কথাটা বলেই ভিতরে ভিতরে একটু ফাঁপরে পড়ল মুকসেদ। যাহ ভুল তো একটা করে ফেলল! এখন যদি সাপের কথা ভুলে মতিমাস্টার জিজ্ঞাসা করে, বিয়াইন্না রাইতে এই বাইত্তে আপনে কীর লেইগা আইছিলেন, সে-কথার কী জবাব দেবে মুকসেদ! সে যে তার দীর্ঘকালের রাতচরা স্বভাবের জন্য এসেছিল, চুরি করতে, সিঁদ কাটতে যে আসে নাই, এবার জেল থেকে ফিরার পর যে চোরজীবন থেকে সে রিটায়ার করতে চাচ্ছে একথা বললেও কি মতিমাস্টার তা বিশ্বাস করবে! কেউ কি বিশ্বাস করবে!
তবে মতিমাস্টার এসব কথার ধার দিয়া গেল না। সাপের চিন্তায় চশমার ভিতর তার চোখ তখনও অপলক হয়ে আছে। ডালায় রাখা গুড়মুড়ি মুখে দিতে ভুলে যাচ্ছে। অতি বিনয়ী গলায় মুকসেদকে একসময় সে বলল, বসেন ভাই, বসেন। সাপের কথাডা খুইল্লা বলেন আমারে। আমরা এই বাইত্তে নতুন আইছি, বাড়ির কোনহানে কী আছে কিছুই জানি না।
একথা শুনে বুকের ভিতরকার ফাপর ভাবটা কেটে গেল মুকসেদের। বিনীত ভঙ্গিতে মতিমাস্টারের লগে একটু দূরত্ব রেখে তক্তার উপর বসল। রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে মতি মাস্টার তার স্ত্রীকে বলল, হিরার মা, চা যেডু বানাইছো হেডুঐ ভাগ কইরা দুইডা গেলাসে দিয়ো। মুকছেদ দাদায় আইছে। সেও চা খাইব।
মতিমাস্টারের স্ত্রী সাড়া দিল না।
মুকসেদের তখন লজ্জা লাগছে। হাসিহাসি মুখ করে বলল, না না চা আমার লাগবে না। চা আমি একবার খাইছি।
মতিমাস্টার বলল, খান। চা দুই-তিন কাপ খাইলেও অসুবিদা নাই।
তারপর আবার সাপের কথাটা তুলল। কন দিহি, কেমুন দেখলেন সাপটা?
বলেই একমুঠ মুড়ি মুখে দিল সে।
মুকসেদ বলল, বিরাট সাপ। পাঁচ-ছয়হাত লম্বা অইবো।
দেখতে কেমুন? কালা কুচকুইচ্চা?
না।
তয়? শইল্লে চক্কর আছে? খৈয়াজাইত?
না। জাইত সাপ না। আমার মনে অইলো সানকি।
সানকি কথাটা শুনে যেন একটু স্বস্তি পেল মতিমাস্টার। সানকি অইলে তো শইল্লে কালা কালা দাগ থাকবো।
হ আছে।
আপনে ভাল মতন দেখছেন?
হ।
কী করতাছিল?
ভাঙ্গনের মিহি থিকা আস্তে আস্তে আপনেগো উড়ানে উইট্টা আইলো। উডানে অনেকটি ব্যাং লাফাইতাছিল। ছো দিয়া দিয়া ব্যাং ধইরা খাইতাছিল।
মতিমাস্টার কথা বলবার আগেই মাথায় ঘোমটা দিয়া তার স্ত্রী এল এদিকটায়। টিনের থালে কম দামি দুইখান চায়ের কাপ বসায় নিয়ে আসছে সে। মতি মাস্টার আর মুকসেদের। মাঝখানে চায়ের কাপসহ থালটা নামায়া রেখে যেমন নিঃশব্দে আসছিল তেমন নিঃশব্দেই আবার রান্নাঘরে গিয়া ঢুকল।
মতিমাস্টার মুড়ি চাবাতে চাবাতে বলল, দাদা, চা খান।
দেশ গ্রামের নামকরা একজন মাস্টার মুকসেদের মতন দাগী চোরকে দাদা দাদা করছে শুনে খুবই সম্মানবোধ করছিল মুকসেদ। অনেকদিন পর নিজেকে তার মানুষ মনে হচ্ছিল। বিনীত হাতে থাল থেকে চায়ের কাপ নিয়া চুমুক দিল।
মতি মাস্টার বলল, সানকি সাপ হুইন্না ডরডা ইট্টু কমছে।
শুনে অবাক হল মুকসেদ। ক্যা?
এই সাপ মানুষরে দংশায় না।
কে কইছে আপনেরে?
আমি হুনছি।
মুকসেদ আরেকবার চায়ে চুমুক দিয়া বলল, আমি কইলাম হুনছি অন্যকথা।
গুড়মুড়ি শেষ করে হাতের তালুতে মুখ মুছল মতিমাস্টার। কী কথা হোনছেন?
সানকি সাপ সহাজে কেঐরে দংশায় না। তয় যুদি একবার দংশায় তাইলে দুইন্নাইর কোনও ওঝায় হেই সাপের বিষ নামাইতে পারে না।
মতিমাস্টার চায়ের কাপ নিল। কী জানি, অইতেও পারে।
হ। সানকি সাপের লেজের গোড়ায়ও বলে একহান মুখ আছে। যদি কেঐরে কামড় দেয়, তয় বলে দুইমুখ এক লগে কইরা দেয়।
হ, এইডা আমিও হুনছি।
আবার এইডাও হুনছি, যেই বাইত্তে সানকি সাপ থাকে হেই বাইত্তে বলে অন্যসাপ থাকতে পারে না। সানকি সাপে বলে অন্যসাপ খাইয়া হালায়।
মতি মাস্টার চায়ে চুমুক দিয়া বলল, এই হগল হুনা কথা। আমিও হুনছি।
নিজের চা শেষ করে কাপটা জায়গা মতন নামায়া রাখল মুকসেদ। তয় হুনা কথা কইলাম অনেক সময় সত্য অয় দাদা।
হ, অইবো না ক্যা? হয়।
হোনেন, সানকি সাপের নিয়মডা অইলো এই সাপের সামনে একবার যদি কোনও সাপ পইড়া যায়, তয় হেই সাপটা মরছে।
কেমতে?
সানকি সাপ বলে সাপের রাজা। তার সামনে অন্যকোনও জাতের সাপ পড়লেই বলে হেই সাপটা নিজে থিকা আইয়া নিজের লেজটা পয়লা ঢুকাইয়া দিব সানকি সাপের মুখে। সানকি সাপ বলে লেজের দিক থিকা আস্তে আস্তে গিলতে শুরু করবো হেই সাপটারে। গিলতে গিলতে যহন পুরা শইল গিল্লা মাথার কাছে আইবো, মাথাডা গিলবো না। দাঁত দিয়া কট কইরা কাইট্টা হালাইয়া দিবো।
কী জানি, অইতে পারে।
মুকসেদের লগে কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে নিজের চা শেষ করেছে মতি মাস্টার। এখন কাপটা জায়গা মতো রেখে মুকসেদের দিকে তাকাল। আল্লাহপাকের দুনিয়াতে কত যে নিয়ম, কত যে রহস্য! মানুষ এই হগল নিয়ম রহস্যের অনেক কিছুই জানে না।
মুকসেদ বলল, কথা সত্য। তয় আমি আপনেরে আইজ সাপের কথাডা কইতে আইছি ক্যান দাদা, জানেন?
ক্যান?
আপনের ওই পোলাপান দুইডার লেইগ্যা। আতুড় লুলা পোলাপান হারাদিন গাছতলায় বইয়া থাকে। কুনসুম সাপটা আইয়া পড়বো অগো সামনে, অরা হয়তো বুজবো না যে সাপ জিনিসটা কী, হাত দিয়া হয়তো ধরতে যাইবো, তারবাদে..
কথাটা শেষ করল না মুকসেদ। তবে তার কথার অর্থ মতি মাস্টার বুঝল। বুঝে ভয় পেল। হ দাদা, ঠিকঐ কইছেন। সানকি সাপ হোক আর যেই সাপঐ হোক, পোলাপান দুইডারে সাবদানে রাখতে অইবো। যেই পোলাপানের লেইগা এত কষ্ট করি, হেগ যুদি সাপেঐ খায়, তয় আর লাব অইলো কী!
