রহিমা চোখ মুছে বলল, আর বিয়ানবেলা এই বাড়ির মাইনষে যহন তর কথা জিগাইবো?
কইবা আমি মউচ্ছা গেছি। ওই বাড়ির মাইনষের কাছ থিকা বিদায় লইয়া কয়দিন বাদে আমু।
যহন আর আবি না, তহন?
কইবা অরা মনে হয় আমারে ছাড়ে নাই। এই হগল মিছাকথা তো কইতেঐ অইবো!
আর যহন এই বাড়ির মাইনষে তরে চোর কইবো? আতাহারের শাট লুঙ্গি তুই চুরি করছস?
এইডা ফুধু তুমি অস্বীকার করবা। কইবা, না, এইডা আমি করি নাই। দোষহান মুকসেইদ্দা চোরার উপরে দিয়া দিবা।
তবু চোখের পানি থামে না রহিমার, তবু সে কাঁদে।
হাসু তখনও বুকে জড়িয়ে রেখেছে রহিমাকে। কাঁদতে দেখে বলল, কাইন্দো না ফুবু, কাইন্দো না। হাসো, ভাল কইরা হাসো। এই দুইন্নাইডা মাইয়াছেইলার না, এই দুইন্নাইডা অইলো পুরুষপোলার। আমি অহন পুরুষপোলা, আমি অহন তোমার পোলা। ঢাকা গিয়া কামকাইজের ভাও কইরা দেকবা এই জীবন আমি বদলাইয়া হালামু। দুয়েক বচ্ছর পর ফুলপেন শাট আর জুতা ফিন্দা ব্যাগ কান্দে লইয়া এই বাইত্তে আমু। আইয়া পরিচয় দিমু আমার নাম হাসেম, ডাক নাম অইলো হাসু। তুমি আমার ফুকু হও। তোমারে আমি ঢাকায় আমার কাছে লইয়া যাইতে আইছি। এই বাইত্তে ঝিয়ের কাম তুমি আর করবা না। ঢাকার টাউনে তুমি তোমার ভাইরবেডার বাসায় থাকবা।
রহিমা কাঁদতে কাঁদতে বলল, হেইডাঐ করিচ বাজান, হেইডাঐ করিচ। আইজ থিকা। আমি খালি তর পথ চামু। তুই কবে আবি, কবে আইয়া আমারে লইয়া যাবি তর কাছে।
রহিমার চোখের পানি মুছিয়ে হাসু বলল, তুমি চিন্তা কইরো না। আমার মনে অয় বেশিদিন লাগবো না।
একটু থেমে বলল, তয় অহন তো বাইর অইতে অয় ফুবু। হুজুরের ওডনের সমায় অইয়া গেছে।
হ বাজান। ল, তরে আমি ইট্ট আউগগাইয়া দেই।
দরজা খুলে দুইজন মানুষ গোলাঘর থেকে বের হল। কুপিটা আগেই নিভিয়ে দিয়েছিল রহিমা, ঘরে অন্ধকার, বাইরে তেমন অন্ধকার নাই। পশ্চিম আকাশে ম্লান চাঁদ আছে, ম্যাটম্যাট জ্যোত্সা আছে চারদিকে। এই জ্যোৎস্না ভেঙে বারবাড়ির সামনে এল দুইজন মানুষ। এসেই দুইহাতে রহিমাকে আবার বুকে চেপে ধরল হাসু। তয় আমি অহন যাই ফুবু। তুমি আমারে দোয়া কইরো।
রহিমার চোখে তখন আবার পানি। কান্নাকাতর গলায় বলল, যাওন নাই বাজান। আহো গিয়া।
হাসু আর কোনওদিকে তাকাল না। নাড়ার পালার পাশ দিয়া পুকুর পার ধরে বড় রাস্তায় উঠল। উঠে পলকের জন্য বারবাড়ির সামনে দাঁড়ানো ফুফুর দিকে তাকাল। তারপর পা চালিয়ে উত্তরমুখী হাঁটতে লাগল। চাঁদের ম্লান আলোয় রহিমা দেখতে পেল শক্ত সমর্থ একজন পুরুষমানুষ ছোট্ট একটা বাড়ি আর একটা গ্রামের বেড়া ভেঙে বিশাল পৃথিবীর দিকে হেঁটে যাচ্ছে। সেই মানুষটার দিকে তাকিয়ে রহিমা মনে মনে বলল, যেহেনেঐ থাকচ বাজান, ভাল থাকিস। সুখে থাকিস। আল্লায় যেন তর বেবাক মনোবাঞ্ছা পূরণ করে।
.
কী রে বাদলা, খবর দেচ নাই মাওলানা সাবরে?
এনামুলের কথা শুনে চমকে তার মুখের দিকে তাকাল বাদলা। দিছি তো! বিয়ানে। গিয়াঐ দিয়াইছি।
তয় অহনতরি আহে না ক্যা?
বাদলা কথা বলবার আগেই মোতালেব বলল, আইয়া পড়বো। অহনঐ আইয়া পড়বো। চিন্তা কইরো না।
তাড়াতাড়ি না আইলে তো মশকিল। মাওলানা সাবের লগে কথা কইয়াঐ মেলা দেওন লাগবো আমার। আইতে আইতে সন্দা অইয়া গেছেলো কাইল। এর লেইগা গাড়ি আর ফিরত পাই নাই। ছিন্নগর বাজারে কাডের আড়ত আছে আমার দোস্ত নূরিসলামের। অগো বাইত্তে গাড়ি রাইক্কাইছি। বিরাট একহান কাম চলতাছে ঢাকায়। সূত্রাপুর বাজারের কাম। ওই কাম হালাইয়া একদিন কোনওহানে থাকন সম্ভবপর না আমার। ওবারসিয়ার ইঞ্জিনিয়ার সাবরা রোজঐ সাইডে আহে। ম্যানাজার আছে গোলাম মাওলা। হারাদিন সাইডে থাকে। তাও ইঞ্জিনিয়ার সাবরা আমারে না দেকলে রাগ করে।
মোতালেব আন্তরিক গলায় বলল, তয় এতবড় কাম হালাইয়া তুমি আইলা ক্যা?
গলার চেন হাতাতে হাতাতে এনামুল বলল, আইলাম মজজিদের কথা চিন্তা কইরা। আপনের মনে আছে না মামা, চাইর-পাঁচমাস আগে আমগো ঘরে বইয়া মজজিদ বানানের চিন্তা ভাবনা করলাম। কইলাম দিন পোনরোর মইদ্যে মাডি কাডনের কাম শুরু করুম, বাড়ি বান্দনের কাম শুরু করুম। মাওলানা সাবেও আছিলো হেদিন।
হ। মনে থাকব না ক্যা?
তারবাদে এতডি দিন গেল গা, কাম তো শুরু করলামঐ না, দেশেও আইলাম না।
হ।
হের লেইগাঐ কয়দিন ধইরা চিন্তা করতাছি, গেরামের মাইনষে আমারে কইবো কী?
কথাটা বুঝতে পারল না মোতালেব। বলল, কী কইবো?
এনামুল অবাক হল। বোজেন নাই আপনে?
মোতালেব বুঝদারের মতো মাথা নাড়ল। বুজুম না ক্যা, বুজছি। মাইনষে মনে করবো মুখের কথার লগে কামের কোনও মিল নাই তোমার।
এনামুল হাসল। আপনে ইট্ট সোন্দর কইরা কইলেন কথাডা। এত সোন্দর কইরা মাইনষে কইবো না মামা। কইবো এনামুইলা একহান টাউটার। মজজিদ বানানের কথা কইয়াও বানায় না, টাউটারি করে।
আরে না মিয়া, তোমার নামে এমুন কথা কওনের সাহস অইবো না কেঐর।
না মামা, হইবো। আমগো দেশের মানুষগ আপনেও চিনেন, আমিও চিনি। এই হগল চিন্তা কইরাঐ কাইল বিয়ালে ঢাকা থিকা মেলা দিলাম। বাসা থিকা বাইর অইয়া সাইডে গেছি, সাইড থিকা সোজা ছিন্নগর। বাইত্তে আইয়াঐ বাদলারে কইছি বিয়ানে গিয়া মাওলানা সাবরে খবর দিবি। সোজা আইতে কইবি আমগো ছাড়াবাইত্তে। ওহেনে খাড়ইয়া বেবাক বন্দবস্ত কইরা আর বাইত্তে যামু না আমি। ছাড়াবাইত থিকাঐ ঢাকা মেলা দিমু। দোগাছির ওইমিহি রিকশা পাওয়া যায়। ওডু হাইট্টা গিয়া রিকশা লইয়া যামু ছিন্নগর। ওহেন থিকা। গাড়ি লইয়া সোজা কামের সাইডে। এর লেইগাঐ একবারে নাস্তাপানি খাইয়া বাইত থিকা। বাইর অইছি। আম্মায় কইছিলো আউজকার দিনডা থাইক্কা যাও বাজান, আম্মার কথা রাকতে পারলাম না।
