তহুরা বেগম মুগ্ধ গলায় বললেন, হ করামু বাজান। এর লেইগাঐ অহন তর লগে কথা কইতে আইছি?
মনে অয় মাইয়া দেকছো আমার লেইগা?
হ বাজান, দেকছি।
কোন গেরামের মাইয়া?
তহুরা বেগম রহস্যের হাসি হাসলেন। মাইয়াগো গেরাম অইলো বেসনাল।
সব জেনে বুঝেও যেন অবাক হল আতাহার। বেসনাল! ভাবিছাবগো গেরামে?
তহুরা বেগম মুখে সেই রহস্যময় হাসি রেখে বললেন, হ।
তাইলে তো তোমার বড়পোলা আর মাজরো পোলার এক গেরামেঐ শ্বশুরবাড়ি হইল।
হ। ক্যা, এক গেরামে দুই ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি অইলে অসুবিদা আছে?
না, কীয়ের অসুবিদা? এক গেরামে ক্যান এক বাইতে অইলেও কোনও অসুবিদা নাই। এমুন কত অয়! দুই ভাইয়ে দুই বইনরেও তো বিয়া করে, ভাইয়ে ভাইয়ে অয় ভায়রা।
আবার এক মাইয়ারেও দুই ভাইয়ে বিয়া করে, এমুনও অয়।
আতাহার বুঝে গেল কথার একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে গেছেন তহুরা বেগম। এখনই আসল কথাটা তিনি বলবেন। তবু না বোঝার ভান করে খুবই অবাক হওয়ার একটা ভঙ্গি মুখে ফুটাল সে। তোমার এই কথাডা বোজলাম না। এক মাইয়ারে দুই ভাইয়ে বিয়া করে কেমতে?
ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে তহুরা বেগম বললেন, বড়ভাইর রাড়ি বউরে বিয়া করে ছোড ভাইয়ে?
হ, কোনও কোনও মাইনষে তো করেঐ।
এইডাঐ কইলাম আমি।
কপট সন্দেহের চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকাল আতাহার। তুমি আসলে কি কইতে চাও মা?
তুই বোজচ নাই বাজান?
না।
বেসনালের মাইয়া, দুই ভাইয়ের এক বউ এই হগল কওনের পরও বোজচ নাই?
আমার বোজন না বোজ কথা না, তোমার তুমি কও।
তহুরা বেগম পরিষ্কার গলায় বললেন, তর লেইগা আমি তর বড়ভাইর বউ পারুরে দেকছি। তর লগে পারুর বিয়া দিতে চাই।
আতাহার জানত যে এই কথাটাই শেষ তরি বলবে মা। শোনার জন্য তৈরিও ছিল। তারপরও ভাবভঙ্গিতে এমন একটা অবস্থা ফুটিয়ে তুলল যেন এমন অবাক জীবনেও সে হয় নাই, এমন অবাক হওয়া কথা জীবনেও শোনে নাই! অপলক চোখে হাঁ করে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কোনওরকমে বলল, এইডা তুমি কী কও, মা?
ক্যা খারাপ কইছিনি?
বলে এতক্ষণে এই প্রথম ছেলের মাথায় হাত দিলেন তিনি। তুই তো বেবাক জানচ বোজচ বাজান! কীর লেইগা পারুর লগে তর বিয়ার চিন্তাডা আমি করছি, হেইডা আমার থি কা তুই কম বোজ না। মা অইয়া এই হগল লইয়া তর লগে বেশি কথা আমি কইতে পারুম না। তয় চাইরমিহি চিন্তা কইরাঐ, তর কথা পারুর কথা ভাইবা, পোলাপান তিনডার কথা ভাইবা আমি চাই বিয়া তুই পারুরেঐ কর। এইডা বেবাকতের লেইগাঐ ভাল অইবো। আর পারু অইলো লাখে একজন। কী সোন্দর মাইয়া! তিন পোলাপানের মা, দেকলে মনেঐ অয় না! মনে অয় অহনও বিয়া অয় নাই, অহনও আবিয়াতো। তর লগে বেদম মানাইবো। পারুরে বিয়া করলে লাবও আছে তর।
কীয়ের লাব?
মোতাহারের সয়সম্পত্তি বেবাক পাবি তুই। তর ভাগেরডা তো আছেঐ, মোতাহারেরও যুদি পাঁচ, তয় তর আর জিন্দেগিতে লাগে কী!
আতাহার গম্ভীর গলায় বলল, এই হগল কথা তুমি বাবারে কইছো?
কইছি।
হেয় কী কয়?
হেয় আমার লগে একমত।
কী?
হ। কইছে তুমি চিন্তা কইরো না। আমি বেবস্তা করতাছি।
একথাও জানে আতাহার। বাবা তাকে বলেছেন। তবু বাবার পরামর্শ মতন অবাক হওয়ার ভানটা সে করেই গেল। কও কী তুমি, বাবায় কইছে বেবস্তা করবো?
হ।
ক্যা হেয়ও আথকা এমুন শুরু করলো ক্যা?
ছেলের কপাল থেকে হাত সরিয়ে তহুরা বেগম বললেন, তরে আর পারুরে লইয়া তর বাপে আর আমি ম্যালা কথাবার্তা কইছি। আমার কথাবার্তা হুইন্না তর বাপের মনে অইছে, কামডা মন্দ অইবো না। এইডা হওন উচিতও।
ক্যা, উচিত ক্যা?
তহুরা বেগম অপলক চোখে ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। একবার তরে আমি কইছি বেক কথা তরে আমি কইতে পারুম না। মা অইয়া পোলারে এই হগল কথা কওন যায় না। আর কমুঐবা ক্যা, তুই নিজে জানচ না পারুর লগে তর বিয়া অওন উচিত ক্যা?
ভিতরে ভিতরে রেগে যাচ্ছিল আতাহার, আবার অতিকষ্টে এই রাগ দমিয়েও রাখছিল। বাবার পরামর্শে চলাটাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ। এইসব নিয়া চিল্লাচিল্লি রাগারাগি করা ঠিক হবে না। আর এই জীবনে প্রথম মান্নান মাওলানা দেখছেন তাঁর নিরীহ স্ত্রীকে কোনও একটি বিষয়ে নিজের মতন করে চলতে, আতাহার দেখছে তার মা’কে কোনও একটি বড় কাজ নিজের দায়িত্বে সম্পন্ন করতে চাইছেন, সুতরাং এই অবস্থায় এই মানুষের বিরুদ্ধে সরাসরি যাওয়া বা কথা বলা ঠিক হবে না। এই ধরনের মানুষকে ঠান্ডা করতে হয় বুদ্ধি দিয়া, কায়দা করে।
আতাহার সেই পথটাই ধরল। খুবই নরম ভঙ্গিতে বিছানায় উঠে বসল, লুঙ্গি গোছগাছ করল। মায়ের মুখের দিকে তাকাল। তোমারে একহান কথা জিগাই মা?
জিগাও বাজান।
এই হগল লইয়া কি ভাবিছাবের লগে তোমার কোনও কথা অইছে?
মিথ্যে বলতে আটকাল না তহুরা বেগমের। পরিষ্কার গলায় বললেন, না বাজান। কোনও কথা অয় নাই।
তয় এইডা খালি তোমার চিন্তা?
হ।
ভাবিছাব জানে?
না। আমি পয়লা তর বাপরে কইছি, তারবাদে আইজ কইলাম তরে। তর বাপে তরে কিছু কয় নাই?
ঠিক মায়ের মতো করেই মিথ্যেটা বলল আতাহার। না তো!
কইবো।
বোজলাম। তয় ভাবিছাবের লগে কথা না কইয়া আমার লগে কথা কইলা ক্যা?
আগে তর লগে কথা কওনঐ ভাল। তর মতামত জাইন্না তারবাদে পারুরে কই।
তোমার মনে অয় হেয় রাজি অইবো?
অইবো না ক্যা?
অইবো না ক্যা হেইডা আমি জানি না। অইব কিনা আমি জানতে চাই।
