পারু স্তব্ধ হয়ে আছে দেখে আতাহার বলল, কী অইলো, চুপ কইরা রইলা যে?
পারু গম্ভীর গলায় বলল, কী কমু?
হোনলা না আমি কী কইলাম?
হ হুনছি।
খালি হোনলে তো অইবো না। কিছু কও। তুমি কিছু কইবা দেইখাই তো কথা উড়াইলাম।
আতাহার আবার সিগ্রেটে টান দিল।
আজ বিকালের পর থেকে অনেকটা রাত তরি ভাল রকমের ঝড়বৃষ্টি হয়েছে। কয়দিন ধরে পড়া ভ্যাপসা গরম কেটে গেছে। গভীর রাতে দেশগ্রামে অবশ্য সারাদিনের গরম ভাবটা থাকে না। কোমল একখান ঠান্ডা নামে। আজ রাতে সেই ঠান্ডার লগে মিশেছে বৈশাখী ঝড়বৃষ্টির গরম থোয়া ভাব। রাতের আবহাওয়া আজ খুবই আরামদায়ক। এই আরামদায়ক আবহাওয়ায় রাতের আঁধারে দুইজন মানুষ মনপ্রাণ ভরে পেতে চেয়েছিল নিজেদেরকে। তবে মিলন তেমন আনন্দের হয় নাই তাদের। পুরুষমানুষটার আচরণে ব্যস্ততার ভাব ছিল।
এই কারণেই কি না কে জানে, পারু টের পাচ্ছিল তার মাথার খুব ভিতরে কেমন একখান ধরি ধরি ভাব! নাকি আতাহারের মুখে তার বিয়ার কথা শুনে মাথা ধরতে যাচ্ছে। তার, নাকি শাশুড়ির উপর মেজাজ বিগড়ে যাওয়ার কারণে এমন হচ্ছে!
সিগ্রেটে শেষ টান দিয়ে খাটের কোনায় ডলে ডলে শেষ অংশটা নিভাল আতাহার। এতক্ষণ আধশোয়া হয়ে সিগ্রেট টানছিল। এখন সিগ্রেট শেষ হয়েছে দেখে গা পুরাপুরি ছেড়ে, হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়ল। হাত বাড়িয়ে পারুকে টেনে আনতে চাইল বুকের কাছে। পারু নড়ল না, শক্ত হয়ে রইল।
শরীরকর্ম শেষ হওয়ার পরের সময়টা বহুদিন ধরেই তারা কাটায় একজন আরেকজনকে জড়িয়ে, শুয়ে শুয়ে টুকটাক কথা বলে, পরস্পরকে আদর সোহাগ করে। আজ সেটা হচ্ছে না। পারু শক্ত হয়ে বসে আছে। কী কারণে শক্ত হয়েছে বুঝল আতাহার। তবু বলল, কী অইলো?
পারু শীতল গলায় বলল, কী?
বইয়া রইলা যে?
তয় কী করুম?
জানো না কী করবা?
না জানি না।
আতাহার কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমি তো বুজছিঐ কীর লেইগা তুমি এমুন করতাছো! তয় এমুন করণ তোমার ঠিক অইতাছে না।
পারু রাগী গলায় বলল, তয় কী করুম? নাচুম?
হ নাচনঐ উচিত।
ক্যা? কী এমুন ফুর্তি লাগছে আমার!
তোমার মনের মানুষের বিয়া ঠিক অইতাছে, এইডা তোমার ফুর্তি না?
এইডা আমার ফুর্তি না, এইডা আমার মরণ। আমার মাথা বেদনা, হাত পাওয়ের ঝিমঝিমানি, চোক্কের কোণের কালি।
অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে আবার পারুকে কাছে টানল আতাহার। বেক কথা না হুইন্না শক্ত অইয়া গেলা? আহো, কাছে আহো। আসল কথাহান কই। হোনলে সত্যই ফুর্তি অইবো তোমার।
তবু শক্ত হয়ে রইল পারু। বলল, আমি জানি কী অইব!
না তুমি জানো না।
না জানলে কও, জানি।
বিয়া কার লগে, পাত্রী কে, হেইডা হোনো।
হোননের কাম নাই আমার।
তোমারই কাম হোননের।
একটু থামল আতাহার। যে কথাটার জন্য এতক্ষণ ধরে অযথা অনেক কথা বলছে, আচমকাই এখন সেই কথাটা সে বলে ফেলল। মা’য় আমার বিয়া ঠিক করছে তোমার লগে।
শুনে প্রথমে বিশ্বাস হল না পারুর। মনে হল আতাহার ঠাট্টা করছে। গম্ভীর গলায় বলল, আমার লগে ফাইজলামি করবা না। এই হগল ফাইজলামি আমার ভাল্লাগে না।
আমি তোমার লগে ফাইজলামি করতাছি না। বিশ্বাস না অইলে কাইল বিয়ানে আমার মা’রে জিগাইয়া দেইখো।
আতাহারের কথার ভঙ্গিতে পারু এবার পরিষ্কার বুঝল, না সে মিথ্যা বলছে না। এতদিন ধরে মিলামিশার ফলে আতাহারের শরীর মন যেমন চিনে সে, কোন সময় তার কী আচরণ, কোন কথার ধরনে বোঝা যাবে সত্য মিথ্যা, সব মুখস্থ তার। সেই মানুষপড়া মুখস্থ বিদ্যায়। পারু বুঝে গেল আতাহার সত্যকথা বলছে। বুকের ভেতর চাপ ধরে বসা ভাবটা কেটে গেল। মুখের গোমড়া ভাব উধাও হয়ে সেই মুখে ফুটল হাসি, চোখের তারা নেচে উঠল আনন্দে, নারী শরীরের কোমলতায় প্রিয় পুরুষের ছোঁয়ায় যেমন কাঁপন লাগে ঠিক তেমন এক কাপনে কাঁপতে লাগল পারু। মাথা ধরার ভাব কোথায় গেল, কোথায় গেল থমথমা গলা, পলকে সে হয়ে উঠল রঙ্গিনী, সোহাগিনী, পরিপূর্ণ এক যুবতী নারী। আতাহারকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতন তার শরীরের উপর পুরা শরীর মেলে শুয়ে পড়ল। আবেগ জড়ানো গলায় বলল, সত্যঐ কইতাছো তুমি? সত্য?
দুইহাতে পারুকে জড়িয়ে ধরে আতাহার বলল, সত্য।
আথকা আম্মায় তোমার লগে আমার বিয়া দিতে চাইতাছে ক্যা?
আতাহার বুঝে গেল এখন থেকে তার আসল কাজ শুরু হল। পারুর পেট থেকে যে কথা বের করবার জন্য আজ তার কাছে আসছে সে, পারুর শরীর ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়া যে কারণে তাড়াহুড়া হয়েছে, যে কারণে ফালতু কথার ফুলঝুরি ছুটিয়ে এতটা সময় নষ্ট করতে হয়েছে, এত মিথ্যা, এত চালাকি ভণিতা করে আসল অবস্থাটা এতক্ষণে সে তৈরি করতে পেরেছে, কোনও অবস্থাতেই তা সে নষ্ট হতে দিবে না। কাজ হাসিল করবেই। এই কারণেই আচমকা আতাহার বলল, ক্যা দিতে চায় তুমি জান না?
পারুও অবাক হওয়ার ভান করল। না! আমি কেমতে জানুম?
ডাহা মিথ্যা বলল, আতাহার মায় দিহি কইলো।
কী কইলো?
তোমার লগে বলে হের কথা অইছে।
কী কথা?
এই হগল বিয়া সাদির কথা।
ভিতরে ভিতরে ততক্ষণে নিভে গেছে পারু, দমে গেছে। তা হলে কি শাশুড়ি পারুর দিকটা বিন্দুমাত্র ভেবে দেখেন নাই! লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে যে কথা পারু তাকে বলেছিল ঠিক সেকথাই পারুর বরাত দিয়া তিনি আতাহারকে বলে দিয়েছেন! ছি! ছি! আতাহার তাকে এখন কী ভাববে!
