তবু কথাটা স্বীকার করল না পারু। দৃঢ় গলায় বলল, মিছাকথা। আম্মার লগে এই হগল কথা আমার অয় নাই।
মায় দিহি কইলো।
কইলে মিছাকথা কইছে। তোমারে বুজ দেওনের লেইগা। আর একহান কথা, তোমার লগে নিজের বিয়ার কথা যুদি আমার কওনঐ লাগতো তাইলে কথাডা তো আমি বহুতদিন। আগেঐ কইতাম! তোমার ভাই মরণের চল্লিশদিন পর।
এ কথায় আতাহার দমে গেল। না, আন্দাজে ছোঁড়া ঢিলটা তো তা হলে কাজে লাগছে না। তার মানে পারুর লগে এসব কথা হয় নাই মা’র। পারু তাকে কিছুই বলে নাই। মা নিজ থেকেই চাইছেন পারুকে সে বিয়া করুক। অযথা পারুকে যে আতাহার সন্দেহ করেছিল, সন্দেহ করে আজ এসেছিল কথা বের করতে, সন্দেহটা ঠিক না।
আতাহার থম ধরে আছে দেখে পারু বলল, কী অইলো, চুপ কইরা আছো ক্যা?
চিন্তা করতাছি।
কী চিন্তা?
আবার একখানা ডাহা মিথ্যা কথা বলল আতাহার। মায় আমার লগে এমুন ঠাইট না ঠাইট (ডাহা) একহান মিছাকথা কইলো!
কইছে আমগো দুইজনের ভালর লেইগাঐ। মনে করছে আমার কথা কইলে তোমার মনডা নুলাম অইবো।
হ আমারও তাই মনে অয়।
আতাহারের গলার কাছে মুখ ঘষে পারু বলল, তয় কী কও তুমি? তুমি রাজি? বিয়া করবা আমারে?
পারুর পিঠ দুইহাতে খামছে ধরে আতাহার বলল, আগে তোমার কও। তুমি রাজি? বিয়া বইবা আমার কাছে?
বিয়া তো তোমার কাছে আমি বইয়াঐ রইছি। ওই যে যেদিন বিয়ালে, আইজ থিকা দশ-বারো বচ্ছর আগে, পিছে থিকা তুমি আমারে প্যাঁচাইয়া ধরছিলা, তোমারে লইয়া দুয়ারখোলা ঘরেঐ হুইয়া পড়ছিলাম আমি, স্বামী থাকনের পরও মনে মনে হেদিন থিকাঐত্তো তোমারে আমি আমার আসল স্বামী মাইন্না নিছি। তোমার তিনহান পোলাপান পেডে লইছি। অহনও বউ জামাইর লাহান রাইত্রে রাইত্রে থাকি। সবঐ অইছে, খালি নিয়মের বিয়াড়া আমগো হয় নাই। হেই বিয়াডাঐ আম্মায় অহন আমগো দিতে চাইতাছে। তয় আব্বায় কি রাজি অইবো?
মা’য় যেমতে চেষ্টা করতাছে, রাজি না অইয়া যাইবো কই!
হের ঠিক নাই। হেয় কি কেঐর কথা গেরাইজ্জ করবো?
এইডা মনে অয় করবো।
ক্যা?
মায় তো জীবনে হেরে কোনওদিন কিছু কয় নাই। এই পয়লা কইলো। বাবায় মনে অয় মা’র কথা হালাইবো না।
একথা শুনে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেল পারু। দুইহাতে শরীরের সব শক্তি দিয়া আঁকড়ে ধরল আতাহারকে। ইস আমার যে কেমুন খুশি লাগতাছে না! এতদিনে আমার পোলাপান তিনডা অগো আসল বাপ রে বাপ ডাকতে পারবো।
আর তুমি পারবা তোমার আসল স্বামীরে স্বামী ডাকতে।
হ গো, হ। দেখবা বিয়ার দিন থিকাঐ আমি একদোম নতুন বউর লাহান অইয়া গেছি। যেন ওইদিনঐ আমার পয়লা বিয়া অইলো। আমার যেন কোনও পোলাপান নাই। বয়েস যেন দশ-বারো বচ্ছর কইম্যা গেছে আমার। বিয়ার রাইত্রে আমার লগে থাকলে তোমার মনে হইবো জিন্দেগিতে পয়লা মাইয়া মাইনষের লগে থাকলা তুমি।
আর তোমার কী মনে হইবো?
বাসর রাইত্রে আমার খুব ডর করবো।
ক্যা?
তুমি বোজো না, ক্যা?
না। তুমি কও।
বাসর রাইত্রে সব মাইয়ারাঐ ডরায়। মনে করে জামাই কেমুন না কেমুন করবো। আমিও অমুন ডর ডরামু। পরের রাইত্রেঐ দেকবা আর ডরাইতাছি না। বেবাক ঠিক অইয়া গেছে। ওইদিন থিকা আমি তোমার লেইগা রাইন্দা বাইড়া রাখুম, তোমার লগে বইয়া। ভাত খামু। এক ফাঁকে নিজের এক লোকমা ভাত তোমারে খাওয়াইয়া দিমু! তোমার এক লোকমা খাওয়াইয়া দিবা আমারে। রোজ বিয়ালে তোমার লেইগা আমি মাথায় তেল দিমু, চোখে কাজল দিমু। রাইত্রে তোমার হাত পাও টিপপা দিমু, মাথার চুল টাইন্না দিমু। গরমের দিনে রাইত্রে আমি ঘুমামু না। হারারাইত শিথানে বইয়া তালের পাঙ্খ দিয়া তোমারে আমি। বাতাস করুম। অসুক বিসুক অইলে জানডা তোমার লেইগা আমি দিয়া দিমু। জীবনের সবগুনি দিন সবগুনি রাইত বিয়ার দিনের লাহান, বাসর রাইত্রের লাহান আমোদে কাড়ামু। তারপর যহন মরণ আইবো, তোমারে আমার পিছে দিয়া আমি খাড়ামু মরণের সামনে। আজরাইলরে কমু, আমার স্বামীরে না, জান কবচ করতে অয় আমারডা করো। সতী নারী পতির আগে মরে।
পারুর কথা শেষ হওয়ার লগে লগে তেঁতুলগাছে রাতভর ঘুমিয়ে থাকা দুই-তিনটা কাক বুঝি জেগে উঠল। আড়ষ্ট গলায় দুই-তিনবার ডাকতেই গলা স্বাভাবিক হল তাদের। গলা খুলে ডাকাডাকি শুরু করল। বড়ঘরের ওদিকে ডাকতে শুরু করল ঘরশালিক। খানিক পরই ভোররাতের পাতলা অন্ধকারে উঠান পালানে নামবে দোয়েল। লাফিয়ে লাফিয়ে চড়বে আর ডাকবে। বাগ দিতে শুরু করবে বাড়ির খোয়াড়ে আটকা মোরগগুলি।
শরীরের উপর থেকে পারুকে নামিয়ে উঠল আতাহার। বিয়ান অইয়া গেছে। অহন আয়জান দিতে উঠব বাবায়। আমি যাইগা।
শার্ট পরল আতাহার। দরজা খোলার জন্য খাট থেকে পাটাতনে নামল।
পারু বলল, ইট্টু খাড়ও। একহান কথা হুইন্না যাও।
কও।
আমি তোমার লগে কয়হান মিছাকথা কইছি আইজ। আম্মায় কইলাম সত্য কথা কইছে তোমারে। কয়দিন আগে একদিন দোফরে তোমার বিয়াশাদির ব্যাপারে আমার লগে হেয় কথা কইতে আইছিলো। হেদিন আমিঐ তারে কইছিলাম বেবাকঐ যহন আপনে জানেন তয় পোলারে অন্য জাগায় বিয়া করাইতে চান ক্যা! যার পোলাপানের বাপ অইছে। হেয় তার লগেঐ তার বিয়া দেন!
শুনে স্তব্ধ হয়ে রইল আতাহার। ও তাইলে এই কারবার! আমার অনুমান ঠিক!
মুখে কিছু বলল না।
পারু আহ্লাদী গলায় বলল, ভাল করছি না কইয়া?
