রহিমার ঘুম অদ্ভুত ধরনের। শোয়ার লগে লগে ঘুমায়া পড়ে সে। ঙো আঁ করে নাকও ডাকে। তবে দুই-একটা ধাক্কা দিয়া ডাকলে ঘুমটা ভাঙে।
এখনও তাই হল। হাসুর ধাক্কা খেয়ে প্রথমে নাক ডাকা বন্ধ হল রহিমার, সাড়া দিল। কী রে মা? কী অইছে?
হাসু মুমূর্ষ গলায় বলল, জ্বরে আমি যাইতাছি। আমার মাথাডা মনে অয় ফাইট্টা যাইবো।
রহিমা ধড়ফড় করে উঠে বসল। কচ কী?
হ। আর একহান অসুবিদা অইতাছে।
কী?
মাজার নীচ থিকা পেশাবের রাস্তা তরি কেমুন জানি অবশ অবশ লাগতাছে।
দিশাহারা হল রহিমা। কী করবে না করবে বুঝতে পারল না। ছটফট হাতে বালিশের। তলা থেকে ম্যাচ বের করল, কুপি জ্বালল। কুপির আলোয় হাসুর মুখের দিকে তাকাল। জ্বরক্লান্ত ম্লান ফ্যাকাশে মুখ হাসুর। চোখে আতঙ্কের দৃষ্টি। সেই দৃষ্টি দেখে রহিমা বুঝল হাসু খুবই ভয় পাচ্ছে। সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য হাসুর মাথায় হাত দিল রহিমা। দিয়ে এমন করে চমকাল যেন মউলকা ভাজার তপ্ত খোলায় আচমকা হাত লেগে গেছে। নিজের অজান্তেই বলল, মাগো! এমুন জ্বর আইছে! এমুন জ্বর জিন্দেগিতে কেঐর দেহি নাই। এমন জ্বরে মাথায় বিগার (বিকার) উইট্টা যাওনের কথা! মাথার দুইমিহির রগ ছিড়া যাওনের কথা। এর লেইগাঐ মাথা ফাইট্টা যাইতে চাইতাছে তর।
হাসু মুমূর্ষ গলায় বলল, আর মাজার নীচের অবশ অবশ ভাবহান?
ওইডাও জ্বরের লেইগাঐ।
ডানহাত কোনওরকমে বাড়িয়ে রহিমার একটা হাত ধরল হাসু। ফুবু, আমি কি মইরা যামু?
একথায় বুকটা মোচড় দিয়া উঠল রহিমার, চোখ ফেটে কান্না এল। কান্না সামলে কোনওরকমে বলল, ধুৎ ছেমড়ি! মরবি ক্যা? বেশি জ্বর আইছে দেইক্কা এমুন লাগতাছে। খাড়ো, আমি তর মাথায় পানি দেই। মাথায় পানি দিলে জ্বর নাইম্যা যাইবো। আরাম লাগবো।
হাসু কথা বলল না।
একবার হাসুর দিকে তাকিয়ে কুপি হাতে গোলাঘরের দরজা খুলল রহিমা, উঠানে নেমে গেল।
কুপির আলোয় ঘরের ভিতরটা এতক্ষণ আলোকিত ছিল, সেই আলোয় কীরকম যেন একটু সাহসী হয়েছিল হাসু। এখন আলো নাই, গভীর অন্ধকারে ভয়ংকর এক জ্বরে পুড়ে যেতে যেতে তার মনে হল সে আসলে বেঁচে নাই। যেন অনেকক্ষণ আগেই মরে গেছে। গোরস্থানের মাটিতে কবর খুঁড়ে যেন নামিয়ে দেয়া হয়েছে তাকে। তারপর মাটি চাপা দিয়ে গিরস্তরা যে যার কামে চলে গেছে। এখন অন্ধকার কবরের ভিতর একা পড়ে আছে সে। এই কবরের ভিতর এখন দিনে দিনে পচতে শুরু করবে তার সাধের শরীর। বড় হয়ে। ওঠার পর যে শরীর নিয়া নানারকমভাবে এতকাল ধরে খাবলা খাবলি করার চেষ্টা করছে। মউছামান্দ্রার এক বাড়ির নানা বয়েসি পুরুষ, মান্নান মাওলানার বাড়ির মাওলানা সাহেব নিজে আর তার জুয়ান ছেলে আতাহার। নিজেকে ওইসব খাবলা খাবলি থেকে রক্ষা করবার জন্য দিনরাত্রির প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত তাকে এক ধরনের যুদ্ধ করতে হয়েছে। সেই যুদ্ধ করতে করতে নরম কোমল নারীদেহ শক্ত হয়ে গেছে, যুদ্ধক্ষেত্রের ক্লান্ত যোদ্ধার মতন রুক্ষ, পাথর। হয়ে গেছে তার মোলায়েম নারীদেহ। হায় রে মেয়েমানুষের জীবন!
এইসব ভাবতে ভাবতে হাসু একসময় টের পাচ্ছিল কোথায় যেন জ্বলে উঠেছে এক টুকরা মোলায়েম আলো, সেই আলোর মায়াবী একখান পরশ এসে যেন লাগছে তার বন্ধ চোখের পাতায়। আর ভয়ংকর জ্বরে ফেটে পড়তে চাওয়া তার মাথায় যেন সাত আশমানের উপর থেকে এসে পড়ছে শীতকালের কচুরিপানার তলায় লুকিয়ে থাকা শীতল জলের মতো। মৃদু একখান জলধারা। এ যেন আল্লাহর আরশ থেকে আসা এক রহমতের ধারা, যে ধারায় মানুষের শরীর থেকে উধাও হয় জরাব্যাধি।
হাসু চোখ বুজল।
কতক্ষণ ধরে হাসুর মাথায় পানি দিয়েছে রহিমা সেকথা পলকে মনে নাই। সেই যে কুপি হাতে বের হয়েছিল, বের হতে ছুটে গিয়েছিল রান্নাঘরে। রান্নাঘরের সামনে লোহার পুরানা মাঝারি সাইজের একটা বালতি আছে। রান্নাবান্নার কাজে এই বালতি ভরে পানি আনে রহিমা বহুবছর ধরে, এই বাড়িতে আসার পর থেকে। ছুটে গিয়ে সেই বালতিটা নিয়েছে সে। তার ব্যবহারের প্লাস্টিকের খয়েরি রঙের বদনা আছে। বদনাটা পড়ে থাকে পায়খানায় যাওয়ার পথের ধারে। সেই বদনা নিয়েছে। সোজা গেছে পুকুরঘাটে। এক বালতি পানি নিয়া ঘরে এসে ঢুকেছে। এসে দেখে হাসু অচেতন। দিকপাশ না তাকিয়ে কুপিটা রেখেছে মাটির মেঝেতে, টানা হ্যাঁচড়া করে উত্তর-দক্ষিণে শোয়া হাসুকে টেনে পুবে-পশ্চিমে করেছে। পা দুইটো পুবে, মাথা পশ্চিমে। মাথার তলা থেকে বালিশ সরিয়ে মাথা ঝুলিয়ে দিয়েছে চৌকির বাইরে। ঠিক মাথার তলা বরাবর রেখেছে বালতি। তারপর বালতি থেকে বদনা ভরে পানি তুলেছে আর নল দিয়ে অতিযত্নে পানি দিয়েছে মাথায়। জ্বরের ঘোরে তখন যেমন অচেতন হয়ে আছে হাসু, হাসুর মাথায় পানি দেওয়ার কাজে রহিমাও যেন একরকম অচেতনই।
এই অচেতনতা ফিরল বিয়ান রাতে, বাংলাঘরের কোণে পশ্চিমমুখী দাঁড়িয়ে মান্নান মাওলানা যখন ফজরের আজান দিলেন। ‘আছোলাতু খায়রুল মিনাননাউন’। সেই পবিত্র ডাকে রহিমা যেমন নিজের মধ্যে ফিরল, হাসুও প্রথমে কেমন কেঁপে উঠল, তারপর চোখ খুলল। হাসুকে চোখ খুলতে দেখে বুক থেকে যেন পাথর নেমে গেল রহিমার। হাতের বদনা বালতির পানিতে রেখে হাসুর কপালে হাত দিল, গলায় বুকে হাত দিল, দিয়ে স্বস্তির হাসি হাসল। আল্লায় রহম করছে। জ্বর নামছে।
