আমার মনে অয় অইবো।
একটু থেমে আতাহার বলল, তয় অহনঐ ভাবীছাবের লগে কথা তুমি কইয়ো না।
এতক্ষণ ধরে ছেলের লগে কথা বলে, তার নরম বিনয়ী ভাব দেখে খুবই আশাবাদী হয়েছিলেন তহুরা বেগম। বুকে ভরসা পেয়েছিলেন এই ভেবে যে ছেলে তার কথা শুনবে। এখন আচমকা পারুর লগে এখনই তাকে কথা বলতে মানা করায় বড় রকমের ধাক্কা খেলেন। থতমত খেয়ে বললেন, ক্যা, অহন কথা কইতে অসুবিদা কী?
আতাহার সরল মুখ করে বলল, না তেমুন কোনও অসুবিদা নাই। আমি অন্য একটা কথা চিন্তা কইরা অহন তোমারে কথা কইতে না করলাম।
কী চিন্তা কইরা?
দেহি বাবায় আমার লগে এই হগল লইয়া কথা কয় কিনা! আর কী কয়?
বুকের পাথর যেন নেমে গেল তহুরা বেগমের। অন্ধকার মুখ আলোকিত হলো। হ এইডা ভাল বুদ্ধি করছ?
হাত বাড়িয়ে ছেলের ডানহাতটা ধরলেন তহুরা বেগম। তরে আমি শেষ একহান অনুরুদ করি বাজান। এতাহানি ডাঙ্গর অইছচ তুই, কোনওদিন তরে আমি কিছু কই নাই, কিছু চাই নাই তর কাছে। আইজ জিন্দেগিতে পয়লা আর শেষবারের লাহান চাইতাছি। কয়দিন ধইরা ঘনঘন মোতাহাররে আমি স্বপ্নে দেহি। ও যেন আমারে খালি ডাক পাড়ে। এই হগল স্বপ্ন দেইখা আমার খালি মনে অয় আমার দিন ফুরাইয়া আইছে, আমি আর বেশিদিন নাই। তয় তর কথা চিন্তা কইরা, পারু আর অর তিনডা পোলাপানের কথা চিন্তা কইরা মরণরে আমি কই, মরণ, তুমি আর কয়দিন পরে আহো। নমজ পড়তে পড়তে আল্লারে কই, আল্লাহ, তুমি আমারে আর কয়ডা দিন পরে উড়াইয়া নেও। আমি আমার মাজারো পোলাড়ার গতি কইরা লই, আমার বড়পোলার বউ আর নাতি নাতকুড়ের গতি কইরা লই, তারবাদে তুমি আমারে উড়াইয়া নিয়ো।
মায়ের কথা শুনে মন যে গলল বা নরম হল আতাহারের তা না, ভাব দেখাল যেন সে খুবই নরম হয়েছে, মায়ের কথা মন দিয়া শুনছে আর তার কথা জীবন দিয়া হলেও রাখবে। এই ভাবটা দেখাবার জন্য কপট একখান দীর্ঘশ্বাসও ফেলল।
এই দীর্ঘশ্বাস শুনে তহুরা বেগম ভাবলেন তার অবস্থাটা হৃদয় দিয়া বোঝার চেষ্টা করছে ছেলে। তিনি খুশি হলেন। বললেন, তর কাছে আমি আর কিছু চাই না বাজান, তুই খালি আমার কথাডা রাখিস। পারুরে বিয়া কইরা সংসারী অইচ। তর বাপরে আমি কমু দুই এক মাসের মইদ্যেই যেন বেবস্তা করে। তগ দুইজনের হাসি মুখ দেইখা আমি যেন মরতে পারি।
আতাহার মাথা নীচা করে বলল, তুমি চিন্তা কইরো না। আগে দেহি বাবায় কী কয়!
তহুরা বেগম গদগদ গলায় বললেন, তর বাপেও আমার কথাঐ কইবো।
তয় আর অসুবিদা কী?
তুই তাইলে রাজি বাজান?
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হাসল আতাহার। তোমরা বেবাকতে রাজি অইলে আমি আর রাজি না অইয়া যামু কই!
শুনে এতটাই খুশি হলেন তহুরা বেগম, মুখে গভীর আনন্দের হাসি ফুটল। যেন দুনিয়ার সবচাইতে মূল্যবান জিনিসটা তিনি তাঁর হাতের মুঠায় পেয়ে গেছেন এমন ভাব হল তাঁর আত্মায়। গভীর আবেগে আনন্দে দুইহাতে ছেলের মাথাটা বুকে টেনে আনলেন। মমতায় আবেগে ফেটে পড়া গলায় বললেন, আমি খুব খুশি অইছি বাজান, খুব খুশি অইছি। এমুন খুশি জিন্দেগিতে কোনওদিন অই নাই। আইজ আমার জীবন সার্থক, আমি যুদি অহনঐ মইরা যাই, আমার কোনও দুঃখ নাই। তুই বহুত ভাল পোলা, বহুত ভাল পোলা তুই। মাইনষে যে ক্যান আমার এত ভাল পোলাডারে খারাপ কয়? মা’র কথা যেই পোলায় হোনে হের থিকা ভাল পোলা আর কেডা রে!
কথা বলতে বলতে নিজের অজান্তেই কাঁদতে শুরু করেছেন তহুরা বেগম। চোখের পানি গাল ভাসছে তাঁর। তখনও দুইহাতে আতাহারের মাথাটা বুকে জড়িয়ে রেখেছেন। মায়ের এই আবেগের বিন্দুমাত্রও ছিল না আতাহারের মনে। সে ভিতরে ভিতরে হাসছিল।
২.৯ গোলাঘরের চৌকি
হাসু খ্যাখ্যানা গলায় বলল, ও ফুবু, ফুবু। শইল তো আমার ভাল হয় না! জ্বর তো ছাড়ে। না!
দুপুরের পর গোলাঘরের চৌকিতে শুয়ে আছে হাসু। অদূরে ধানের ডোলে ঢেলান দিয়া বসে পান চাবাচ্ছে রহিমা। আবজানো দরজার ফাঁক দিয়া বাইরে থেকে প্রখর রোদ্রের একটুখানি ঝলকানি এসে ঢুকেছে ঘরে। তারপরও ঘরটা আবছায়া হয়ে আছে।
ভাতটাত খেয়ে এসময় একটু গড়িয়ে নেয়ার অভ্যাস রহিমার। হাসুর জ্বরের পর থেকে সেই গড়ানোটা বন্ধ করেছে সে। দিনেরবেলা তো জেগে থাকছেই, রাতেও ঘুমটা ঠিকঠাক মতন হয় না। শুয়ে থাকে ঠিকই তবে জেগেই যেন থাকে। হাসুর নড়াচড়ার শব্দে সামান্য ককাককির শব্দেই ধড়ফড় করে উঠে বসে। কোনও কোনও রাতে শোয়ই না। হাসুর। শিথানে বসে থাকে। মাথায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি দেয়, পানিপট্টি দেয়। দিনেরবেলা সংসারকর্মে ব্যস্ত থেকেও ঘুরে ফিরে এইঘরে আসে, কপালে বুকে হাত দিয়ে ভাইঝির জ্বর দেখে যায়। টুকটাক কথা বলে জানতে চায় কেমন লাগছে হাসুর। মাজার তলা থেকে পেশাবের রাস্তা তরি ব্যথা বেদনা আছে কিনা!
কখনও কখনও কাজের ব্যস্ততায় হয়তো ঘরে ঢোকার সময় পেল না, আবজানো দরজা ঠেলে দরজার সামনে থেকেই হয়তো জিজ্ঞেস করে গেল, কীগো মা, কেমুন লাগতাছে। অহন? জ্বর আছে? মাজার নীচের বেদনাহান?
তিনবেলা খাবার এনে ছোট্ট শিশুকে যেমন করে খাওয়ায় মা ঠিক তেমন করে খাওয়াচ্ছে। বাড়ির কেউ কিছু মনে করল কিনা ভাবছে না।
সেদিন করিম ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল হাসুকে। পৌনে একমাইল মতো রাস্তা, যাওয়া আসায় মাইল দেড়েক, ইস কী কষ্টটাই যে এইটুকু রাস্তা ভাঙতে হয়েছে! দুই-পা হেঁটেই চকের মাটিতে বসে পড়ছিল হাসু, হাঁটতেই পারছিল না। পারবেই বা কেমন করে! এমন জ্বর শরীরে সারাক্ষণ থাকলে মানুষ কি আর মানুষ থাকে!
