তবু যে শেষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছিল কাজির পাগলা বাজারে, করিম ডাক্তারকে দেখিয়ে ফিরতে পেরেছিল! যদিও দিনটা পুরাই কাবার হয়ে গিয়েছিল এই কাজে, তবু ডাক্তার তো দেখানো হয়েছে! অমুদ তো পেটে পড়ছে হাসুর!
তারপরও জ্বর কমার কোনও লক্ষণ হাসুর নাই। আজ এগারো দিন।
এই এগারো দিনে রহিমাও বিধ্বস্ত। হাসু বিধ্বস্ত হয়েছে জ্বরে আর রহিমা হয়েছে জ্বরের হাত থেকে হাসুকে বাঁচাতে গিয়া। সেই যে, যে রাতে জ্বরে বেহুশ হয়ে গিয়েছিল হাসু সেই রাতেই রহিমার প্রথম মনে হয়েছিল মান্নান মাওলানার বারবাড়ির সামনে এসে যেন দাঁড়িয়ে আছে আজরাইল। এক-পা দুই-পা করে উঠানের দিকে আগাচ্ছে। কোনও কোনও গভীর রাতে যেন উঠান ভেঙে গোলাঘরের অনেকখানি কাছে চলে আসে, বন্ধ দরজায় ধাক্কা দেয়। সেই শব্দে হাসু না যেন ধড়ফড় করে ওঠে রহিমা। তারপর মাথায় পানি দিয়া, পানিপট্টি দিয়ে এমন মারমুখো ভঙ্গিতে আগলে রাখে হাসুকে, মন খারাপ করে আজরাইল আবার ফিরা যায় বারবাড়ির দিকে।
দিনেরবেলাও একবার দুইবার উঠানের দিকে পা ফেলে আজরাইল, দূর থেকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে গোলাঘরের দিকে, রহিমার জন্য কিছুতেই জুত করতে পারছে না। ক্ষণে ক্ষণেই সে ছুটে আসছে গোলাঘরের দিকে। চিলের আচমকা থাবা থেকে ছানাপোনা রক্ষার জন্য মা-মুরগি যেমন করে ছানাদের লুকিয়ে রাখে বুক পাখনার তলায় ঠিক তেমন করে হাসুকে আগলে রাখছে আজরাইলের হাত থেকে। ঘরের খুব কাছে এসেও যে কারণে ফিরে যেতে হচ্ছে মৃত্যুদূতকে।
আবার কোনও কোনও সময় গোলাঘরের দরজা আবজায়া এমন ভঙ্গিতে ধানের ডোলে ঢেলান দিয়া বসে থাকে রহিমা যেন হাসুকে সে পাহারা দিচ্ছে। যেন আজরাইল এসে কিছুতেই না ঢুকতে পারে ঘরে, কবজ করতে না পারে হাসুর রুহ্।
এই যেমন এখন।
হাসুর কথা শুনে চোখ তুলে চৌকির দিকে তাকাল রহিমা। চিত হয়ে শুয়ে আছে হাসু। এই গরমেও গলা তরি কাঁথার ঢাকায়। কথায় ঢাকা থাকার পরও পরিষ্কার বোঝা যায় শরীর বিছানার লগে মিশা গেছে। মাথা বের করা না থাকলে আচমকা বোঝাই যাবে না যে বিছানায় কেউ শুয়ে আছে। মনে হবে পুরানা কথাই যেন মানুষের আকৃতির মতন করে ফেলে রাখা হয়েছে।
হাসুর দিকে তাকিয়ে আর তার খানিক আগের কথা শুনে এই ক’দিনের মধ্যে আজই রহিমার প্রথম মনে হল, তা হলে কি সময় ফুরিয়ে এল মেয়েটির? এত চেষ্টার পরও কি আজরাইলকে ঠেকিয়ে রাখতে পারল না সে! জীবন মরণের যুদ্ধে হেরে গেল!
মনে হওয়ার পর অদ্ভুত এক ছটফটানি হল রহিমার। পাগলের মতন ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াল সে। হাসুর শিথানে গিয়া বসল। যেন তাকে ফাঁকি দিয়ে আবজানো দরজার ফাঁকফোকর দিয়া কখন ঢুকে পড়েছিল আজরাইল। হাসুর রুহের ওপর থাবা বসাবার আগেই রহিমা এসে আড়াল করেছে। নানারকম চেষ্টা করেও যেন সুবিধা করতে পারছে না। তারপর একসময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফিরে যাচ্ছে। তবে একেবারেই চলে যাচ্ছে না। বারবাড়ির সামনের নাড়ার পালাটির সামনে গিয়া দাঁড়িয়ে থাকছে। চোখ গোলাঘরের দিকে। কখন রহিমাকে ফাঁকি দিয়া ওই ঘরে ঢুকবে, কখন কবজ করবে হাসুর জান, যেন সেই তালেই আছে।
শিথানে বসে রহিমা তখন হাসুর কপালে হাত দিয়েছে। করিম ডাক্তর তো কইছে, দুই চাইর দিনের মইদ্যেঐ ভাল অইয়া যাবি।
হাসু ক্লান্ত কাতর গলায় বলল, কইলো তো! তয় আমি তো ভাল অই না!
সাতদিনের অষইদ দিছে। সাতদিন যাউক।
আইজ লইয়া ছয়দিন গেল! কাইল সাতদিন অইব। আমার তো মনে অয় না কাউলকার মইদ্যে আমি ভাল অইয়া যামু?
দেখ কী অয়! নাইলে আবার ডাক্তরের কাছে নেওন লাগবো। টেকা তো আছেই। বুজি কইছিলো পনচাশ টেকা দিবো, দিছিলো একশো টেকা।
এই অবস্থায়ও হাসু অবাক হল। সত্যঐ! ক্যা, একশো টেকা দিছিলো ক্যা?
হেই কথা তরে কই নাই? দেখছো কারবার! আমার তো মনে অয় তরে কইছি।
না কও নাই।
তর জ্বরে আমিও মনে অয় শেষ অইয়া গেছি। বেক কথা ভুইল্লা যাই। হোন, হেদিন তরে লইয়া ডাক্তরের কাছে যাওনের আগে বুজির কাছে গেছি টেকার লেইগা, গিয়া দেহি হের মনডা যে কী খুশি! কয় খুব আমোদের একহান সমবাত আছে রহি। পারুরেঐ বিয়া করতে রাজি অইছে আতাহারে।
কথাটা শুনে এরকম জ্বরের ঘোরেও খুবই অবাক হল হাসু। কী?
হ। এই হগল কথা কইতেঐ আতাহারের ঘরে গেছিলো হেয়। যাওনের আগে এই ঘরে আইয়া তরে দেইক্কা গেছে। কইয়া গেছে তরে ডাক্তর দেহানের লেইগা পনচাশ টেকা দিবো। তারবাদের যেই মনোবানচা লইয়া পোলার ঘরে গেছে হেই মনোবানচা পূরণ অইছে। এর লেইগা খুশি অইয়া পনচাশ টেকার জাগায় একশো টেকা হেয় তরে দিছে। তর লেইগা হেদিন খরচা অইছে চল্লিশ টেকা। আরও ষাইট টেকা আছে। লাগলে ওই টেকা লইয়া আর তরে লইয়া আবার করিম ডাক্তরের কাছে যামু।
হেইডা আমি আর যামু না।
ক্যা?
যেই কষ্ট কইরা হেদিন গেছি, হেই কষ্টের থিকা ঘরে হুইয়া হুইয়া মইরা যাওন অনেক ভাল। দরকার অইলে মইরা যামু, তাও ওই কষ্ট আর করুম না।
হাসুর মুখের দিকে তাকিয়ে সামান্য সময় চুপ করে রইল রহিমা। তারপর বলল, তুই অহন না গেলেও অইবো? ডাক্তর সাবে যেই কাগজহান দিছে ওইডা লইয়া গেলে আবার অষইদ দিয়া দিবো। দরকার অইলে আমি যাইয়া অষইদ লইয়ামু।
হাসু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনে অয় যাওন আর লাগবো না। যেই অষইদ দিছে হেইডি ফুরানের আগেঐ আমি মইরা যামু।
