তবে ট্যাণ্ডল আতাহাররা হলেও ট্যাণ্ডলের মতো আচরণ তাদের লগে করে না আলী আমজাদ। করে বন্ধুর মতন আচরণ। বয়সে অনেক ছোট হওয়ার পরও আতাহররা এখন আলী আমজাদের ইয়ার দোস্ত। আলী আমজাদ যতবার সিগ্রেট খায় লগে থাকলে ততবারই তাদেরকেও সিগ্রেট দেয়। এমন কী ম্যাচ জ্বেলে আঙ্গাইয়া তরি (ধরিয়ে পর্যন্ত) দেয়। প্রথম প্রথম আতাহারদের বাড়িতে তাদের বাংলাঘরে বসে লৌহজং থেকে আনা কে কোম্পানীর মাল চালাত। ছাপড়া ঘর তোলার পর থেকে সেই বাড়িতে আর যেতে হয় না। এই ঘরে বসেই চালায়। দিনে দোফরে, সন্ধ্যার পর। কোনও কোনওদিন রাত গম্ভীর হয়ে গেলে আলী আমজাদ আর বাড়িই ফিরে না। মাওয়ার বাজার থেকে তিন চারটা কুকরা কিনে পাঠিয়ে দেয় নিখিলদের বাড়ি। নিখিলের বিধবা বোন ফুলমতি সেই কুকরা কষিয়ে দেয়। ইয়ার দোস্তদের নিয়ে কুকরার গোস্ত আর কেৰু কোম্পানী মাল কোৎ কোৎ করে চালিয়ে যায় আলী আমজাদ। ট্যাগুল হওয়ার পরও প্রকৃত ট্যাণ্ডলের স্বাদ আতাহারদের কাছ থেকে পায়নি আলী আমজাদ। হেকমতকে রাখার পর তার কাছ থেকে পাচ্ছে। ফলে সাইটে আসার লগে লগে হেকমত যখন ছাতি খুলে দিশাহারা ভঙ্গিতে তার কাছে ছুটে আসে তখন অকারণেই আলী আমজাদ একটু গম্ভীর হয়ে যায়। চালচলন রাশভারি হয়ে যায় তার, গলার স্বর মোটা হয়ে যায়। অর্থাৎ বেশ একটা বড় দরের কনটাক্টর কন্ট্রাক্টর ভাব আসে। ভিতরে ভিতরে ব্যাপারটা উপভোগ করে সে। কথা খুব কম বলে। বেশির ভাগই হুঁ হাঁ না ইত্যাদি। আর কোনও মাটিয়ালের তো নাইই, হেকমতের মুখের দিকে পর্যন্ত তাকায় না। আকাশের দিকে তাকিয়ে, গ্রামের গাছপালা বাড়িঘরের দিকে তাকিয়ে কথা বলে। যেন এই সবই তার দেখার ব্যাপার, মাটিয়ালরা না, সড়কের কাজ না। তারপরই ছাপড়া ঘরটায় গিয়ে ঢোকে। ঢুকে ল্যাড়ল্যাড়া বালিশ দুইখান মাথার নিচে দিয়ে চকিতে গা এলিয়ে দেয়।
আজ সাইটে এসেছে আলী আমজাদ দুপুরের ভাত খেয়ে। এসেই দেখে ছাপড়া ঘরের সামনে খয়েরি চাদর পরা একটা লোক বসে আছে। ভাঙাচোরা মুখখানা দাঁড়িমোচে একাকার। দাঁড়িমোচ যেমন কাঁচাপাকা মাথার চুলও তেমন। বুড়া না, মাঝ বয়সী। তবে শরীরের ওপর দিয়ে যে ম্যালা ধকল অনাহার গেছে, যে কেউ দেখে বুঝে যাবে।
লোকটাকে দেখে হেকমতকে আলী আমজাদ জিজ্ঞাসা করেছে, এইডা কে?
হেকমত লগে লগে বলেছে, কেঐ না।
কী চায়?
কাম।
শইল্লের দশা তো ভাল না। মাইট্টালগিরি করতে পারবো?
কয় তো পারবো।
তাইলে লাগায় দেও।
হেকমত বিনীত গলায় বলল, আপনের লেইগা লাগাই নাই। বহায় থুইছি। কইছি সাবে আহুক। তার লগে কথা কইয়া লই।
আলী আমজাদ আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, আমার কামের নিয়ম কানন (কানুন), রোজ কত, এই হগল কইছো?
না।
ক্যা?
আপনের লেইগা। এহেনকার সরদার অওনের পর কোনও নতুন মাইট্টাল কামে লই নাই। আপনের পারমিশন ছাড়া লই কেমতে! এই যে অহন আপনে কইলেন, দেহেন অহন আমি কথা ফাইনাল কইরা হালাইতাছি। কাইল বিয়ান থিকাঐ কামে লাগাইয়া দিমু।
কী ভেবে আলী আমজাদ বলল, থাউক তোমার কথা কওনের কাম নাই। বইয়া থাউক, আমিঐ কথা কমুনে। হাদাইয়া (ক্লান্ত হওয়া) গেছি। ইট্টু জিরাইয়া লই। তয় কথা কওনের সমায় তুমি সামনে থাইক্কো। নতুন মাইট্টাল কামে লওনের সমায় কী কী কথা তাগো লগে কইতে অয় হিগগা যাইবা। তারবাদে আমারে আর লাগবে না, তুমি নিজেই কথা কইয়া বেবাক ঠিক করতে পারবা। তয় মাইট্টাল কইলাম আমার আরও লাগবো। কাম তাড়াতাড়ি শেষ করন লাগবো। এরশাদ সাবে অডার দিছে দুই তিনমাসের মইদ্যে রাস্তার কাম শেষ করন লাগবো। দুই তিনমাসের মইদ্যে এই রাস্তা দিয়া বাস টেরাক চলবো।
তারপর প্রায় সন্ধ্যা হতে চলল, লোকটা বসেই আছে, তার লগে কথা বলা তো দূরের কথা তাকিয়েও দেখছে না আলী আমজাদ। দুপুরের পর পরই ঘণ্টা দেড়েকের একটা ঘুম দিয়েছে। সে যখন ঘুমে তখন আতাহাররা চারজন এসেছে, এসে ডেকে তুলেছে। কত ঘুমান মিয়া? বিয়াল অইয়া গেল। এই দিনে দোফরে ঘুমাইলে শইল ম্যাজ ম্যাজ করে। ওডেন।
উঠেছে আলী আমজাদ। উঠে অল্প বয়সী মাটিয়াল বদরকে মাওয়ার বাজারে পাঠিয়েছে পাউরুটি কলা আনতে। সিলবরের (এলুমিনিয়ামের) একটা কেতলি আছে ঘরে, সেই কেতলি দিয়েছে চা আনতে। পাউরুটি কলা খাওয়া শেষ। এখন মরাপাতা জ্বেলে তার উপর কেতলি বসিয়ে চা গরম করতাছে বদর। কোনাকানি ভাঙ্গা তিন চারটা কাপ আছে। গরম চা সেই কাপে করে আতাহারদের নিয়ে এখনই খাবে আলী আমজাদ, তার আগে দাঁতটা খিলাল করে নিচ্ছে। পাউরুটি কলা দুইটাই ভেজাইল্লা জিনিস। খেতে আরাম কিন্তু ফাঁকআলা পোকে খাওয়া দাঁত থাকলে সেই দাঁতের গর্তে এমন করে ঢোকে, খিলাল না করলে বের হতে চায় না। সেই কাজটাই আলী আমজাদ এখন করতাছে। এক পায়ের ওপর আরেক পা ভাজ করে বসেছে চকির উপর, দুয়ারটা মুখ বরাবর, ফলে সামনে বসা লোকটাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। তবে দেখছে না। ঘরে বসেই দেখছে নীল রঙের আলোকিত আকাশ, দূরের ছায়া ছায়া গাছপালা, বাড়িঘর।
এইসময় কাপে করে চা নিয়ে এল বদর।
কাপ হাতে নিয়ে আলী আমজাদ বলল, আতাহরগো দে।
বদর হাসিমাখা গলায় বলল, দিতাছি। কাপ তো চারইখান। এক লগে চা দিলে একজন বাদ থাকবো।
সে তাইলে আমারে পরে দে।
