনি। কথায় কথায় কইলাম আর কী! হোন, নিজের বিয়ার চিন্তা আমার আছে। হেইডা তরে পরে কইতাছি। তার আগে দুই পোলার বিয়ার কথা কইয়া লই। আতাহার আর আজাহার দুই পোলারে এক লগে বিয়া করামু। তারবাদে। করুম নিজে।
শুনে বসির মহাখুশি। ইস একলগে তিনহান বিয়ার কাম পাইলাম। এমুন কোনওদিন অয় নাই। হুজুর, কেঐরে কন এককাপ চা দিতে। ম্যাগ বিষ্টির দিন, ইট্টু চা খাই। চা খাইতে খাইতে কথা কই।
ঠিক আছে।
মান্নান মাওলানা চিৎকার করে রহিমাকে ডাকলেন। রহি, ওই রহি, দুই কাপ চা দে।
তারপর বসিরের দিকে তাকালেন। অহন হোন দুই পোলার লেইগা কেমুন মাইয়া চাই আমি।
বসির হাসল। আপনের কওন লাগবো না, আপনে আমার কাছ থিকা হোনেন কেমুন মাইয়া আমি দিমু। দেহেন আপনের কথার লগে আমার মিলে কি না।
মান্নান মাওলানাও হাসলেন। আইচ্ছা ক।
মাইয়া দেকতে সোন্দর, জাতপদ ভাল আর বাপ অইলো ধনী। পোলাগ য্যান সোনাদানা, দরকার অইলে নগদ টেকা আর নাইলে দুই-চাইর কানি জমিন দিয়া দেয়। কী, ঠিক না?
একদোম ঠিক, একদোম।
আছে, এমুন মাইয়া আমার হাতে পাঁচ-সাতহান আছে।
হেই পাঁচ-সাতহান থিকা ভাল দুইহান বাইর কর।
কইরা হালামু। আপনে চিন্তা কইরেন না। তয় বিয়া পোলাগো কবে করাইবেন? আজাহার আইবো কবে? বাইষ্যাকালেঐ?
বিয়া ঠিক অইলেঐ আইবো। তয় বাইষ্যাকালে পোলাগো বিয়া আমি করামু না। ম্যাগ বিষ্টির দিনে বিয়াশাদির কাম ভাল অয় না। অহন মাইয়া মুইয়া দেইক্কা কথাবার্তি পাকা কইরা রাখুম, বিয়া করামু পউষ-মাগ মাসে।
হ হেইডাঐ ভাল।
টিনের থালায় করে দুই কাপ চা নিয়া এল রহিমা। নিঃশব্দে পালঙ্কের উপর নামিয়ে রেখে চলে গেল।
একটা কাপ হাতে নিয়া মান্নান মাওলানা বললেন, চা খা বছির।
চায়ের কাপ নিয়া ফুক করে চুমুক দিল বছির। এইবার নিজে কেমুন বউ চান হেইডা কন হুজুর! আছে, আপনের পদের মাইয়াও আমার হাতে বিস্তর আছে।
চায়ে চুমুক দিয়া মান্নান মাওলানা গম্ভীর গলায় বললেন, আমার লেইগা মাইয়া তর দেহন লাগবো না। মাইয়া দেহা আছে।
চায়ে চুমুক দিতে গিয়া থামল বসির। জে?
হ। মাইয়া আমার পছন্দ করা। তুই খালি ঘটকালি করবি।
আইচ্ছা ঠিক আছে। কোন গেরামের মাইয়া? বাপের নাম কী?
বড় করে চায়ে চুমুক দিলেন মান্নান মাওলানা। মাইয়া আমগো গেরামেরঐ। বাপের নাম দবির, দবির গাছি। আর মাইয়ার নাম নূরজাহান।
শুনে ল্যাংড়া বসিরের মতন বারো ঘাটের পানি খাওয়া ঘাঘু লোকটা তরি থতমত খেয়ে গেল। চায়ে চুমুক দেওয়ার কথা আর মনে রইল না তার। ফ্যালফ্যাল করে মান্নান। মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই টিনের চালে ঝমঝম করে নামল আষাঢ় মাসের কোদাইল্লা (কোদালে) বৃষ্টি।
.
দ্বিতীয় পর্ব সমাপ্ত
৩.১ ভরা বর্ষার পানি
তৃতীয় পর্ব
ভরা বর্ষার পানি ভেঙে ওপারের জঙ্গলে যায় বিশাল এক দাঁড়াশ সাপ।
জঙ্গলের দিকে এখনও জেগে আছে কিছুটা শুকনা জমি। পুরাপুরি ডোবে নাই। সেই জমিতে ইঁদুর ব্যাঙের কমতি নাই। একবার গিয়া উঠতে পারলে ছোবলে ছোবলে ব্যাং ধরবে দাঁড়াশ, ইঁদুর ধরবে।
হিজল ডুমুরের ঝোপে বাসা বেঁধেছে কানিবক। এই এতদূর থেকেও দেখা যায় দুইটা ছাইবর্ণের বকপাখি পালা করে ছানাদের জন্য খাবার নিয়া আসে। একটা পাখি যায়, একটা আসে। ইঁদুর ব্যাং না পেলে দাঁড়াশ সাপ হিজল ডুমুরের ডালপালা বেয়ে নিঃশব্দে চলে যাবে। বকের বাসার কাছাকাছি। ছোবলে ছোবলে গিলবে বকের তুলতুলে ছানা। জগতের আলো দেখবার আগেই অন্ধকার এক জগতে চলে যাবে ছানাগুলি। সেই জগৎ থেকে ফিরে আসার কোনও পথ নাই।
এসব ভেবে নূরজাহানের একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। দুপুরের পর থেকেই বড়ঘরের চৌকিতে বসে আছে সে। জানালা দিয়া বাইরে তাকিয়ে আছে। জানালাটা পুবমুখী। এদিক দিয়া তাকালে ওপারের ওই জঙ্গুলে জায়গাটা পরিষ্কার দেখা যায়। বর্ষার টলটলা পানি বাড়ির নাম থেকেই শুরু হয়েছে। এই পানিতে কোনদিক থেকে এল সাপটা! নূরজাহানদের বাঁশঝাড়তলাতেই ছিল! ইঁদুর ব্যাং কিছু না পেয়ে জঙ্গলের দিকে রওনা দিয়েছে!
