এনামুলের মাঝারি সাইজের ব্যাগটা বাদলার কাঁধে। এক কাঁধ থেকে ব্যাগ আরেক কাঁধে আনতে গিয়াই মান্নান মাওলানাকে দেখতে পেল সে। সড়কের দিক থেকে মোটা শরীর নিয়া প্রায় ছুটে আসছেন। দেখেই উত্তেজিত গলায় বলল, ওইত্তো হুজুরে আইয়া পড়ছে।
এনামুল আর মোতালেবও দেখল মান্নান মাওলানাকে। দেখে দুইজনেই আশ্বস্ত হল।
এনামুল বলল, তয় দেরিডা মামা ক্যান অইছে জানেন?
না। ক্যান কও তো?
আমি বেবাক দিক ঠিক না কইরা কোনও কামে নামি না। পয়লা মা-খালার কাছ থিকা ছাড়াবাড়ি কিনলাম। নিজের নামে রেস্ট্রি করলাম। মা-খালা দুইজনের টেকাঐ তাগো বুজাইয়া দিলাম।
কত টেকা দিলা?
এনামুল হাসল। হেইডা কমু না। তয় দেশগেরামে যা রেট আছে হেইডাঐ দিছি। একহান পয়সা কম দেই নাই। মায় তার টেকাডি আমার কাছেঐ রাকছে, আম্মায় দিয়া দিছে তার মাইয়ার জামাইরে।
ততক্ষণে মান্নান মাওলানা এসে উঠেছেন ছাড়াবাড়িতে। হাঁপাতে হাঁপাতে এসে দাঁড়ালেন এনামুলের সামনে।
মাওলানা সাহেবকে দেখেই সালাম দিল এনামুল। স্লামালাইকুম।
বিগলিত ভঙ্গিতে সালামের জবাব দিলেন মান্নান মাওলানা। ওয়ালাইকুমসালাম। কেমুন আছো বাজান?
জি, আছি ভালঐ। আপনে ভাল তো?
এই আছি আর কী? কোনওরকম!
কোনওরকম ক্যা?
তুমি তো জানোঐ, দেশগেরামে নানান পদের ঝামেলা। চোরধাউরে দেশ ভইরা গেছে, শয়তান বদমাইশে দেশ ভইরা গেছে। এর মইদ্যে ভাল থাকন যায়নি!
মান্নান মাওলানার লগে গলা মিলাল মোতালেব। হ ঠিক কথাঐ কইছে হুজুরে। দেশ গেরামের মানুষ অহন আর মানুষ নাই, বোজলা মামু? আমানুষ অইয়া গেছে, আমানুষ। দবির গাছির এতডু ইট্টু মাইয়া কী কামডা করলো হুজুরের লগে!
এনামুল বলল, হ হেইডা আমি হুনছি। আম্মায় আমারে বেবাকঐ কইছে। তয় ছেমড়ি মনে অয় কামডা করছে না বুইজ্জা। হুজুরেও এইডা বোজছে। বোজছে দেইক্কাঐ অরে মাপ কইরা দিছে।
মান্নান মাওলানা কথা বললেন না। বলল মোতালেব। হ হুজুরে ভাল মানুষ দেইখা মাপহান করছে। অন্য মাইনষে অইলে করতো?
এনামুল বলল, বাদ দেন এই হগল কথা। লন কামের কথা কই।
মান্নান মাওলানা বললেন, হ বাজান, হেইডাই ভাল। কও দিহি কী চিন্তাভাবনা করলা? কাম ধরবা কবে?
কাম ধইরা হালাইছি।
কী?
হ। বাড়ি রেস্ট্রি কইরা হালাইছি। পশ্চিমের পুকঐর আর এইবাড়ি মিলা চৌদ্দগন্ডা জমিন অহন আমার। এর লেইগাঐ কইলাম কাম ধইরা হালাইছি।
ঠিক কইছো। আসল কাম অইয়া গেছে। অহন খালি মজজিদহান বানান, বিলডিংহান উডান।
হ। তার আগে ছোড ছোড আরও কিছুকাম আছে। পুকঐরডা আরও কাডন লাগবো, পুকঐর থিকা মাডি উড়াইয়া মজজিদের ভিটি বান্দন লাগবো। পুরা ছাড়াবাড়িডাঐ বান্দন লাগবে।
তা তো লাগবোই!
এইডা ঠিক কইলেন না হুজুর। ভিটি বাড়ি না বাইন্দাও এই ছাড়াবাইত্তে মজজিদ করন যায়। বিলডিং না কইরা টিনের ঘর উড়াইয়াও মজজিদ বানান যায়।
হ তা যায়, তা যায়।
মোতালেব বলল, যাইব না ক্যা? আল্লার ঘর যার যেমতে ইচ্ছা উডাইবো। ঘরের আসল কামডা অইলেঐ অইলো। নমজ কালাম। ইমাম সাবের পিছে খাড়ইয়া জামাতে নমজ পড়লেঐ অইলো।
এনামুল বলল, এইডা মুইল্যবান কথা কইছেন মামা। যার যেমতে ইচ্ছা মজজিদ বানাইবো। তয় আমি কনটেকটার মানুষ। নিয়ইত করছি নানার দেশে একহান মজজিদ করুম। এতডি টেকা দিয়া মা-খালার জাগা কিনছি। অহন কোনওরকমে একহান মজজিদ ঘর খাড়া কইরাঐ মনে মনে খুশি হমু যে কামডা আমি কইরা হালাইছি, আমি ঐপদের মানুষ না। আমি যা করি, করি গুছাইয়া, সোন্দর কইরা। এর লেইগাঐ কামডা এতদিন ধরি নাই।
মান্নান মাওলানা গদগদ গলায় বলল, আমি বুঝছি তোমার কথা। জমিন কিন্না হালাইছো, অহন মাড়িমুড়ি উড়াইবা, ভিটিবাড়ি বানবা তারবাদে মজজিদের কাম ধরবা।
এনামুল হাসল। এইত্তো আপনে বোজছেন।
তয় মাডি কাড়ন আর বাড়ি বান্দনের কাম কি অহনঐ ধরবা?
মোতালেব বলল, অহনঐত্তো ধরন উচিত। শুভকামে দেরি করবো ক্যা?
হ হেইডা ঠিক কথা।
এনামুল বলল, আমি ইচ্ছা করলে কাইল থিকাঐ ধরতে পারি। তয় ধরুম কি না চিন্তা করতাছি।
মান্নান মাওলানা সরল গলায় বলল, কীয়ের চিন্তা বাজান?
বৈশাকমাস শেষ অইয়ালো। কয়দিন বাদে জষ্টিমাস। বাইষ্যাকাল আইয়া পড়বো। ম্যাগ বিষ্টি নামবো। এই সমায় মাডি কাডনের কাম, বাড়ি বান্দনের কাম ধরন ঠিক অইবোনি? দেহা গেল একদিক দা বাড়ি বানতাছে আরেক দিক দা বিষ্টিতে মাডি ধুইয়া যাইতাছে।
হ এইডা ঠিক কথাই কইছো।
মোতালেব বলল, আরে না মিয়া। এডু বাড়ি বানতে কয়দিন লাগে! বেশি কইরা মাইট্টাল লাগাইলে আষ্ট-দশদিনে কাম অইয়া যাইবো।
ওই আষ্ট-দশদিনে যুদি ম্যাগ বিষ্টি নামে! কয়দিন ধইরা তো দুই-চাইরদিন পর পরঐ বিয়ালবেলা তুফান ছাড়ে। কোদাইল্লা (কোদালে) বিষ্টি নামে।
মান্নান মাওলানা বললেন, হ। দেশগেরামে ইরি ধান কাডন লাগছে। ঝড়তুফানে ধান লইতেঐ পারতাছে না গিরস্তে! ধান হুগাইতে পারছে না। উডান পালানে মেইল্লা দেওনের লগে লগেঐ ম্যাগ তোফান আরম্ব হয়।
মোতালেব জোর গলায় বলল, ধান হুগান আর বাড়িবান্দন এক কাম না।
এনামুলের দিকে তাকাল সে। এনামুল, কামডা বিসমিল্লা বইলা ধইরা হালাও মামু। বেক কিছু আমারে বুজাইয়া দিয়া যাও, টেকাপয়সা দিয়া যাও কিছু, পশশুকা থিকা বিশ পনচাশজন মাইট্টাল লাগাই দেই।
