না এক অইলো না বাজান। একজন মাইনষের খরচা কমনি?।
হ হেইডা ঠিক। তয় আপনের অবস্থাও তো আল্লায় দিলে খারাপ না। পোলা একহান অহনও জাপানে।
অইলে কী অইবো! সংসার তো বড়।
এনামুল কথা বলল না। পা চালিয়ে হাঁটতে লাগল।
নিজের বাড়ি বরাবর এসে মান্নান মাওলানা বললেন, ইট্টু খাড়ও বাজান।
এনামুল দাঁড়াল। কিছু কইবেন?
হ।
তাড়াতাড়ি কন। আমার দেরি অইয়া যাইতাছে।
মান্নান মাওলানা হাত কচলে, বিনীত ভঙ্গিতে বলল, কইতাছিলাম মজজিদের কামে মোতালেইব্বারে তুমি রাইখো না।
সব বুঝেও অবাক হওয়ার ভান করল এনামুল। তয় কামের তদারক করবো কেডা?
আমি করুম। আমি নিজে।
পারবেন?
পারুম না ক্যা? মোতালেইব্বার থিকা ভাল পারুম। আমি থাকলে একটা পয়সাও এদিক ওদিক অইবো না। একটা পয়সাও চুরি কইরা খাইতে পারবো না কেঐ।
হ হেইডা আমি বুঝি।
তয় আমার লেইয্য পয়সাড়া আমারে তুমি দিবা।
এনামুল মনে মনে বলল, এইডাঐ যে আসল কথা আপনের, অনেক আগেই আমি হেইডা বুইজ্জা গেছি। আমি মানুষ চরাইয়া খাই। ক কইলেঐ কইলকাত্তা বুজি।
মুখে বলল অন্যকথা। লেইয্য পয়সা আপনে পাইবেন। ওইডা লইয়া চিন্তা কইরেন না। মোতালেইব্বারে আমি বাদ দিলাম। এইডা ফাইনাল।
শুনে খুবই খুশি হলেন মান্নান মাওলানা। ঠোঁট যতটা সম্ভব লম্বা করে হাসলেন। আমি জানতাম তুমি আমার কথা হালাইবা না। তুমি বড়ঘরের পোলা। ময়মুরব্বিগো দাম দিতে জানেনা।
এনামুল বিগলিত ভঙ্গিতে হাসল। তয় অহন যাই হুজুর। স্নামালেকুম।
ওয়ালাইকুমসালাম।
বাদলার লগে পা চালিয়ে দোগাছিমুখী হাঁটতে শুরু করল এনামুল।
.
এই বাইত্তে কইলাম একখান সাপ আছে। বিরাট সাপ। ওই যে ভাঙ্গনের মিহি ইজলগাছ আর টোসখোলা ঝোঁপ, ওহেনে থাকে।
গণি মিয়ার পাটাতন ঘরের বাইরের দিকে বেড়ার লগের তক্তায় বসে গুড়মুড়ি খাচ্ছে মতিমাস্টার। তার হাতে বেতের মাঝারি সাইজের একখান ডালা। ডালাভরতি জমির চালের মোটা মোটা লালচে ধরনের মুড়ি আর ছোট একডেলা খাজুরা মিঠাই। দুই-তিন মুঠ মুড়ি মুখে দেওয়ার পর এক কামড় মিঠাই খাচ্ছে সে। এক কামড় মিঠাইয়ের স্বাদ মুখে থাকতে থাকতে দুই-তিন মুঠ মুড়ি খেয়ে নিচ্ছে। কারণ প্রতিমুঠ মুড়ির লগে এক কামড় করে মিঠাই খেলে মিঠাইতে কুলাবে না।
মতিমাস্টারের পরনে খদ্দরের পাঞ্জাবি। পাঞ্জাবির রং খড়নাড়ার মতন। পাজামাটা অবশ্য সাদা। বহু ব্যবহারে সাদা রংটা আর নাই, মাটির মতন রং হয়েছে। হাতের কাছে রাখা আছে কালো আঁটের দুই-তিন তালিপড়া ছাতা, চোখে কালো রঙের মোটা ফ্রেমের চশমা, চশমার বাঁদিককার কাঁচটা বহুদিন হল ফেটে আছে। লম্বা রোগা ধরনের শরীর মতি মাস্টারের, মাথায় কাঁচাপাকা পাতলা চুল। কোনও একটা দিক থেকে না, মাথার চারদিক থেকেই টাক পড়তে শুরু করেছে।
যাদের মাথার চুল পাতলা হয় তাদের দাড়িগোঁফ বোধহয় বেশি ঘন হয়। মতি মাস্টারেরও সেই অবস্থা। মুখের দাড়িমোচ বেজায় ঘন। বেশিরভাগই সাদা হয়ে গেছে। চেহারা সুরত মন্দ না মানুষটির, হঠাৎ করে দেখলে ভালই লাগে। তবে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মুখ। জুড়ে তার বিষণ্ণতার পরিষ্কার একটা ছায়া দেখা যায়। এই ছায়া দারিদ্র্যের, জীবনযুদ্ধে কোনওরকমে টিকে থাকার।
মতিমাস্টারের অদূরে, রান্নাঘরের কোণের আমগাছতলায় সকালবেলার রোদে ছেড়ে পেছড়ে বসে আছে তার অথর্ব ছেলেমেয়ে হিরামানিক। অ্যালুমিনিয়ামের ভাঙাচোরা বেশ বড় একখান বাটিতে গুড়মুড়ি দেওয়া হয়েছে তাদের দুইজনকেও। বাঁকাচোরা অসহায় হাতে অতিকষ্টে দুটি-চারটি করে মুড়ি বাটি থেকে তুলে কোনওরকমে মুখে দিচ্ছে তারা। খাওয়ার আনন্দে হঠাৎ হঠাৎ বিকৃত শব্দে হেসে উঠছে দুইজনই। জড়ানো গলায় কী কী বলছে। দুই-তিনবার কান খাড়া করেও তাদের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারল না। মুকসেদ। তবে ছেলেমেয়ে দুইটোর দিকে তাকিয়েই যেন সাপের কথাটা মনে পড়েছে। তার। সেজন্যই যেন মতিমাস্টারকে কথাটা সে বলল।
মুকসেদের খয়েরি রঙের লুঙ্গি একটু উঁচু করে পরা। গায়ে হাতাঅলা কোরাগেঞ্জি ডান দিককার বগলের কাছে ছিড়া গেছে। আজ মাথায় সাদা গোল টুপি আছে মুকসেদের। কী কারণে যে টুপিটা আজ সে পরেছে, আল্লায়ই মালুম।
মতি মাস্টারের বউ রান্নাঘরের চুলার পারে বসে স্বামীর জন্য রং চা করছিল। এ সময়ে অচেনা গলায় কে কথা বলছে দেখার জন্য সেখান থেকেই গলা বাড়াল। তারপর মুকসেদকে দেখে অবাক হল। মনে মনে বলল, মুকসেইদ্দা চোরা আমগো বাইত্তে আইছে ক্যা? আমরা গরিব মানুষ। এক গিরস্তে থাকনের জাগা দিছে। ঘরে কিছু নাই! অহন দেইক্কা গিয়া রাইত্রে চুরি করতে আইলে কিচ্ছু পাইবো না!
মতিমাস্টার এসব ভাবছিল না। খারাপ চিন্তাটা তার মাথায় সহজে আসে না। যে-কোনও মানুষের প্রতিই তার অগাধ বিশ্বাস। মুকসেদ যে দাগি চোর, মাস দুইতিনেক হল জেল খেটে গ্রামে ফিরেছে সবই সে জানে, তবে সেই লোককে এই বাড়ির সীমানায় দেখে অন্যকোনও চিন্তা তার মাথায়ই এল না। সাপের কথা শুনে গুড়মুড়ি খাওয়ার কথা ভুলে চিন্তিত চোখে মুকসেদের মুখের দিকে তাকাল। কন কী? কী সাপ?
মুকসেদ বুঝে গেল মতিমাস্টার তাকে পাত্তা দিচ্ছে। জেল খাটা দাগি চোর জেনেও অবহেলা করছে না। হাসিমুখে বলল, সাপহান আমি দেখছি বিয়াইন্না রাইতে। মাইট্টা জোছনায়। ঠিক বোজতে পারি নাই, কী সাপ!
