এনামুল হাসল। আপনে যে মামু নিজের স্বার্থের লেইগাঐ ম্যাগ বিষ্টি মানতে চাইছেন না এইডা আমি আর মাওলানা সাব দুইজনেঐ বুজছি। তয় আমি তো মামু আপনের বুদ্দিতে চলুম না। আমি চলুম আমার বুদ্দিতে। টেকা আমার, মাডি উডামু আমার টেকা দিয়া। হেই মাডি যুদি ম্যাগ বিষ্টিতে ধুইয়া যায় লসটা অইবো আমার। আর লাব অইবো আপনের?
মোতালেব মুখ কালো করে বলল, আমার কেমুন লাব?
এক কাম দুইবার করবেন আপনে! মাইট্টাল সর্দারির পয়সাডা ডবল পাইবেন।
এনামুলের কথা শুনে মুখ চুন হয়ে গেল মোতালেবের। সে আর কথাই বলল না। চুন করা মুখ নিয়া চকের দিকে তাকিয়ে রইল।
মান্নান মাওলানা আর বাদলা তখন মুখ টিপে টিপে হাসছে। তাদের দেখাদেখি এনামুলও একটু হাসল। তারপরই গম্ভীর হয়ে গেল। মান্নান মাওলানার দিকে তাকিয়ে বলল, হুজুর কী কন? কামডা অহন ধরন ঠিক অইবো?
মান্নান মাওলানা আগেই বুঝে গেছেন যত যাই হোক কাজ এখন এনামুল কিছুতেই ধরবে না। তার অন্য কোনও হিসাব আছে। আর হাওয়া বুঝে চলাই মান্নান মাওলানার নীতি, তিনি সেই নীতিই ধরলেন। মাথা নেড়ে বললেন, আমি মনে করি অহন ধরন ঠিক অইবো না। তোমার হিসাবঐ ঠিক। অহন কাম ধরলে ম্যাগ বিষ্টিতে কামের ক্ষতি অইবো।
মান্নান মাওলানার কথা শুনে খুশি হল এনামুল। মোতালেবের দিকে তাকিয়ে বলল, হুজুরের কথা হোনছেন মামা? এইডা অইলো গেনি মাইনষের কথা। গেনি মাইনষে কথা কয় চিন্তা কইরা। খালি নিজের লাবহানঐ দেইনে না। অন্যের লাব লোসখানডাও চিন্তা কইরেন।
মোতালেব মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। কথা বলল না।
এনামুল আর তার দিকে তাকাল না। মান্নান মাওলানার দিকে তাকিয়ে বলল, সবমিহি চিন্তা কইরা আমি দেখলাম হুজুর, এই বচ্ছর কামডা আমরা ধরতেঐ পারুম না। মাসেকহানি পর জোয়াইরা দিন আইয়া পড়বো। তারপর বাইষ্যাকাল। কাম আপনে পউষ-মাগ মাসের আগে ধরতে পারবেন না।
মান্নান মাওলানা বুঝদারের ভঙ্গিতে বললেন, হ।
তয় আমার কথা অইছে পউষ-মাগ মাসে যেদিনঐ কাম ধরুম, হেদিন থিকা আর থামুম না। দশ-পোনরো দিনের মইদ্যে পুকর থিকা মাডি উড়াইয়া ভিটিবাড়ি বাইন্দা হালামু। তারবাদে ঢাকা থিকা আমার বান্দা ওস্তাগার কাদির মিয়ারে লইয়ামু আর একজন ইনজিনিয়ার লইয়ামু, হেরা দুইজনে মাপ মোপ দিয়া দেখবো বিলডিংডা কত বড় অইবো, কেমতে কী অইবো। আমারে টেকাপয়সার একহান বাজেড দিব, কয়দিনে পুরা কাম শেষ অইবো হেই হগল কইবো। আর হেতদিনে সড়কের কামও শেষ অইয়াবো। টেরাক ভইরা ইট বালি রড সিমিট পাডামু। দেকবেন দুই-তিনমাসের মইদ্যে মজজিদ অইয়া গেছে। আপনে ইমামতি করতাছেন।
ইনশাল্লাহ।
তহন আমার হাতে টেকাপয়সাও থাকবো ম্যালা। যেই কামডা অহন করতাছি হেইডার বিল পাইয়া যামু। মজজিদের কামে চাইর-পাঁচলাক টেকা খরচ করন তহন আমার গায়েঐ লাগবো না।
মোতালেব ততক্ষণে যা বোঝার বুঝে গেছে। এখন এনামুলের লগে থেকে তার আর কোনও লাভ নাই। সময়টা নষ্ট হবে। এই সময় অন্যকাজ করলে সংসার আগাবে।
আচমকা এনামুলকে ফেলে যায়ই বা কেমন করে! একটা চালাকি করতে হয়।
চালাকিটা মোতালেব করে ফেলল। হঠাৎ করে চমকে ওঠার ভঙ্গিতে এনামুলকে বলল, দেহো তো মামু কয়ডা বাজে?
এনামুল ঘড়ি দেখল। পোনে দশটা।
ইসসিরে, দেরি অইয়া গেছে।
কই যাইবেন?
বাসু ডাক্তারের কাছে। ময়নার লেইগা একহান অষইদ আনতে অইবো।
তয় যান গা।
আইচ্ছা।
ছাড়াবাড়ির দক্ষিণ দিকে দ্রুত পা চালিয়ে নেমে গেল মোতালেব। সেদিকে তাকিয়ে এনামুল বলল, বোজলেন তো হুজুর মোতালেইব্বা গেল গা ক্যা?
মান্নান মাওলানা হাসলেন। হ বুজছি। যহনঐ বোজছে কামডা পিছাইয়া গেছে তহনঐ দৌড় দিছে। অহন তো তোমার লগে থাইক্কা অর কোনও লাব নাই।
হ একদোম ঠিক বোজছেন।
একটু থেমে বলল, তয় এই কথাঐ রইল হুজুর। পউষ-মাগ মাসে কাম ধরুম।
আইচ্ছা।
দেশগেরামের কেঐ মজজিদের কথা জিগাইলে এইডা কইবেন। আমার য্যান বদলাম না হয়।
আরে না মিয়া, কীয়ের বদলাম অইবো! নিজের গাইটের টেকা দিয়া আল্লার ঘর বানাইবা আবার বদলামও অইবো, আমি বাইচ্চা থাকতে হেইডা অইতে দিমু না।
এনামুল খুশি হল। বলল, খুশি অইলাম হুজুর আপনের কথা হুইন্না। তয় অহন মেলা দেই।
দেও আল্লার নাম লইয়া।
এনামুল বাদলার দিকে তাকাল। ল রে বাদলা, আউগ্নাইয়া দিয়ায় আমারে।
বাদলা উৎসাহী গলায় বলল, লন।
তারপর এনামুলের আগে আগে চকপাথালে হাঁটা দিল।
মান্নান মাওলানাও হাঁটছিলেন এনামুলের লগে লগে। হাঁটতে হাঁটতে বললেন, আগের বার তোমার লগে একহান মিছাকথা কইছিলাম বাজান।
এনামুল চমকে মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকাল। মিছাকথা কইছিলেন?
মিছাকথা না, কইতে পারো ভুল কথা।
কোনডা কন তো?
নিজের বড় সংসারের কথা কইতে গিয়া তোমারে কইছিলাম দুইডা পোলাপান রাইখা মরছে মোতাহারে। এই কথা ঠিক না। পোলাপান মোতাহারের তিনডা। দুইডা মাইয়া একটা পোলা। বড় মাইয়াডার নাম শিরিন, পোলাডার নাম নওসের আর ছোড মাইয়াডার নাম কোহিনূর। তয় এই নামে কেঐ অগো ডাকে না। শিরিনরে কয় শিরি, নওসেররে কয় নসু, আর কোহিনূররে কয় নূরি।
নিজের কন্ট্রাকটরি বুদ্ধি দিয়া এনামুল বুঝে গেল এরপর কোন লাইনে কথা বলবেন মান্নান মাওলানা। সে কথার কী জবাব দিবে তাও ঠিক করে রাখল। তবে মুখে বলল অন্যকথা। আরে এইডা কী এমুন ব্যাপার! পোলাপান দুইডা আর তিনডা একঐ অইলো।
