আজ কয়দিন ধরেই এই অবস্থা। বাড়ির উঠান পালান বৃষ্টি কাদায় পিছল। সড়কের এপাশ ওপাশের চকে মাঠে খাল দিয়া এসে ঢুকছে বর্ষার পানি। লগে আছে বৃষ্টি। পুকুর ডোবানালা সব ডুবেছে। পুকুর আর ডোবানালার উপচানো পানিও ঠেলে উঠছে চকে। কোনও কোনও গিরস্তে পুকুরে ডুবিয়ে রাখা নাওদোন তুলে তাতে গাব আলকাতরা মাইট্টা তেল দিয়া ফেলছে। চকে নৌকাও নেমে গেছে।
আজ সকালে হাফিজদ্দি টেনে তুলেছে মান্নান মাওলানার কোষানাও। তুলে পানি সেচে বিনীত ভঙ্গিতে এসে দাঁড়িয়েছিল মান্নান মাওলানার সামনে। গাব আলকাতরা নাইলে মাইট্টাতেল কোনও একহান তো কোষাড়ায় দিতে অয় হুজুর।
মান্নান মাওলানা বিরক্ত মুখে বলেছেন, দিতে যে অয় তা তো বোজলাম। তয় এই ম্যাগ বিষ্টিতে দিবি কেমতে? একমিহি দা দিবি আরেক মিহি দা ধুইয়া নিব। লাবটা কী!
হ কথা ঠিক। তয় কী করুম? গোরু তো অহন আর চকে নেওন যায় না! বেক ডুইব্বা গেছে। গোরুডি থাকে আথালে। গোরুর ঘাস কচুরি আননের লেইগা কোষাড়া লাগে।
তা তো লাগবোঐ। এক কাম কর, গাবগোব আলকাতরামালকাতরা না দিয়াঐ নামাইয়া হালা। কাম চলতে থাউক।
আইচ্ছা।
আথালের চালের দিকে লম্বালম্বি করে রাখা একখান শক্তপোক্ত লগি আর বড় ধরনের একখান বইঠা বের করে কোষানাও নিয়া পুবের চকে গোরুর ঘাস আনতে চলে গেছে। হাফিজদ্দি। দুপুরের দিকে মেঘবৃষ্টিতে ভিজে একসা হয়ে ঘাস কচুরি নিয়া ফিরছে।
কাজ লোকটা মন্দ করে না। দুপুরের পর থেকে ঘরের পালঙ্কে বসে বসে হাফিজদ্দির কাজ খেয়াল করেছেন মান্নান মাওলানা। একটু ঢিলা জুতের লোক। তবু মন্দ চালাচ্ছে না কাজ।
তহুরা বেগম মারা যাওয়ার পর সংসারটা এলোমেলো হয়ে গেছে, বাড়িটা হয়ে গেছে। নীরব নিথর। যদিও তহুরা বেগম ছিলেন একেবারেই চুপচাপ স্বভাবের মানুষ। নরম, নিরীহ। গলা প্রায় শোনাই যেত না তার। বাড়িতে আছেন কি নাই বোঝাই যেত না। তবু সংসারের কী তো! হার্টের অসুখ হওয়ার পর শুয়েই থাকতেন বেশির ভাগ সময়। দরকার ছাড়া ঘর থেকে বেরুতেন না। তবু সংসারের সবদিকে নজর ছিল। কোনদিন কী রান্না হবে, কে কী খেতে পছন্দ করে, পারুর বাচ্চাগুলির ঠিকঠাক মতন খাওয়া হল কি না, শুয়ে শুয়েই সব খোঁজখবর নিতেন তিনি।
মৃত্যুর কয়েকদিন আগ থেকে তো বেশ চটপটে হয়ে উঠেছিলেন। আতাহারের লগে পারুর বিয়া ঠিক করে অতি উৎসাহে নতুন করে শুরু করেছিলেন জীবন। মৃত্যু এসে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল।
মৃত্যু এসে নিয়ে গেল নাকি জোর করে মেরে ফেলা হল তাঁকে! সেদিন নিশ্চয় বড়ঘরের দিকে ফিরতে ফিরতে বাপছেলের কথাবার্তা শুনতে পেরেছিলেন তিনি। শুনে প্রথমে নিশ্চয় হতভম্ব হয়েছেন, তারপর যখন দেখেছেন স্বামী তার লগে বেইমানি করছেন, পেটের ছেলে। করছে, সেই কষ্ট আর সহ্য করতে পারেন নাই। আচমকা এতবড় আঘাত, এতবড় স্বপ্ন তছনছ হয়ে যাওয়া, লগে লগে হার্টঅ্যাটাক।
আজ সকাল থেকে এসব কথা ভেবেছেন মান্নান মাওলানা। মানুষের জীবনই এমন। আজ মরলে কাল দুইদিন। তহুরা বেগম মারা গেলেন এই সেদিন, তারপরও চোখের পলকে যেন দিনগুলি চলে গেল। আগামী রোববার চল্লিশদিন হবে।
তহুরা বেগমের মৃত্যুর জন্য কি তিনি দায়ী, নাকি আতাহার! না কি তারা দুজনেই দায়ী! দুইজনেই তাঁরা চালাকি করেছিলেন একজন সরল সোজা ইমানদার মানুষের লগে। বেইমানি করেছিলেন। বেইমানিটা করতে তাদের দুইজনকে বাধ্য করেছিল কে? করেছিল পারুল। মোতাহারের বিধবা বউ পারু। নিজের স্বার্থে আতাহারের লগে তার বিয়ার ব্যাপারটা তহুরা বেগমের মাথায় ঢুকিয়ে ছিল। নয়তো তাঁর মতো সহজ সরল মানুষের পক্ষে এত ঘোরপ্যাঁচের বিয়ার কথা ভাবা সম্ভব ছিল না।
আজ দিনভর এসব ভেবে মান্নান মাওলানা নিজে নিজে সাব্যস্ত করেছেন আসলে তহুরা বেগমের মৃত্যুর জন্য পারুলই দায়ী। আতাহারকে পুরাপুরি কবজা করার লোভে কাজটা সে করেছিল। লাভের লাভ তো কিছু হল না। ক্ষতি হল। আতাহার অয় মান্নান মাওলানা দুইজনের কাছেই খারাপ হয়ে গেল সে। চিরকালের খারাপ।
এখনও কি কদমগাছের দিকে তাকিয়ে এসবই ভাবছিলেন মান্নান মাওলানা? এজন্যই কি উঠান থেকে ভেসে আসা ডাকটা শুনেও সাড়া দিলেন না!
যে ডাকছিল সেই মানুষটা তারপর বড়ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। হুজুর, হুজুর! আছেননি ঘরে?
মুখ ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকালেন মান্নান মাওলানা। কেডা?
তারপরই মানুষটাকে চিনতে পারলেন। কাজির পাগলার ঘটক, ল্যাংড়া বসির।
বসিরকে দেখে খুশি হলেন মান্নান মাওলানা। ও বছির! আয় আয়। আরে বেডা তরে ঐত্তো বিচড়াইতাছি।
বসির তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাসল। হাতের ছাতা বুজিয়ে দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে ভিতরে ঢুকল। আপনে যে আমারে বিচড়াইতাছেন হেই সমবাত আমি পাইছি।
তয় আহচ নাই ক্যা?
আহি নাই আপনের পরিবারের মরণের কথা হুইন্না। যেই কামের লেইগা মাইনষে আমারে বিচড়ায়, মরা বাইত্তে হেই কামডা সহজে অয় না। এর লেইগাঐ দেরি কইরা আইলাম।
বসিরের পরনে সাদাশার্ট আর চেকলুঙ্গি। শার্টটা ফুলহাতা, তবে হাতা কনুইয়ের ওপর তরি গুটানো। শার্টের পকেটে রমনা সিগ্রেটের প্যাকেট দেখা যাচ্ছে। হাসিহাসি মুখোন নিখুঁত করে কামানো। জন্ম থেকেই ডান পায়ের তুলনায় বা পা-টা একটু ছোট। হাঁটতে হয়। বসিরকে ল্যাংড়াইয়া (লেংচিয়ে)। এজন্য দেশগ্রামে নাম পড়েছে ল্যাংড়া বসির।
