একথা শুনে রহিমা একটু রাগল। আকথা কইচ না।
আকথা না ফুবু। সত্য মনে হয় আমি মইরা যামু। জ্বর তো আছে, আর ওই জাগার বেদনাডা! ওই বেদনাডাই আসল। আমার মনে অয় জ্বরডা ওই বেদনার লেইগাঐ। বেদনা না কমলে জ্বর কমবো না।
হ। আমারও মনে অয়। তয় ডাক্তর তো কইতে পারলো না বেদনাডা ক্যান অইছে!
এর লেইগাঐ কই, আমি আর বাঁচুম না।
এইসব বাঁচামরার কথা ভাল লাগছিল না রহিমার। থেকে থেকে মনে হচ্ছিল আজ অনেক অনেক বছর ধরে রক্ত সম্পর্কের এই একজন মানুষই তার আছে। একটু দূরের একগ্রামে থাকে ঠিকই, দুয়েক মাস পর পরই ছুটে আসে তার কাছে, দুই-চার-দশদিন থেকে আবার ফিরে যায়। যেতে চায় না, প্রতিবারই চিরতরে থেকে যেতে চায় এই বাড়িতে, ফুফুর কাছে। ফুফুর সাধ্য নাই মা’কে রাখার। এবার শেষ তরি যখন তাকে রাখার ব্যবস্থা হল তখনই ধরল মরণ জ্বরে। এবার বুঝি চিরতরেই যাবে হাসু।
হাসু মরে যাওয়ার পর প্রথম প্রথম কি রহিমার বিশ্বাস হবে যে সত্যি সত্যি মরে গেছে। সে! সত্যি সত্যি আর কখনও ফিরা আসবো না!
না, তা মনে হবে না। সে ভুলে যাবে যে এই বাড়িতে, তার কাছে পাকাপাকি থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল হাসুর। তার মনে হবে যে, কয়েকদিন তার কাছে থেকে আবার নিজের ঝিগিরির জায়গা মউছামান্দ্রার সেই বাড়িতে ফিরা গেছে হাসু। দুয়েকমাস পর আবার যে-কোনও একদিন কাপড়ের পোঁটলাখান বুকে ধরে দীনহীন বেশে মান্নান মাওলানার বাড়িতে এসে উঠবে। রহিমাকে দেখেই দুইহাতে জড়িয়ে ধরবে তার গলা। ফুবু গো, কেমুন আছো তুমি! তোমারে ছাইড়া বেশিদিন আমি থাকতে পারি না, এর লেইগা আবার আইয়া পড়লাম।
দুনিয়ার যে-কোনও জায়গা থেকেই ফিরতে পারে মানুষ, শুধু কবর থেকে পারে না!
এসব ভেবে চোখ ছলছল করে উঠল রহিমার। ভাবনা বদলাবার জন্যই কথা ঘুরাল সে। বলল, তয় কামের কাম একহান করছে বুজি।
কথাটা বুঝতে পারল না হাসু। বলল, কোন কামডা?
এই যে আতাহারের লগে পারুর বিয়ার চেষ্টা।
এইডা কি হেয় করছে?
হ।
তয় খুব ভাল করছে। আতাহার দাদার বিয়া ভাবিছাবের লগেঐ হওনের কাম।
তারবাদেও আমার একহান সন্দ আছে। শেষ পর্যন্ত বিয়াডা অইবো কি না!
ক্যা?
হুজুর আর আতাহারের মতিগতি বোজন বড় কঠিন। যে-কোনও কথা যে-কোনও সমায় ঘুরাইয়া হালাইতে পারে হেরা।
এইডাও ঘুরাইবো?
ঘুরাইতে পারে।
তয় আর লাব অইলো কী?
হ কোনও লাব নাই। মাজখান থিকা বুজি খালি কষ্ট পাইবো।
ক্যা ভাবিছাবে কষ্ট পাইবো না?
হ হেয়ও পাইবো।
একটু থেমে রহিমা বলল, তয় কোনও কথা কওন যায় না রে মা। দেহা গেল আমরা যা চিন্তা করতাছি এইডির কোনওডাঐ সত্য অইলো না। আতাহার ঠিকই পারুরে বিয়া করলো, পারুরে লইয়াঐ সংসার পাতলো। নিজের পোলাপান নিজে বুইজ্জা লইলো।
আল্লায় যেন তাই করে।
হ, আর আল্লায় যেন তরেও একদোম ভাল কইরা দেয়।
দুইজন মানুষের কেউ খেয়াল করে নাই, বাইরেটা ততক্ষণে অন্ধকার হয়ে গেছে। বেলা মুছে গেছে, হাওয়া বাতাস বন্ধ হয়ে থমথমা অবস্থা চারদিকে। সারা আকাশ ছেয়ে গেছে ঘনকালো মেঘে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, গুরুম গুরুম করে মেঘ ডাকছে। বছরের প্রথম কালবৈশেখি ধেয়ে আসছে।
এই অবস্থা দেখে দরজার কাছে ছুটে গেল রহিমা। আকাশের দিকে তাকিয়ে উৎফুল্ল গলায় বলল, আল্লায় রহম করছে। মেগ তুফান আইতাছে। মেগ তুফান আইলে যুদি দুইন্নাইডা ঠান্ডা অয়!
.
অন্ধকারে নিজেকে গুছাতে গুছাতে পারু বলল, তোমার আইজ কী অইছে?
খাটের মাথার দিকে রাখা শার্টের পকেট হাতড়ে সিগ্রেটের প্যাকেট আর ম্যাচ বের করল আতাহার, সিগ্রেট ধরাল। ম্যাচের কাঠি জ্বেলে সিগ্রেট ধরাবার সময় অন্ধকার ঘরে তার সামান্য আলোকিত মুখ কীরকম ভৌতিক বীভৎস মনে হল পারুর।
হাত ঝেড়ে ম্যাচের কাঠি নিভিয়ে সিগ্রেটে টান দিয়া আতাহার বলল, কী অইবো?
মনে অইলো কিছু অইছে।
ক্যান মনে অইল?
পারু কথা ঘুরাল। আমার আইজ ভাল্লাগে নাই।
ক্যা?
তোমার কেমুন জানি হরতরাইস্যা ভাব আছিলো। এতদিন ধইরা আমার লগে থাক তুমি, আমি কেমুন মাইয়া, কেমতে কী চাই এইডা খালি তুমি জানো। জাইন্নাও আইজ আমার মনের মতন কইরা চলো নাই।
আতাহার আবার সিগ্রেটে টান দিল। টানের লগে লগে সিগ্রেটের একবিন্দু আলো নাকের ডগা আলোকিত করল তার। সেদিকে তাকিয়ে পারু বলল, এর লেইগাঐ কথাডা জিগাইলাম। সত্য কইরা কও তো, কী অইছে তোমার?
আমি একহান চিন্তায় পড়ছি। কীয়ের চিন্তা? বিয়ার।
কী?
কইলাম যে বিয়ার চিন্তায় পড়ছি।
বুক ধক করে উঠল পারুর। তা হলে কি তার এতদিনকার মানুষটি, গোপনে তার তিন সন্তানের বাপ, শরীর-মনের অধিকর্তা অন্যের হয়ে যাচ্ছে! খানিক আগে অন্ধকার বিছানায় যে দুইজন মানুষ দুইজনার শরীরের ভিতর ডুবে গিয়েছিল, সেই দুইজন মানুষ কি তা হলে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। তাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াচ্ছে আরেক নারী! তা হলে যখন তখন ধরে থাকা মাথা কে সারাবে পারুর! হাতপায়ের ঝিমঝিমানি কে বন্ধ করবে! কার জন্য বিকালবেলা সাজগোজ করবে পারু! সন্তানদের ঘুম পাড়িয়ে সুগন্ধি পান সাজিয়ে অন্ধকার খাটে বসে কার জন্য অপেক্ষা করবে!
তারপর শাশুড়ির কথা মনে হল পারুর। সেদিন যে লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে মায়ের মতন মানুষটাকে সব খুলে বলেছিল সে, মানুষটা যে তাকে বলে গিয়েছিলেন পারুর জন্য চেষ্টা করবেন, চেষ্টা কি তিনি তা হলে করেন নাই! পারুর উঠান থেকে চলে যেতে যেতেই কি ভুলে গেলেন নিজের দেওয়া আশ্বাসের কথা!
