রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে স্ত্রীকে সাপের কথাটা বলল মতিমাস্টার। সাবধান হতে বলল।
মুকসেদ তখন অপলক চোখে তাকিয়ে আছে আমগাছতলায় বসা মতিমাস্টারের অথর্ব ছেলেমেয়ে হিরামানিকের দিকে। এখনও অতিকষ্টে খুঁটে খুঁটে মুড়ি খাচ্ছে তারা।
একসময় ছাতা হাতে উঠে দাঁড়াল মতিমাস্টার। আমার যে দাদা অহন উটতে অয়।
মুকসেদও উঠল। কই যাইবেন?
খাইগোবাড়ির ইসকুলে। ওহেনে মাস্টারির চেষ্টা করতাছি। ইসকুলের কাম সাইরা যামু। দোগাছি। সেজাল খাঁ-র বাইত্তে একজন ছাত্রী পড়ানোর কথা অইবো আইজ। এই হগল। সাইরা আইতে আইতে বিয়াল।
মতিমাস্টারের পিছন পিছন বাড়ি থেকে নামল মুকসেদ।
চকের কোণে নেমে হঠাত্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল মতিমাস্টার। মুকসেদের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, জীবনডা বড় কঠিন দাদা। বউ পোলাপান লইয়া বাইচ্চা থাকন বড় কঠিন। চাইরজন মানুষের পেটের ভাত জোগাইতে জানডা বাইর অইয়া যায়।
মতিমাস্টারের কথাগুলি একেবারে বুকে এসে লাগল মুকসেদের। অপলক চোখে তার মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে রইল সে। তারপর বলল, দাদা, বয়সে আমি আপনের থিকা বড় হমু। লেখাপড়া জানি না। আপনের লাহান বিদ্যান না। তয় একহান কথা আমি আমার বয়েস দিয়া বুজছি, দুইন্নাইর একমাত্র সমস্যার নাম অইলো খিদা। এই খিদার তালে পইড়াঐ দুনিয়াডা চলতাছে। যে যা করতাছে খিদার লেইগাঐ করতাছে। ধানখেতের গদ থিকা একহান ইন্দুর বাইর অইলো নিজের খাওন জোগানের লেইগা, এই ইন্দুররে খাওনের লেইগা আবার আসমান থিকা নাইমা আইলো একহান বাজপাখি। সব জাগায়ঐ কইলাম। সমস্যাটা অইলো খিদা। খিদার চক্করে দুনিয়া চলে। তয় মানুষ ইন্দুরও না, বাজপাখিও না। মানুষ অইলো মানুষ, দুনিয়ার সেরা জীব। মানুষ পেটের আহার জোটায় বুদ্ধি দিয়া। কেঐ বিদ্যা বেইচা খায়, কেঐ খায় চুরি কইরা। যে বিদ্যা বেচে হে অইলো মানুষ, যে চুরি করে, হে মানুষের লাহান দেখতে অইলেও মানুষ না। চাইরজন মানুষরে লইয়া কষ্ট কইরা খাইলেও আপনে অইলেন মানুষ। চুরির টেকা পয়সা ম্যালা থাকনের পরও, খাওনের আকাল না থাকনের পরও আমি দাদা মানুষ না।
একটু থামল মুকসেদ তারপর বলল, মানুষ আমি অইতে চাই দাদা। এর লেইগাঐ আইজ টুপি দিছি মাথায়, আপনের লাহান একজন মাইনষের লগে আইছি কথা কইতে। আইজ থিকা আমি অইলাম আপনের ছাত্র। আপনে আমারে মানুষ অওনের পথটা দেখাইয়েন। বুড়া অই আর যাঐ অই, জীবনের শেষ দিনডি আমি মানুষ অইয়া কাডাইতে চাই। মরতে চাই মানুষ অইয়া।
মুকসেদের কথা শুনে নিজের অজান্তেই যেন পা থেমে গেছে মতিমাস্টারের। নিজের অজান্তেই যেন ধানখেতের আলের ওপর স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছে সে। এখন অপলক চোখে তাকিয়ে আছে মুকসেদের মুখের দিকে।
চারদিকের চকে এখন বাঘের মতন থাবা বসিয়েছে বৈশেখ মাসের ভয়ংকর রোদ। রোদের তাপে পুড়ছে দেশগ্রাম। ইরিধান কাটা শুরু হয়েছে দিন কয়েক আগে। চকের কোথাও কোথাও ন্যাড়া হয়ে গেছে ধানের জমি, গৃহস্থলোক কেটে নিয়ে গেছে তাদের ধান। কেটে নেওয়া ধানের খেতে কাদা পানিতে মাখামাখি হয়ে আছে কেটে নেওয়া ধানের গোড়ার দিককার গোছাগুলি। কোনও কোনও খেতের ধান পাকতে হয়তো দুই-চারদিন দেরি হয়েছে, ফলে কাটাও শুরু হয়েছে দেরিতে। আজও কোনও কোনও খেতের ধান কাটছে কিষানরা। রোদের ভিতর দিয়া মৃতের মতন বহমান হাওয়ায় ভেসে আছে পাকা ধানের গন্ধ। সেই গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে আছে দেশগ্রাম। এই অবস্থায় একজন নিবেদিত প্রাণ দরিদ্র শিক্ষক আর একজন দাগি চোর মুখামুখি দাঁড়িয়ে আছে ধানখেতের আলপথে। একজন চাইছে মানুষ হতে, সেকথা শুনে আরেকজন আছে স্তব্ধ হয়ে।
.
মুকসেইদ্দা তো আবার চুরিচামারি শুরু করছে!
দুপুরের ভাত খেয়ে পেট ভাসিয়ে মান্নান মাওলানা শুয়ে আছেন বড়ঘরের পালঙ্কে। খালি গা, নাভি বরাবর গিঁটটু দিয়া বান্দা লুঙ্গি। খাওয়ার পর পেটটা আরও ফুলেছে। দেখাচ্ছে পোটকা মাছের মতন। যেন খেলার ছলে কোনও দুরন্ত কিশোর পোটকা মাছের লেজ দুই আঙুলে ধরে অবিরাম এদিক ওদিক নাড়িয়েছে আর মাছটা তার স্বভাব মতন কটকট শব্দে পেট যতদূর সম্ভব ফুলিয়েছে। ফুলিয়ে এখন অসহায় ভঙ্গিতে পড়ে আছে মাটিতে।
বড়ঘরে ঢুকে মান্নান মাওলানাকে কথাটা বলার ফাঁকে কেন যে পোটকা মাছের কথাটা মনে এল আতাহারের বুঝে উঠতে পারল না। একটু হাসিও পেল, হাসল না। পালঙ্কের অদূরে দাঁড়িয়ে রইল।
ছেলের কথা শুনে মান্নান মাওলানা ভুরু কুঁচকেছেন। কী, চুরি শুরু করছে?
হ।
কেমতে বুজলি?
আমার একহান শাট আর একহান লুঙ্গি পাই না। রহি কইলো কয়দিন আগে নাড়ার পালায় রইদ দিছিলো। তারবাদে আর পায় নাই। ডরে আমারে কয়ও নাই। আইজ নাইতে যাওনের আগে আমি যহন ওই লুঙ্গি আর শাট বিচড়াইয়া পাই না, রহিরে জিগাইছি, তহন কইলো।
মান্নান মাওলানা চিন্তিত গলায় বললেন, মুকসেইদ্দার তো এই হগল জিনিস চুরি করনের কথা না।
ক্যা?
অরে আমি ছোডকাল থিকা চিনি, ও কইলাম ছ্যাঁচরা চোর না। গোরু বরকি, মোরগ মুরগি, মাইনষের জামাকাপড় এই হগল ও কোনওদিন চুরি করে নাই।
তয় বাইত থিকা জিনিস দুইহান কই গেল?
এইডাঐত্তো কথা।
একটু থেমে মান্নান মাওলানা বললেন, তর মায় হোনছে?
হ।
কুনসুম হোনলো? আমারে দিহি কিছু কইলো না?
