পারলে আইজঐ নে।
টেকা?
কইলাম যে আমি দিমুনে।
কয় টেকা লাগতে পারে?
কইতে পারি না। আমি পনচাশটা টেকা দিমুনে। করিম ডাক্তার মানুষ ভাল। তারে বুজাইয়া কবি যে তরা গরিব মানুষ। তাইলে হেয় রুগি দেহনের টেকাড়া নিবো না। খালি অষইদের দামহান নিবো। আমার মনে অয় পনচাশ টেকায় অইয়া যাইবো।
তয় যামু কুনসুম?
অহন তো মনে অয় জ্বর নাই। অহনঐ যা। অহন ডাক্তার সাবরে পাবি।
আনন্দে আত্মহারা গলায় রহিমা বলল, আইচ্ছা।
দরজার দিকে পা বাড়িয়ে তহুরা বেগম বললেন, আমি বাংলাঘরে যাইতাছি। আতাহারের লগে কথার কাম আছে। কথা সাইরা ঘরে যামু। আমি ঘরে যাওনের পর আইয়া টেকা লইয়া যাইচ।
আইচ্ছা।
তহুরা বেগম বেরিয়ে গেলেন।
রহিমার হাতে তখনও ধরা চায়ের মগ আর রুটি। তহুরা বেগম বেরিয়ে যাওয়ার লগে লগে হাসুকে তাড়া দিল সে। ওই ছেমড়ি, তাড়াতাড়ি খাইয়া ল। হুনলি না বুজি কইয়া গেলো তরে ডাক্তরের কাছে লইয়া যাইতে।
চায়ে ভিজানো রুটি এক কামড় খেয়ে মুখ সরিয়ে নিল হাসু। আর খামু না। খাইতে ইচ্ছা করে না।
জোর কইরা অইলেও খা। তারবাদে ল কাজির পাগলা যাই করিম ডাক্তরের কাছে।
হাসু শিশুর মতন ঘ্যানঘ্যানা গলায় বলল, আইজ যাইতে পারুম না ফুবু। এই যে ইট্ট বইয়া রইছি, এতেঐ আমার মাজা ভাইঙ্গা আইতাছে। কাজির পাগলা তরি হাইট্টা আমি যাইতে পারুম না। রাস্তায় দেখবা উপ্তা অইয়া পইড়া মইরা গেছি।
হাতের রুটি আর চায়ের মগ সরিয়ে হাসুকে একটা ধমক দিল রহিমা। আকথা কইচ না। জোর কইরা উইট্টা খাড়া। কষ্ট কইরা ডাক্তরের কাছে ল, হেয় দেইক্কা অষইদ দিলে দেকবি দুই-তিনদিনের মইদ্যে পুরা ভাল অইয়া গেছচ। দশদিন জ্বরে না ভুইগ্যা একদিন ইট্টু কষ্ট কর, দেকবি বেক ঠিক অইয়া গেছে।
কাত হয়ে কোনওরকমে চৌকির উপর শুয়ে পড়ল হাসু। ক্লান্ত বিষণ্ণ গলায় বলল, তয় ইট্টু জিরাই লই। এই ফাঁকে আম্মার কাছ থিকা টেকা আইন্না রাইখো।
আইচ্ছা।
রহিমা বেরিয়ে যাওয়ার পর মৃতের ভঙ্গিতে চোখ বুজল হাসু।
.
খানিক আগে ঘুম ভেঙেছে আতাহারের। তয় বিছানা ছাড়ে নাই সে। চিত হয়ে শুয়ে মুখ বরাবর দক্ষিণের জানলা দিয়া বাইরে তাকিয়ে আছে। বাইরে সকালবেলাই কঠিন হয়েছে রোদ। চিড়বিড় একখান গরমিভাব এর মধ্যেই খোলামেলা জায়গা থেকে এসে ঢুকতে শুরু করেছে মানুষের বসত ভিটায়, ঘর দুয়ারে।
শুয়ে শুয়ে গরম ভাবটা টের পাচ্ছিল আতাহার।
ফজরের আজানের পর এই ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দরজা আবজায় রেখে গেছে হাফিজদ্দি। এখনও ঠিক সেই অবস্থায়ই আছে। আতাহার ভাবছিল উঠে দরজা খুলে দিবে। তা হলে বাইরে থেকে রোদের ভিতর দিয়েই বয়ে আসবে হাওয়া। কিছু না কিছু শীতলতা সেই হাওয়ায় থাকবেই।
আতাহার উঠি উঠি করার আগেই ঘরে এসে ঢুকলেন তহুরা বেগম। আবজানো দরজা। যেইমাত্র ঠেলেছেন, ঠিক তখনই আতাহার তাকিয়েছে দরজার দিকে। মা’কে দেখে প্রথমে খুবই অবাক হয়েছে, তারপর বুঝে গেছে কেন তিনি আজ এই ঘরে আসছেন! কী কথা। আতাহারের লগে তিনি বলবেন!
আতাহারের তারপর বাবার কথা মনে পড়ল। বাবা তাকে আগেভাগেই সব জানিয়ে দিয়েছেন। সুতরাং আতাহার ঠিক করে ফেলল মা’র লগে ব্যবহারটা সে কেমন করবে! মা’র কথা কীভাবে শুনবে!
প্রথম কথাটা আতাহার তহুরা বেগমকে বলল খুবই বিনীত গলায়, আদুরে শিশুর ভঙ্গিতে। দুয়ারডা পুরা খুইল্লা দেও মা। গরম লাগতাছে। দুয়ার খুইল্লা দিলে হাওয়া বাতাস আইবো।
ছেলের এই ধরনের গলা অনেকদিন শোনেননি তহুরা বেগম, শুনেছেন শুধুই রুক্ষ বাজে গলা। শুরুতেই মনটা তাঁর ভাল হয়ে গেল। হাসিমুখে বললেন, হ বাজান, ঠিকঐ কইছচ।
দরজাটা খুলে ছেলের পাশে এসে বসলেন। অহনতরি উডো নাই বাজান?
না মা!
উডো।
হ উড়ুম। তয় তুমি আথকা এই ঘরে আইছ ক্যা? কিছু কইবা?
হ।
কী?
খাড়ো বাজান, কইতাছি। ইট্ট জিরাই লই।
এড় হাইট্টা আইলা তাতেঐ জিরান লাগবো?
হ বাজান। ইট্টুহানি হাঁটলেঐ বুকটা কাঁপে!
বুকে হাত দিলেন তহুরা বেগম।
আতাহার বলল, তাইলে তো তোমার শইল ভাল না মা!
হ বাজান, ভাল না। খালি মরণের কথা মনে অয়।
যেন মায়ের মৃত্যুর কথা শুনে খুবই কাতর হল আতাহার, এমন গলায় বলল, ধুৎ এই হগল কথা কইয়ো না তো! কী এমুন বস অইছে তোমার যে অহনঐ মইরা যাইবা?
তহুরা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মরণের লেইগ বস লাগে না বাজান। তর ভাইরে দেকলি না কোন বসসে মইরা গেল!
আতাহার কথা বলল না।
তহুরা বেগম ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। মরণের কথা মনে অয় দেইক্কাঐ আরও অনেক কথা মনে হয়।
কী কথা মা?
অনেক দায়িত্বর কথা।
কী দায়িত্ব?
মা-বাপে সব সময় চায় মরণের আগে বেক পোলাপানরে বিয়াশাদি করাইয়া সংসারী দেইখা যাইতে। আমার অহনও ওই দায়িত্ব শেষ অয় নাই বাজান।
আতাহার হাসল। বেশির ভাগঐ শেষ অইছে। বাকি আছে খালি দুইজন।
হ বাজান। হেই দুইজনের মইদ্যেও একজনরে লইয়া আমার কোনও চিন্তা নাই।
সবজেনে বুঝেও আতাহার বলল, কারে লইয়া?
আজাহার। অরে লইয়া চিন্তা নাই। দেশে আইলেঐ বিয়া করান যাইবো।
হাসিহাসি মুখ করে মায়ের মুখের দিকে তাকাল আতাহার। তোমার কথা আমি বুজছি মা। অহন তোমার খালি চিন্তা আমারে লইয়া।
হ বাজান। তুই বিয়া করলেঐ ঝামেলা শেষ হয়। আমি শান্তি লাহান মরতে পারি।
আতাহার ঠাট্টার গলায় বলল, তয় বিয়া আমারে করাও না ক্যা?
