আর যেদিন সন্ধ্যারাত থেকেই বাংলাঘরে থাকে আতাহার, ইয়ার দোস্তদের নিয়া মজমা বসায় সেদিন এই ঘরে শোয়াই হয় না হাফিজদ্দির। সেদিন অবশ্য বুকটা হালকা থাকে তার। নিজের ইচ্ছা স্বাধীন মতন রান্নাঘরের চুলার একপাশে নিজের বিছানা পেতে শুয়ে পড়ে। রাতে যতবার ইচ্ছা ওঠে, যতবার ইচ্ছা পায়খানার ওদিকটায় গিয়া জুতমতো বসে আরামসে পেশাব করে আসে।
এই স্বাধীনতাটুকু ভোগ করার জন্য মান্নান মাওলানা আর তহুরা বেগম দুইজনকেই হাফিজদ্দি অবশ্য অনুরোধ করেছিল, বাংলাঘরে না তাকে যেন রান্নাঘরেই থাকতে দেওয়া হয়। দু’জনের কেউ রাজি হয়নি। কারণ রাতবিরাতে বাড়ি ফিরার পর আতাহারের ঘরের দরজা খুলে দিবে কে!
এখন এই সকালবেলা, অনেকটা বেলা হয়ে যাওয়ার পরও আতাহারের ঘরের দরজা আবজানো। এখনও নিশ্চয় ভোস ভোস করে ঘুমাচ্ছে। তহুরা বেগম একবার সেই দরজার দিকে তাকালেন। এখন দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতে হবে তহুরা বেগমকে। ঘুমন্ত ছেলেকে ডেকে তুলে কথা বলতে হবে। ঘুম থেকে ডেকে তুলতে গেলে ছেলে হয়তো রেগে যাবে, তবু উপায় নাই। ডেকে তাকে এখন তুলতেই হবে, কথা তার লগে তহুরা বেগমকে বলতেই হবে। মান্নান মাওলানা বাজার সেরে আসার আগেই ছেলের লগে কথা শেষ করবেন তিনি।
বাংলাঘরের দিকে পা বাড়িয়ে আনমনা চোখে উত্তরের ভিটির গোলাঘরের দিকে তাকিয়েছেন তহুরা বেগম, তাকিয়ে দেখতে পেলেন ঘরের দরজা খোলা আর চৌকির ওপর। অসহায় শিশুর ভঙ্গিতে বসে আছে হাসু। টিনের মগ হাতে তার সামনে বসে আছে রহিমা। একহাতে বড় একখান আটার রুটি পাচিয়ে গোল করা। সেই রুটি মগে চুবিয়ে চুবিয়ে হাসুকে খাওয়াচ্ছে।
দেখে হাসুর জন্য মায়া লাগল তহুরা বেগমের। কয়দিন ধরে এই বাড়িরই লোক হাসু। মান্নান মাওলানা তাকে কাজে রেখেছেন। বাড়ির একজন তোক অসুস্থ, জ্বরে পড়ে আছে। চার-পাঁচদিন ধরে, বাড়ির মালকিন হিসাবে তহুরা বেগমের দায়িত্ব অসুস্থ মানুষটার খোঁজ খবর নেওয়া, দুই-একটা ভালমন্দ কথা বলা। এই কাজটা সেরেই না হয় আতাহারের ঘরে যাবেন তিনি।
তহুরা বেগম গোলাঘরে এসে ঢুকলেন। তাঁকে দেখে হাসু-রহিমা দুইজনেই আড়ষ্ট হল। রহিমার চেহারায় অপরাধীভাব ফুটে উঠল। যেন কাজে ফাঁকি দিয়া ভাইঝিকে এভাবে খাওয়ানোটা তার ঠিক হচ্ছে না, বাড়ির মালকিনকে না বলে ভাইঝির জন্য এভাবে খাবার এনে সে অন্যায় করেছে।
তহুরা বেগম ওই নিয়া ভাবছেন না। হাসুর দিকে তাকিয়ে বললেন, জ্বর কেমুন?
হাসু কাতর গলায় বলল, ভাল না আম্মা।
রহিমা বলল, জ্বরডা এক্কেরে যায় না। থাকেঐ।
অহনও আছে?
হ। এক দুইঘণ্টা ইডু ইট্টু জ্বর থাকে, তারবাদে ফালা ফালদা জ্বরডা বাড়ে, এমুন বাড়ন বাড়ে হাসু এক্কেরে বেউস হইয়া যায়। তয় অর একহান সুবিদা অইলো জ্বরের ঘোরে মাথায়। বিগাড় উটলেও আবল তাবল প্যাচাইল ও পাড়ে না। ঝিম মাইরা পইড়া থাকে।
মাথায় পানি দেচ না?
দেই।
হ পানিডা বেশি কইরা দিবি। যেসুম জ্বর বেশি উটবো হেসুম মাথায় খালি পানি দিবি। ঠান্ডা পানিতে ত্যানা ভিজাইয়া পানিপট্টি দিবি কপালে।
তহুরা বেগমকে এরকম আন্তরিক ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখে হাসু-রহিমা দুইজনেই খুশি। রহিমা কৃতজ্ঞ মুখে বলল, হ দেই! বেশি জ্বরে মাথায় পানি না দিলে, পানিপট্টি না দিলে মাথার রগ ছিড়া মরবো!
তহুরা বেগম আনমনা গলায় বললেন, হ।
হাসুকে কী খাওয়াচ্ছে রহিমা খেয়াল করলেন। খেয়াল করেও জানতে চাইলেন, কী খাওয়াইতাছস অরে?
রহিমা হাসিহাসিমুখে বলল, দুধ মিডাই দিয়া এক গেলাস চা বানাইয়া আনছিলাম আর একহান রুটি। চায়ে রুটি ভিজাইয়া ভিজাইয়া খাওয়াইতাছি। মাইয়াডা ত্যাড়া আছে, খাইতে চায় না।
তহুরা বেগম মায়াবী গলায় বললেন, কেমতে খাইতে চাইবো? এমুন জ্বরে মাইনষের মুখে সাদ থাকেনি যে খাইবো?
হাসু বলল, হ। মুখে একদোম সাদ নাই আম্মা। মুখের ভিতরডা তিতা অইয়া রইছে।
আইজ কয়দিন অইলো জ্বর?
পাঁচদিন।
এক্কেরে ছাইড়া যায় না জ্বর, না?
হ।
তয় তো চিন্তার কথা!
রহিমা বলল, হ। টাইফোট টুইফোট অইলোনি, না কালাজ্বর কিছুঐ বোজতাছি না। ডাক্তার দেহাইতে পারলে ভাল অইতো। জ্বর ছাড়াও আরেকহান সমস্যা আছে।
কী সমস্যা?
মাজার নীচ থিকা পেশাবের রাস্তা তরি সময় সময় খুব বেদনা করে, সময় সময় এক্কেরে অবশ অবশ লাগে।
তহুরা বেগম চমকালেন। কচ কী?
হ।
এইডা তো চিন্তার কথা!
হ। কী করুম কিছু বোজতাছি না।
তহুরা বেগম তীক্ষ্ণচোখে হাসুর মুখের দিকে খানিক তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ডাক্তার দেহান উচিত। সিয়ানা মাইয়া, কোন বিপদ আপদ অয়, এক কাম কর, কষ্টমষ্ট কইরা কাজির পাগলা লইয়া যা। করিম ডাক্তাররে দেহা।
রহিমা বলল, হেরে দেহাইতে টেকা লাগবো না?
লাগুক।
টেকা পামু কই?
টেকা লইয়া চিন্তা করি না। দিমুনে আমি।
নাকি সরকারি ডাক্তারখানায় লইয়া যামু?
না, ওই হগল ডাক্তাররা ভাল মতন রুগি দেহে না। করিম ডাক্তারের কাছে নে। যহন জ্বর কম থাকবো তহন ধইরা ধইরা কাজির পাগলা লইয়া যাবি। আস্তে আস্তে হাঁইট্টা গেলে অসুবিদা অইবো না। ডাক্তার যদি দেইক্কা অমুইদ দিয়া দেয় তাইলে দুই-চাইর দিনের মইদ্যে দেকবি ভাল অইয়া গেছে।
গভীর আগ্রহ নিয়া তহুরা বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল রহিমা। তয় কবে নিতে কন বুজি?
