মনে মনে আদিলদ্দি শব্দটা উচ্চারণ করেই লজ্জা পেল মজনু। নাম তো আদিলদ্দি না, আদিলউদ্দিন। সে কেন আদিলদ্দি বলল! লোকমুখে এই নাম শুনে আসছে বলে! নাকি মা মারা যাওয়ায় বাপ তার দেখভাল করে নাই, ভরণপোষণ করে নাই, এই রাগে! যদি সে বাপের সংসারে থাকত তাহলে কি কখনও বিকৃত করে বাপের নাম বলত! অন্য কেউ বিকৃত করে বললে কি সেও নূরজাহানের মত রেগে যেত না!
তারপর মজনু ভাবল, বাপ বাপই। ভরণপোষণ করুক না করুক, ছেলেকে চিনুক না চিনুক, জন্ম যে দিয়েছে এটাই কম কী? বাপ না থাকলে কি এ সুন্দর দুনিয়া তার কখনও দেখা হতো! খালার এমন আদর স্নেহ ভালবাসা কোথায় পেত সে? এই যে এইরকম এক বিকালে নূরজাহানের সঙ্গে হাঁটছে, মন ভরে আছে গভীর আনন্দে, এই আনন্দ তাকে কে দিত!
বাপ ব্যাপারটা বোঝার পর থেকেই বাপের ওপর ভারি একটা রাগ মজনুর। তার মা মারা যাওয়ার পর পরই আরেকটা বিয়া করছে। আগের বউর কথা ভুলে সংসার করতে শুরু করছে। নিজের সন্তান চলে গেছে আরেকজনের কোলে, ফিরেও সেদিকে তাকায়নি। এই যে এতগুলি বছর কেটে গেছে একবারও ছেলের খোঁজ নিতে আসে নাই। অন্য ছেলেমেয়ের মুখ দেখে প্রথমটার কথা ভুলে গেছে। যদি এমন সে না করত। যদি বউ মারা যাওয়ার পর ওই অতটুকু মজনুকে রেখে দিত তার সংসারে তাহলে কি জীবন এরকম হতো মজনুর! হতো না। সৎমা কিছুতেই মেনে নিতে না মজনুকে। জীবন ছাড়খাড় করে ফেলত মজনুর। বাপের সংসারে থেকেও মজনু হয়ে যেত অসহায়। শহরে খলিফাগিরি করতে যাওয়া হতো না, নাবালক বয়সেই গিরস্ত বাড়িতে কামলা দিতে হতো।
এই হিসাবে বাপ তো মজনুর সঙ্গে সম্পর্ক না রেখে ভালই করেছে! মজনুর জীবন সুন্দর করে দিয়েছে!
আজ বিকালে এই সব ভেবে বাপের ওপর জমে থাকা রাগ হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেল মজনুর। কোনও কারণ ছাড়াই নূরজাহানকে সে বলল, আমার বাপের নাম জানচ নূরজাহান, আদিলউদ্দিন।
.
১.১৯
ছাপড়া ঘরের সামনে খয়েরি চাদর পরা মানুষটা জবুথুবু হয়ে বসে আছে। আলী আমজাদ তার দিকে তাকাল না। মাওয়ার বাজার থেকে আনা পাউরুটি আর ছোট সাইজের কয়েকটা কবরি কলা এই মাত্র খেয়েছে। এখন ম্যাচের কাঠির মাথা চোখা করে দাঁত খিলাল করতাছে। সড়কের পাশে একটু নামার দিকে জাহিদ খাঁর বাড়ির সঙ্গে একটা ছাপড়া ঘর কয়দিন হল তুলেছে সে। মাথার ওপর ছয়খান জংধরা টিন ফেলে, চারদিকে বুকাবাঁশের বেডা, ছাপড়া ঘরটা সে করেছে নিজের আরামের জন্য। সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পা দুইখান ধরে যায়। কখনও কখনও জাহিদ খাঁর বাড়ি থেকে গোবদা মতো হাতলআলা চেয়ার এনে বসে। সড়কের পাশের হিজল গাছটার তলায় সারাক্ষণই ঝিরিঝিরি হাওয়া। চেয়ার নিয়ে বসলেই ঘুমে চোখ ভেঙে আসে। শরীরের অজান্তেই ছেড়ে দেয় শরীর। এই সব কারণেই ছাপড়া ঘরখান করেছে আলী আমজাদ। নিজের একটু আরাম হল, দরকারী জিনিসপত্র কিছু রাখাও গেল ঘরটায়, এক কাজে দুই কাজ।
ঘর করার জন্য পুরানা ঢেউ টিনগুলি যেমন বাড়ি থেকে এনেছে আলী আমজাদ তেমন এনেছে পুরানা একখান চকি। গোয়ালিমান্দ্রার হাট থেকে নতুন একখান পাটি কিনে এনে বিছিয়েছে চকির উপর। আর আছে দুইখান ল্যাড়ল্যাড়া বালিশ। অল্প কিছু পয়সা এই কাজে খরচা হয়েছে আলী আমজাদের তবে সেই খরচা গায়ে লাগছে না। ঘর তোলার পর থেকে নিজের লক্কর ঝক্কর মোটর সাইকেল এই ঘরের সামনে দাঁড় করিয়ে মাটিয়ালদের কাজের তদারক করে। তবে সেটা পাঁচ দশমিনিট। তারপরই ছটফট করে ছাপড়া ঘরে গিয়ে ঢুকে। ঘর তোলার পর থেকে রোদ জিনিসটা যেন আর সহ্যই করতে পারে না আলী আমজাদ। পাঁচ দশ মিনিট দাঁড়ালে এ রকম শীতের মুখে মুখেও ঘামে ভিজে জ্যাবজ্যাবা হয়ে যায়। ডাঙায় তোলা বড় সাইজের কাতলা মাছের মতো হাঁ করে খাস টানতে থাকে, মোটকা শরীর নিয়ে হাসফাস করতে থাকে। সড়ক যত আগাচ্ছে ততই মোটা হচ্ছে সে, শরীরে, টাকায়। শরীর এবং টাকা যে কারও কারও একটা আরেকটার লগে পাল্লা দিয়া বাড়ে আলী আমজাদকে দেখলে তা বোঝা যায়। ফলে আগের আলী আমজাদ আর নাই। আগে যেমন সারাদিন খাড়া রোদে দাঁড়িয়ে মাটিয়ালদের কাজ দেখত, ভাল একখান ছাতি (ছাতা) পর্যন্ত ছিল না, যেটা ছিল সেটা ছেঁড়া, তালিমারা, খুলতে গেলে বেজায় হাঙ্গামা, বন্ধ করতে গেলে ছাতির কালা কাপড় ফুটা করে শিক (শলাকা) বেরিয়ে যেত এদিক ওদিক। বিরক্ত হয়ে ছাতিটা আলী আমজাদ ব্যবহারই করত না, রোদেই দাঁড়িয়ে থাকত। কোনও মাটিয়ালের গোড়ায় মাটি কম দেখলে কাজে ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে ভেবে মুখে বকাবাজির তুবড়ি ছোটাত, সেই মাটিয়ালের সাতপুরুষ কবর থেকে টেনে তুলত। সাতপুরুষের পুরুষগুলি দৈহিক কারণে রেহাই পেত কিন্তু মহিলাদের গতি ছিল না। যত রকমভাবে উৎপীড়ন তাদের করা যায় মুখে মুখে তা করে ফেলত আলী আমজাদ। কোনও মাটিয়ালের গোড়া উপচে হয়তো এক চাকা (ঢেলা) মাটি পড়ে গেল নিচে, ছুটে গিয়ে আলী আমজাদ তা তুলে দিত। কেটে তোলা মাটি সব সময়ই একটু ভিজা ভিজা হয়। চাপড়ে চাপড়ে পরে যাওয়া চাকাটা গোড়ার অন্য মাটির সঙ্গে বসিয়ে মোড়া তুলে পর্যন্ত দিত। সেই আলী আমজাদ এখন মাটিয়ালদের কাজের তদারক করার জন্য একজন সরদার রেখেছে। লোকটার নাম হেকমত। পাটাভোগের লোক। কাজে লাগবার লগে লগেই শ্রীনগর বাজার থেকে নতুন একখান শরীফ ছাতি কিনেছে হেকমত। আলী আমজাদের মোটর সাইকেলের শব্দ পেলেই মাটিয়ালদের ফেলে সেই শব্দের দিকে মন দেয়। মাথায় দেওয়া ছাতি বন্ধ করে ফেলে। আলী আমজাদ সাইটে আসার লগে লগে বন্ধ ছাতি হাতে ছুটে যায় তার কাছে। অতি যত্নে ছাতিখান আলী আমজাদের মাথার উপর মেলে ধরে। আলী আমজাদ যেদিকে যায় হেকমতও যায় লগে লগে। এই সব কারণে হেকমতকে পছন্দ করেছে আলী আমজাদ। টাকা পয়সা হয়ে গেলে, বড় মানুষদের দুই চারটা ট্যাণ্ডল (চামচা অর্থে) লাগে। উত্তর দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল মিলিয়ে চারটা ট্যাণ্ডল এখানে কাজ পাওয়ার লগে লগে বানিয়ে ফেলেছে আলী আমজাদ। তারা নাম করা লোকের পোলাপান। একজন আছে আতাহার, মান্নান মাওলানার মেজোছেলে। আর তিনজনের একজন মেন্দাবাড়ির আলমগির, হালদার বাড়ির সুরুজ, গোঁসাই বাড়ির নিখিল। এরা আছে বলে এলাকায় কাজ করতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে না আলী আমজাদের। ওয়াজের চান্দা, ধরাছি (হাডুডু) খেলার চান্দা চাইতে কেউ আসে না আলী আমজাদের কাছে। যারা আসবে তারা জানে তাদের খাদ্য চার ট্যাণ্ডলে অনেকদিন ধরেই খাচ্ছে। নতুন করে তারা আর কী খাবে!
