একটু চুপ করে থেকে বললেন, তর মা’য় কি অহনতরি পারুর ঘরে?
হ।
কী করে?
কেমতে কমু! মনে হয় ভাবিছাবের লগে কথাবার্তা কয়। কয়দিন ধইরা দুইজনের লেইগা দুইজনের বহুত টান অইছে।
কেমুন টান?
দিনে দুই-তিনবার ভাবিছাবের ঘরে যায় মা’য়। আপনে না থাকলে ভাবিছাবে আহে এই ঘরে। মা’র মাথায় তেলপানি দিয়া দেয়। ভালভালাই খাওয়ায়।
মান্নান মাওলানা হাসলেন। সত্যঐ?
হ।
দুইজনে আছে একরকমঐ মনের সুকে। তয় তর আর আমার লগে যেই কথাবার্তা হইছে হেইডি মনে আছে তো?
আতাহার মাথা নীচা করে বলল, আছে। আপনে যেমতে যেমতে কইছেন অমতে অমতেঐ মা’র লগে কথা কইছি।
চালাকিডা হেয় বোজে নাই তো?
না। কেমতে বুজবো? এই হগল চালাকি হের বোজনের কথা না। মা’য় অইলো সোজা জুইতের মানুষ। ভাবিছাবের লগে আমার বিয়ার চিন্তাডাও তার মাথায় আহে নাই। আইছিল ভাবিছাবের মাথায়। ভাবিছাবেঐ বুদ্দি মা’রে দিছে।
কচ কী?
হ।
পারু কইছে তরে?
কইতে চায় নাই। বহুত কায়দা কোয়দা কইরা বাইর করছি।
আমিও তো কই, এমুন চিন্তা ভোতর মা’র করনের কথা না! এত প্যাঁচঘোচ তার বোজনের কথা না। নষ্টের নারদ তাইলে পারু!
হ।
কামডা ও ভাল করে নাই। এই চালাকির লেইগা জীবনভর ফস্তাইতে হইবো। যাও বড়পোলার বউ হিসাবে, আততিয়র মাইয়া হিসাবে অর লেইগা মায়া মহব্বত আমার আছিলো, আইজ থিকা হেইডা আর থাকব না। ও আমার মন থিকা উইট্টা গেল।
তয় আমার মনে অন্য একহান চিন্তা অইছে।
কী?
মা’য় আর ভাবিছাবে যহন দেখবো তারা যা চাইছে হেইডা অইতাছে না, তহন তো বাইত্তে একহান কেলেঙ্কারি লাগবো। হেইডা হামলাইবেন কেমতে? মা’য় তো হাটের রুগি। যুদি ইসটোক কইরা মইরা যায়?
ঠিক তখনই পারুর ঘর থেকে পান মুখে বেরিয়েছেন তহুরা বেগম। হাসিহাসি মুখে বড়ঘরের দিকে ফিরছিলেন। ঘরের কাছাকাছি এসেই শুনতে পেলেন বাপ ছেলে কথা বলছে। আতাহারের শেষদিককার একটা-দুইটা কথা তাঁর কানে এল, তারপর এল মান্নান মাওলানার কথা। থো, এই হগল চিন্তা করি না। মরলে মইরা যাইবো। তর মা’র মরনের চিন্তা কইরা আমি তর জীবন নষ্ট করুমনি? ধনীঘরের মাইয়া আনলে মাইয়ার লগে সোনাদানা টেকাপয়সা খেতখোলাও আইবো সংসারে। পারুর লেইগা আর তর মা’র লেইগা এতবড় লোসখান আমি করুমনি?
আমিও করুম না বাবা। আমি আছি আপনের লগে। আপনে যা করবেন ঐডাঐ সই। তয় যতদিন সম্ভাব মা’র লগে আর ভাবিছাবের লগে চালাকিডা কইরা যাওন লাগবো।
বাইরে দাঁড়িয়ে ছেলে আর ছেলের বাপের এসব কথা শুনতে শুনতে তহুরা বেগমের শুধু মনে হল, এতদিনকার স্বামী আর গর্ভে ধরা ছেলে শেষ তরি এই করল তার লগে! এই করল! স্ত্রীর লগে কোনও স্বামী করে এই চালাকি? আর স্বামী যদি করেও, গর্ভের সন্তান কি করে!
বুকের ভিতরকার হৃদযন্ত্রটি তখন অদৃশ্য এক শক্তিশালী হাত যেন থাবা দিয়া ধরছে। তহুরা বেগমের। সেই থাবায় যেন পলকে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাচ্ছে তার বহুকালের পুরনা হৃদযন্ত্র। দম বন্ধ হয়ে আসে তহুরা বেগমের। হাত পা শরীর অবশ হয়ে আসে। নিজেকে ধরে রাখতে গিয়েও পারেন না তিনি, উঠানের মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
গোলাঘর থেকে এই দৃশ্য দেখতে পায় রহিমা। দুপুরের ভাত খেয়ে খানিক আগে এই ঘরে এসে ঢুকেছে সে। চৌকিতে বসে আঁচলের গিঁট খুলে পানটুকু মাত্র মুখে দিবে, খোলা দরজা দিয়া চোখ গেছে উঠানের দিকে, দেখে হুজরানি লুটিয়ে পড়ছেন মাটিতে। সব ভুলে চিৎকার করে ছুটে বেরিয়েছে সে।
রহিমার চিৎকারে বড়ঘর থেকে দৌড়ে বেরুল আতাহার আর মান্নান মাওলানা। দিকপাশ না তাকিয়ে আতাহার টেনে কোলে তুলতে গেল মা’কে, থতমত খেল! ফ্যালফ্যাল করে তাকাল মান্নান মাওলানার দিকে।
ছেলের দিকে মান্নান মাওলানা তাকালেন না। ঝুঁকে পড়লেন স্ত্রীর মুখের দিকে। নাকের কাছে হাত নিলেন, বুকে হাত দিলেন, ডানহাত তুলে নাড়ি দেখার চেষ্টা করলেন। তারপর দিশাহারা হয়ে গেলেন।
উঠানে তখন সারাবাড়ির লোক জড়ো হয়েছে। বউঝি পোলাপান মিলে বেশ একখান ভিড়। কারও মুখে কোনও কথা নাই, শব্দ নাই। মা’র মাথা কোলে জড়িয়ে পাথর হয়ে আছে আতাহার।
এসময় ডুকরে কেঁদে উঠলেন মান্নান মাওলানা। আতাহার রে, তর মা’য় তো নাই! তর মা’য় তো চইলা গেছে রে বাজান!
চারদিককার আকাশ তখন ছেয়ে আসছিল বৈশাখের কালো মেঘে। গুমোট গরমে হাঁসফাস করছিল মানুষ আর প্রকৃতি। যখন তখন উঠবে ঝড়। দমকা হাওয়ায় হাওয়ায় লন্ডভন্ড হবে মানুষের সাজানো ঘরবাড়ি, গাছের ডালপালা।
.
হুজুর বাইত্তে আছেননি? হুজুর!
বিকালের দিকে বড়ঘরের পালঙ্কে চাদর গায়ে বসে আছেন মান্নান মাওলানা। তাঁর মুখ বরাবর জানালা খোলা। এই জানালার বাইরেই অল্পবয়সি একটা কদমগাছ। বয়স অল্প হলেও গাছটা বেশ লম্বা। পাতাগুলি একটু যেন বেশি তরতাজা, একটু যেন বেশি সবুজ। এ বছরই প্রথম ফুল ফুটল গাছটায়। আষাঢ় মাস আসতে না আসতেই ফুলে ভরে গেছে। বৃষ্টি বাদলায় আর থেকে থেকে আসা হাওয়ায় গন্ধ ছড়াচ্ছে কদমফুল।
কদমগাছের মাথার উপর দেখা যাচ্ছে একটুকরা আকাশ। সকাল থেকে আজ মেঘলা হয়ে আছে আকাশ। আকাশের চারদিক থেকেই যেন দ্রুত বেগে ছুটাছুটি করছে কখনও ধূসর, কখনও ঘন কালো মেঘ। থেকে থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। কখনও কোদাইল্লা (কোদালে) বৃষ্টি, কখনও ইলশাগুড়ি। কখনও একেবারেই ধরে যাচ্ছে বৃষ্টি, কিছুক্ষণ পরই আবার শুরু হচ্ছে।
