আতাহার মৃদু হেসে বলল, হ, খুব ভাল করছো। তুমি না কইলে মায় এই হগল চিন্তা করতো না। আমার লেইগা অন্য জাগায় মাইয়া দেকতো। তোমারে যাইয়া কইতো। আমারে বুজাইতে, যাতে বিয়া করতে আমি রাজি অই।
হেদিনও কইলাম এই কথা কইতে আইছিলো!
তারবাদে?
কথায় কথায় আমি এই হগল কথা কইছি। কইতে খুব শরম করছে, তাও কইছি। নাইলে তুমি তো আমার চিরতরের পর অইয়া যাইতা! আমি চাইয়া চাইয়া দেকতাম নতুন বউ লইয়া তুমি ঘরের দুয়ার দিতাছো।
মুখে আর কিছু বলল না আতাহার। নিঃশব্দে ঘরের পিছন দিককার দরজা খুলতে খুলতে মনে মনে বলল, সত্যকথা কইয়া তুমি যে আইজ নিজের কী ক্ষতি করলা ভাবিছাব, হেইডা তুমি আইজ বোজবা না। বোজবা পরে। এই সত্যকথার লেইগা হারাজীবন ফস্তাইতে অইবো তোমার।
.
হাসুর জ্বর ছাড়ল সতেরো দিন পর।
সতেরো দিনের দিন সকাল থেকে জ্বরটা আর এল না। গোলাঘরের চৌকিতে শুয়ে জ্বর আসার জন্য যেন অপেক্ষা করছিল সে। সকাল গিয়া দুপুর হল, দুপুর গিয়া বিকাল সন্ধ্যা রাত। না জ্বর আর এল না। সব দেখে শুনে হাসু বুঝে গেল জ্বর ছেড়ে গেছে, আর আসবে না। মাজার তলা থেকে ব্যথাটাও উধাও হয়ে গেছে।
হাসুর জ্বর ছাড়াতে তার চেয়ে যেন বেশি খুশি হল রহিমা। সকাল থেকেই থেকে থেকে গোলাঘরে এসে ঢুকছিল। হাসুর গালে কপালে গলায় বুকে হাত দিয়া দেখছিল নাড়ার তলার আগুনের মতন ধিকিধিকি জ্বরটা রয়ে গেছে কি না। নাই দেখে আনন্দে আত্মহারা। আল্লার রহমত অইছে। আল্লায় মুখ তুইলা চাইছে, বলে আল্লার শুকুর গুজার করল অনেকবার।
তবে জ্বর ছেড়ে যাওয়ার আনন্দ হাসুর মুখে নাই। সে উদাস আনমনা, যেন চিন্তিত। সতেরো দিনের জ্বরে শরীর আর শরীর নাই তার, চেহারা সুরত মানুষের মতন নাই। মেয়েলি কোমলতা ইত্যাদি বহুদিন হল শরীর থেকে উধাও হয়েছে। পুরুষালি একটা ভাব হয়েছিল। জ্বরে যেন সেই ভাব আরও প্রকট হয়েছে। হাসু যেন এখন আর মেয়েই না, হাসু যেন পুরাপুরিই পুরুষ।
রাতেরবেলা হাসুর পাশে শুয়ে রহিমা বলল, আইজ থিকা আমার আর কোনও চিন্তা নাই। আইজ থিকা আমি আবার ঘুমাইতে পারুম। তুই একহান কাম করিচ হাসু, কাইল বিয়ান থিকা ঘর থিকা ইট্টু ইট্টু বাইর হ। উডানে ইট্টু হাঁট। দোফরে ঘাডে গিয়া সাপান দিয়া ডইল্লা ডাইল্লা না (নাওয়া)। এতদিন তো আর নাছ নাই! চুলে জট লাইগ্যা গেছে, শইল্যে জ্বউরা গন্দ। ভাল কইরা নাইলে দেকবি কাউলকাঐ শইল অনেক বেশি ভাল অইয়া গেছে। আর বিচনায় হুইয়া থাকতে থাকতে হাত পাও ওতো অবশ অইয়া যাওনের কথা! বেক কিছু কাইল থিকা আবার শুরু কর। দেকবি দুই-তিনদিনের মইদ্যে তুই এক্কেরে আগের লাহান। ঠাইস্যা ভাতপানি খাবি আর ঘুমাবি কয়দিন, তারবাদে কাম কাইজ শুরু করবি।
রহিমার কথা শুনে কথা বলল না হাসু। অন্ধকার ঘরে চুপচাপ জেগে রইল। হাসু কেন তার কথার জবাব দিল না আজ রাতে তা খেয়ালও করল না রহিমা, হাসুর দিকে পিছনে ফিরে ঘুমিয়ে গেল, মৃদু শব্দে ডাকতে শুরু করল তার নাক।
পরদিন সকালে কিছুটা বেলা হওয়ার পর ঘর থেকে বের হল হাসু। তহুরা বেগম তখন রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছেন। কয়েকদিন ধরে আমোদ আহ্লাদী ভাব তার চেহারা আচরণে। হাসুকে দেখে বললেন, জ্বর ছাড়ছে?
হাসু উদাস গলায় বলল, হ আম্মা, ছাড়ছে।
তার উদাসীনতা খেয়াল করলেন না তহুরা বেগম। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে। বললেন, তয় নাইয়া ধুইয়া সাফ সুতরা হ। দুই-একদিন পর কামকাইজ শুরু কর। কয়দিন বাদে আমার মাজরো পোলার বিয়া। বাইত্তে অনেক কাম।
এসব কথার কোনও জবাব দিল না হাসু। দুপুরবেলা দুর্বল শরীরেও পুকুরঘাটে গিয়ে সাবান দিয়া অনেকক্ষণ ধরে গোসল করল। ধোয়া শাড়ি পরল। বাড়ির লোকজনের খাওয়া হওয়ার পর সে যখন রান্নাঘরে ভাত খেতে এল তখন তার চেহারায় অনেকখানিই তাজা ভাব, শরীরে ভাল রকম পরিচ্ছন্নতা।
খেতে বসে হাফিজদ্দি বলেছিল, বহুতদিন বাদে হাসুরে দেকলাম। খাইতে বইয়া রোজ মনে অইত। কয়দিন চিন্তা করছি গোলাঘরে গিয়া ইট্টু দেইক্কামু। ডরে যাই নাই।
হাসু আনমনা গলায় বলেছিল, কীয়ের ডর?
বাড়ির মাইনষে কী না কী মনে করে!
হাসু আর কথা বলে নাই। বলেছিল রহিমা। হ এই বাড়ির মাইনষে যে কোনও কিছুতেই যে-কোনও কিছু মনে করতে পারে।
দুপুরটা শুয়ে কাটিয়ে শেষ বিকালের দিকে আবার ঘর থেকে বেরিয়েছিল হাসু। উদাস ভঙ্গিতে হাঁটতে হাঁটতে আসছিল বারবাড়ির সামনের নাড়ার পালায়। এখানে আজ আতাহারের শার্ট লুঙ্গি শুকাতে দেওয়া হয়েছে। এই শার্ট লুঙ্গি তোলার কাজটা আজ হাসু করল। শূন্য বাংলাঘরে গিয়ে আলনায় জিনিসগুলি গুছিয়ে রাখার সময় আতাহারের পুরনা ধুরনা একখান লুঙ্গি আর একখান শার্ট চুরি করে গোলাঘরে নিয়ে এল। রাতটা হাসুর কাটল অদ্ভুত এক উত্তেজনায়।
ভোররাতের কিছু আগে রহিমাকে ডেকে তুলল হাসু। ফুবু, ও ফুবু, ওডো।
হাসুর এরকম ডাকে ভয় পেয়ে গেল রহিমা। ধড়ফড় করে উঠে বসল। কী রে আবার জ্বর আইলোনি?
না।
তয় ডাক পাড়ছ ক্যা?
তোমার লগে কথার কাম আছে।
রহিমা বিরক্ত হল। কথা তো দিনেও কইতে পারতি। অহন ক্যা?
না দিনে কইতে পারুম না। অহনঐ কওন লাগবো।
হাসুর গলায় কী যেন কী ছিল, রহিমা থতমত খেল। অন্ধকারে হাসুর মুখের দিকে তাকাল, মুখ দেখতে পেল না। বলল, আইচ্ছা ক।
