হাসু গম্ভীর গলায় বলল, আমার একহান কাম অইয়া গেছে।
কী কাম?
আমি আর মাইয়ামানুষ নাই।
কথাটা বুঝতে পারল না রহিমা। বলল, কী?
আমি বেডা অইয়া গেছি।
তবু কথাটা বুঝতে পারল না রহিমা। আবার বলল, কী?
হ। জ্বর ছাড়নের একদিন আগেঐ বেডা অইয়া গেছি আমি। পেশাবের রাস্তায় এর লেইগাঐ আমার এমুন বেদনা অইছিলো। জাগাডা বদলাইয়া যাওনের লগে লগে বেদনা কইমমা গেছে, জ্বরও ছাইড়া গেছে। আমার পেশাবের রাস্তাডা অহন বেডাগো লাহান।
হাসুর কথা শুনে রহিমা যেন উঠান পালানের মাটির মতন হয়ে গেল। তার যেন নড়াচড়ার ক্ষমতা নাই, কথা বলবার শক্তি নেই। তার চোখে যেন পলক পড়ে না, দম যেন চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। অন্ধকারে হাঁ করে, অপলক চোখে হাসুর দিকে তাকিয়ে রইল সে। যদিও হাসুর মুখ দেখা যাচ্ছে না, তবু তাকিয়ে রইল।
হাসু বলল, এর লেইগাঐ জ্বর ছাড়নের পর থিকা আমার মুখে কথা নাই। আমি গেছি। অন্যরকম অইয়া। শইল বদলের লগে লগে মনও বদলাইয়া গেছে আমার। দুইডা দিন ধইরা জাগাড়া আমি লাইড়া চাইড়া দেকছি। না কোনও ভুল নাই। তারবাদে অহন তোমারে কইলাম। ফুবু, তুমিও হাত দিয়া দেহে।
রহিমার একটা হাত টেনে আনল হাসু, নিজের শরীরের সেই জায়গাটায় রাখল। বোজতাছ?
রহিমার গলা শুকিয়ে খরালিকালের চকের মতন হয়েছে। ঢোক গিলে সেই গলা ভিজাল সে। কোনওরকমে বলল, হ বোজতাছি। পুরাপুরি বেডাগো লাহান।
তারপরই ভয়ার্ত ভঙ্গিতে হাতটা সরিয়ে নিল সে। চাপা আর্তনাদের গলায় বলল, হায় হায় এইডা কোন সব্বনাশ অইলো? মাইনষে হোনলে কইবো কী? এইডা অইলো কামেলদার মাইনষের বাড়ি। মাইয়া থিকা বেড়া হওয়া মানুষ এই বাইত্তে থাকবো কেমতে? হুজুরে হোনলে লগে লগে বাইর কইরা দিবো। খালি এই বাইত্তে ক্যা, দেশগেরামের কোনও বাইত্তে ঐত্তো তরে কেঐ জাগা দিবো না।
হাসু দৃঢ় গলায় বলল, জাগা দেওন লাগবো না। দেশগেরামে আমি থাকুম না।
তয় যাবি কই?
ঢাকা যামু গা। আতাহার দাদার একহান লুঙ্গি আর একহান শাট চুরি করছি। আমার চিকিচ্ছার লেইগা আম্মায় যেই টেকা দিছিলো হেই টেকার ষাইট টেকা অহনও তোমার কাছে আছে। আগে কুপি আঙ্গাও, কুপি আঙ্গাইয়া টেকাডি আমারে বাইর কইরা দেও, আর কুপির আলোয় আতাহার দাদার শাট লুঙ্গি আমি ফিন্দি, ফিন্দা হুজুরে উডনের আগে এই বাইত থিকা বাইর অইয়া যাই।
রহিমাকে ধাক্কা দিল হাসু। ওডো, তাড়াতাড়ি করো।
মরার মতন উঠল রহিমা। বালিশের তলা থেকে ম্যাচ নিয়া কুপি জ্বালল। কুপির আলোয় সব ভুলে হাসুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
রহিমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে হাসল হাসু। চাইয়া রইলা ক্যা? টেকা বাইর করো।
চৌকির তলায় নিজের কাপড়ের পোঁটলা ভিতর টাকাটা রহিমা রেখেছে। কুপি হাতে সেই পোঁটলার জন্য চৌকির তলার কাছে উপুড় হল। হাসু তখন আতাহারের লুঙ্গি পরছে, শার্ট পরছে।
টাকা বের করে হাসুর হাতে দিতে গিয়া রহিমা দেখে তার এতদিনকার হাসু আর নাই। হাসু নামের মেয়ের জায়গায় দাঁড়িয়ে তার বয়সের এক যুবক।
টাকাটা শার্টের পকেটে রেখে হাসল হাসু। পুরাপুরি বেড়াগো লাহান আমারে লাগতাছে না ফুবু?
রহিমা কোনওরকমে বলল, হ।
চৌকি থেকে নামল হাসু। একহাতে ফুফুকে টেনে আনল বুকের কাছে। আমি বোজতাছি আমারে লইয়া চিন্তায় মইরা যাইতাছো তুমি। ডরে শইল্যের রক্ত পানি অইয়া গেছে তোমার। আমি তোমারে কইতাছি ফুবু, আমারে লইয়া তুমি চিন্তা কইরো না, ডরাইয়ো না। যেইডা অইছে এইডা ভাল অইছে। আল্লায় আমার উপরে রহম করছে দেইক্কা এমুন অইছে। বহুতদিন ধইরা এইডা চাইছি আমি?
কী?
হ। মউচ্ছামান্দ্রার বাইত্তে তুমি আমারে কামে দেওনের পর থিকাঐ চাইছি। দিনরাইত চব্বিশ ঘণ্টা যহন বেডাডি আমারে জ্বালাইছে, নিজেরে তাগো হাত থিকা রক্ষা করতে করতে আল্লারে আমি খালি কইছি, আল্লাহ এই আজাবের হাত থিকা তুমি আমারে বাঁচাও। আমারে পুরুষপোলা বানাই দেও। আমারে ইট্ট শান্তিতে ঘুমাইতে দেও। আল্লায় আমার কথা হোনছে। কহেক বচ্ছর ধইরা ইডু ইট্ কইরা বদলাইছে আমারে, আধাবেড়া বানাইছে। শেষতরি পুরাপুরি বানাই দিছে। আমি মনে অয় এই দুইন্নাইয়ের একহানঐ মানুষ যে আল্লার কাছে যা চাইছি আল্লায় আমারে তাইঐ দিছে। আর একহান সুবিদাও আমার আছে, আমার নামহান। হাসু যেমুন মাইয়াগো নাম অয় তেমুন বেডাগও হয়। নামও বদলাইতে অইবো না আমার। অহন আমি এই বাড়ি থিকা বাইর অইয়া পয়লা যামু ছিন্নগর। ওহেনে গিয়া নাপতের দোকান থিকা চুলডা বেড়াগো লাহান কইরা কাড়ামু। তারবাদে লঞ্চে কইরা যামু ঢাকা। অহন আমার কোনও ডর নাই। যহন যেহেনে ইচ্ছা আমি যাইতে পারুম, যেহেনে ইচ্ছা হুইতে পারুম, যেই কাম ইচ্ছা করতে পারুম, আমার মিহি কেঐ চাইয়াও দেকবো না। অহন পুরা দুইন্নাইডাঐ আমার।
হাসুর কথা শুনতে শুনতে বুকের ভিতর এতক্ষণ ধরে চাপ ধরে থাকা উদ্বেগ কষ্টে রূপান্তরিত হল রহিমার। এই প্রথম মনঅন্যরকম হল তার, চোখে পানি এল। তুই তাইলে আমারে ছাইরা যাইতাছচগা মা?
হাসু হাসল। মা না, কও বাবা। বাজান। তয় যাইতাছি ঠিকঐ, এই যাওনের অর্থ আছে। চিনা পরিচিত কোনও মাইনষেরে বোজতে দিতে চাই না যে আমার শইল্যের ভিতরে এমুন একখান কারবার অইছে। অচিনা জাগায়, অচিনা মাইনষের লগে গিয়া থাকতে চাই এর লেইগাঐ, তারা পয়লা থিকাঐ আমারে পুরুষপোলা হিসাবে চিনবো।
