হাসু তখন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে রহিমার দিকে। তাকে ওইভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রহিমা বলল, কী রে মা, চাইয়া রইছচ ক্যা?
হাসু গভীর আবেগের গলায় বলল, তোমার মুখহান দেকতাছি।
ক্যা, আমার মুখ দেহনের কী অইলো?
ইচ্ছা করলো তোমার মুখের মিহি চাইয়া থাকতে।
তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
রহিমা বলল, নিয়াস ছাড়ছ ক্যা?
একহান কথা মনে কইরা নিয়াস ছাড়লাম।
কী কথা?
রহিমার কথার জবাব না দিয়া হাসু একটু নড়েচড়ে উঠল। আগে আমারে ভাবদি মতন হোয়াও, তারবাদে কই।
হাসুর কথা শুনে রহিমা একটু চমকাল। সত্যঐত্তো! তরে তো ভাবদি মতন হোয়ানের কাম! হায় হায় আমি তো ভুইল্যাঐ গেছি। মাথায় পানি দেওনের লেইগা তর যে সিথান বদলাইছি, হেই কথা আমার মনেঐ আছিলো না।
হাসুর গলার তলায় দুইহাত ঢুকিয়ে তাকে টেনে হিঁচড়ে আগের ভঙ্গিতে শোয়াল রহিমা।
হাসু বলল, লইড়া চইড়া হোওনের জোরডাও আমার শইল্লে নাই ফুবু।
কেমতে থাকবো! আইজ তিনদিন ধইরা জ্বর। আর যেমুন তেমুন জ্বরনি? এমুন জ্বরে শইল্লে জোর বল থাকেনি মাইনষের! তুই তো কিছু মুখেও দিতে চাস না। ভাত রুটি যাঐ দেই কিছুঐ খাচ না। না খাইলে জোর থাকেনি শইল্লে!
খাইতে ভাল্লাগে না। খালি উটকি আহে।
তাও জোর কইরা খাইতে অয়।
একটু থামল রহিমা। অহন ক কী মনে কইরা নিয়াস ছাড়লি? কী মনে কইরা আমার মুখের মিহি চাইয়া আছিলি?
নিয়াস ছাড়লাম এইডা চিন্তা কইরা, তুমি না থাকলে মাথায় পানি দিয়া আইজ রাইত্রে আমারে বাঁচাইতো কে? যুদি মউচ্ছামান্দ্রার বাইত্তে এমুন জ্বর আইতো আমার, আমারে দেকতো কেডা? রান্নঘরে হুইয়া জ্বরের ঘোরে মইরা থাকতাম। বাড়ির কেঐ উদিসও পাইতো না। আর নাইলে…..
কথা শেষ না করে থামল হাসু। হাঁপাতে লাগল।
রহিমা বলল, কী অইলো?
ইট্টু কথা কইয়াঐ পরিশ্রম লাগতাছে। মনে হয় অনেক বড় কাম করলাম।
তয় চুপ কইরা থাক।
না ইট্টু কথা কই তোমার লগে।
রহিমা মায়াবী মুখে হাসল। কথা কইতে ইচ্ছা করতাছে?
হ।
তয় ক।
কইতে চাইলাম জ্বরের ঘোরে ওই বাড়ির রানঘরে হুইয়া হয় আমি মইরা যাইতাম নাইলে কোনও না কোনও বেড়ায় আইয়া ওই অবস্থায় আমারে জাইত্তা ধরতো, জ্বরের ঘোরে শইল্লে জোরবল থাকতো না, এতদিন ধইরা যেই জিনিস রক্ষা করছি হেই জিনিস রক্ষা করতে পারতাম না। আকাম কুকাম কইরাঐ বেড়ায় আমারে মাইরা হালাইতো!
রহিমা গম্ভীর গলায় বলল, আকথা কইচ না।
না গো ফুবু, আকথা না। এইডাঐ হাছাকথা। আবার একটু থামল হাসু, আবার একটু দম নিল। আর তোমার মিহি চাইয়া চাইয়া আমার খালি মার কথা মনে অয়। কত আগে মইরা গেছে মা’য়। মা’র চেহারাডাও মনে নাই। জ্বরের পর থিকা ফাঁক পাইলেঐ তোমার মুখহান আমি চাইয়া চাইয়া দেহি আর আমার খালি মনে হয় এইডা তোমার মুখ না, এইডা আমার মা’র মুখ। মা’য় মরে নাই, এইত্তো আমার মা’য় বাইচ্চা রইছে। এইত্তো তার জুরে পোড়া মাইয়ার শিথানে বইয়া। মাইয়ার মাথায় পানি দিতাছে।
হাসুর কথা শুনতে শুনতে বুকটা তোলপাড় করছিল রহিমার। চোখ পানিতে ভরে আসছিল। নিজের জীবনের কথা মনে পড়ছিল। কী আশ্চর্য জীবন তার। মেয়েমানুষ হয়ে জন্মানোর পরও, সব দিয়াও আল্লাহ তাকে মা হতে দেন নাই। নারী জন্মের সবচেয়ে বড় পাওয়া সে পায় নাই। সন্তান। এই জীবনে কেউ তাকে মা বলে ডাকল না। একটা জীবনে। সামান্য দেড়দুইটো বছর স্বামীর সংসার, সোহাগ। তারপর থেকে এই বাড়ির ঝিয়ের। জীবন। যতদিন শরীর ছিল ততদিন রাতবিরাতে মান্নান মাওলানাকে গোপনে শরীর দেয়া। তিন-চারবার পেট হতে হতেও রক্ষা পাওয়া। জারজ সন্তানের মা হতে হতেও বেঁচে যাওয়া। তারপর শরীরে ভাটার টান লাগার পর থেকে সেই জীবনও শেষ হয়েছে। এখন শুধুই খেয়ে পরে বেঁচে থাকা। মরণের অপেক্ষা করা। কবে আসবে মরণ, কবে শেষ হবে এই জীবন।
.
বেলা অনেকটা হয়ে যাওয়ার পর বড়ঘর থেকে বেরুলেন তহুরা বেগম।
খানিক আগে ডুলা হাতে বাজারে গেছেন মান্নান মাওলানা। এসময় বাংলাঘরে আতাহারকেও পাওয়া যাবে। এখনও নিশ্চয় ঘুমাচ্ছে সে। রাতদুপুরের আগে বাড়ি ফিরার অভ্যাস নাই ছেলের, ঘুমোবার অভ্যেস নাই। ফলে সকালবেলা বিছানাও ছাড়তে পারে না। অনেক বেলা তরি ঘুমায়। বাংলাঘরের উত্তর দিককার বেড়ার লগে লেগে গুটিসুটি হয়ে আগে ঘুমাত মাকুন্দা কাশেম, এখন ঘুমায় হাফিজদ্দি। ফজরের আজানের লগে লগেই বিছানা ছাড়ে সে। নিজের বালিশ কাঁথা নিঃশব্দে ভাঁজ করে আতাহার যে চৌকিতে ঘুমায় সেই চৌকির তলায় রেখে খুবই সাবধানে দরজার খিল ডাসা খোলে। সন্ধ্যারাতেও রাতের খাবারটাবার সেরে ঠিক একই কায়দায় বাংলাঘরে ঢোকে, চৌকির তলা থেকে বিছানা বের করে নিঃশব্দে সেই বিছানা জায়গা মতন পেতে ঘুমোয়। যদিও তখন আতাহার ঘরে থাকে না, তবু যেন আতাহারের ভয়টা থাকে।
যদি কখনও রাতবিরাতে পেশাব পায়খানার কাজে বাইরে যেতে হয়, তখন হাফিজদ্দির চালচলন হয় বিলাইয়ের মতন। যদি কখনও হাফিজদ্দির করা শব্দে ঘুম ভেঙে যায় আতাহারের। তা হলে আর রক্ষা নাই, উঠেই কোকসা বরাবর পা চালাবে। লাথথিগুতা কিলঘুসি যা যা সম্ভব সবই মারবে। আর গালাগালের তো অন্তই থাকবে না! মাকুন্দা কাশেম জেলে যাওয়ার কয়েকদিন আগ থেকে এই বাড়িতে এসে এরমধ্যেই তিন-চারবার আতাহারের হাতের মারটা হাফিজদ্দি খেয়ে ফেলেছে। এজন্য আতাহার বাড়ি আসছে শুনলে, আতাহারের ছায়া দেখলেই বুক ধরাস ধরাস করে হাফিজদ্দির। গভীর রাতে পেশাব পায়খানা পেলেও আতাহারের ভয়ে চেপে থাকে।
