আতাহার অবাক হল। এই বাইত্তে আবার মাইয়া কেডা?
বোজচ নাই?
না।
আমিও পয়লা বুজি নাই। তর মায় ভাইঙ্গা কওনের পর বুঝছি।
কার কথা কইলো?
পারুর কথা।
আতাহার আঁতকে উঠল। কী?
হ। তর মায় চাইতাছে পারুরে তুই বিয়া কর।
আতাহার হাঁ করে মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
মান্নান মাওলানা বললেন, খালি এডু কথাঐ কয় নাই। আরও বহুত কথা কইছে। বাপ অইয়া হেই হগল কথা তরে আমি কইতে পারুম না। যা বোজনের তুই বুইজ্জা ল। তয় তর মা’র কথা হুইন্না আমি বুঝছি হের মাথাডা এক্কেরে বিগড়াইয়া গেছে। এই হগল লইয়া বড় রকমের একহান ভেজাল হেয় লাগাইবো।
আতাহার চিন্তিত গলায় বলল, আথকা এই হগল লইয়া প্যাচাইল পাড়তে আরম্ভ করল ক্যা মা’য়?
বোজলাম না। তয় আমার একহান সন্ধ অইতাছে।
কী?
পারু তর মা’রে কিছু কয় নাই তো?
ভাবিছাবে মা’রে কী কইবো?
মান্নান মাওলানা একটু রাগলেন। কী আর কইবো? এই হগল কথাঐ!
এই হগল তার কওনের কথা না।
ক্যা, কওনের কথা না ক্যা?
কইলে আগেঐ কইতো! দাদায় মরণের এতদিন বাদে কইবো ক্যা?
কইতে পারে। এতদিনে হয়তো চিন্তাভাবনা বদলাইছে।
আমার মনে অয় না।
তয় কী মনে হয় তর? আথকা তর মা’য় এই হগল প্যাচাইল পাড়তে আরম্ভ করলো ক্যা?
এক পলক মান্নান মাওলানার দিকে তাকিয়েই মাথা নিচা করল আতাহার। কেমতে কমু!
মান্নান মাওলানা একটুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর আচমকা বললেন, তর মতলব কী?
আতাহার চমকাল। কীয়ের মতলব?
তর মা’য় যা চায়, করবি? পারুরে বিয়া করবি?
আতাহার দৃঢ় গলায় বলল, না, মইরা গেলেও করুম না।
শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন মান্নান মাওলানা। চেয়ারের হাতলে থাবড় মেরে বললেন, শাব্বাশ বাপের বেড়া। এই না অইলে আমার পোলা! মা’য় ক্যান, আমার লাহান বাপে কইলেও বড়ভাইর বিধবা বউরে তর বিয়া করন উচিত না। তর লাহান বসসে মাইনষের জীবনে বহুত কিছু ঘডে। পারুর লগেও নাইলে তর ঘটছে। তাতে কী অইছে! ওই হগল ধইরা বইয়া থাকলে কাম অইবোনি?
আতাহার কথা বলল না। মাথা নিচা করে বসে রইল।
মান্নান মাওলানা হাতের তসবি জপতে জপতে বললেন, পারু যেমতে আছে অমতেঐ থাকব। জাগাজমিন বাড়িঘর গাইগোরু যা মোতাহার ভাগে পাইতো বেবাকঐ আমি অগো বুজাইয়া দিছি। তারবাদেও মোতাহার মরণের পর থিকা অগো দেখভাল আমি করি। পোলাপান তিনডাও ঠিকঐ মানুষ হইব। ওই হগল লইয়া তুই একদোমঐ চিন্তা করবি না। তুই তর নিজের চিন্তা কর। আজাহার ঘনঘন চিডি লেকতাছে। জাপানে থাকতে চায় না। দেশে আইয়া পড়তে চায়। আইয়া বিয়াশাদি কইরা সংসার করব। তয় তুই বিয়া না করলে ও আইবো না। এর লেইগা মদিনার জামাইরে আমি কইছি তর লেইগা মাইয়া দেকতে। ল্যাংড়া বইচ্ছারেও (বশির) খবর দিছি। ও তো অহন ভাল ঘটক! দুয়েক মাসের মইদ্যেঐ মাইয়া বিচড়াইয়া বাইর কইরা হালাইবো। ওইদিকে ঢাকা নারাইনগঞ্জে অন্য মাইয়ার জামাইগোও কইছি মাইয়া দেকতে। দুইডা মাইয়া দেকতে কইছি। একহান তর লেইগা আরেকহান আজাহারের লেইগা।
আতাহার আগের মতোই বসে রইল। কথা বলল না।
মান্নান মাওলানা বললেন, মোতাহাররে বিয়া করাইয়া কোনও লাব অয় নাই আমার। দুইডা পয়সাও আহে নাই সংসারে। লোয়াজিমা (বিয়ের আসবাবপত্র, গয়নাগাটি ইত্যাদি) যা পারুগো মিহি থিকা দিছে, চাইর পশা দাম নাই হেই হগলের। ওইডা আমি আশাও করি নাই। মোতাহারের শইল্যের দশা দেইক্কাঐ আততিয়র মাইয়া বাইত্তে আনছিলাম, যাতে ঘরের কথা পরে জানতে না পারে। তয় তর আর আজাহারের দশা তো মোতাহারের লাহান না! তগ দুই ভাইরে আমি ধনীর ঘরে বিয়া করামু। লোয়াজিমা, সোনাদানা টেকা পয়সা দিয়া যেন হেরা আমার বাড়ি ভইরা দেয়, এমুন বাড়ির মাইয়াঐ আমি বেবাকতেরে দেকতে কইছি।
মান্নান মাওলানার কথা শুনে ভিতরে ভিতরে খুবই পুলকিত হয়ে আছে আতাহার। একে তার বউ হয়ে আসবে নতুন তরতাজা কচি একখান নারীশরীর, তার উপর আসবে টাকা পয়সা, সোনাদানা, সব মিলিয়ে খুবই আনন্দের ব্যাপার। এই সুযোগ ফেলে কে যাবে ওই তিন পোলাপানের মা পারুরে বিয়া করতে! শরীরস্বাস্থ্য যতই কচিখুকির মতন হোক, বয়স তো কম হয় নাই! তা ছাড়া ওই শরীরের স্বাদও দশ-বারো বছর ধরে পেয়ে আসছে আতাহার। নতুন করে আর কী পাওয়ার আছে তার কাছে!
মান্নান মাওলানা বললেন, তর লগে আমার যা কথা অইলো এইডাঐ কইলাম ফাইনাল!
অনেকক্ষণ পর কথা বলল আতাহার। আইচ্ছা।
তয় তর মা’য় কইলাম আইবো তর লগে কথা কইতে। হেরে কী কবি?
কমুনে। ওই হগল লইয়া আপনে চিন্তা কইরেন না। মা’রে যেমতে পারি বুজামুনে।
হ বুজাইচ। কায়দা কইরা বুজাইচ। সোজা মানুষ, একহান জিনিস লইয়া চিন্তা করতাছে, এই চিন্তা কইলাম সহাজে হের যাইবো না। ঠান্ডা মাথায় সোন্দর কইরা বুজাইয়া হেরে অহন থামাবি। ওদিন কইলাম আমিও অমতেঐ থামাইছিলাম। তারবাদে আমাগো কাম। আমরা করুম।
আতাহার খুবই বাধুক ছেলের মতন বলল, আইচ্ছা।
মান্নান মাওলানা চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। আর কোনও কথা বললেন না। তসবি জপতে জপতে উঠানে নামলেন।
দুই এক পলক তাকিয়ে বাবার বের হয়ে যাওয়া দেখল আতাহার তারপর চৌকির উপর উঠে দাঁড়াল। দুই হাতে যত্ন করে ধরে তাকে রাখা সুটকেস নামাল।
.
গভীর রাতে দুর্বল হাতে কোনওরকমে রহিমাকে দুই-তিনটা ধাক্কা দিল হাসু। ক্লান্ত অসহায় গলায় ডাকল, ফুবু ও ফুবু, ফুবু।
