হাসু কথা বলল না। দম টানার ফাঁকে টের পাচ্ছিল শরীরের ভিতর থেকে বেজায় গরম একখান ভাপ বেরুচ্ছে।
.
বারবাড়ির দিক থেকে উঠে আসার সময় মান্নান মাওলানার মুখামুখি পড়ে গেল আতাহার। হাতে সিগ্রেট ছিল। কোনওরকমে সেই হাত পিছনে নিয়া আস্তে করে সিগ্রেটটা ছেড়ে দিল। তারপর মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনে বলে আমারে বিচড়াইছেন?
ছেলের মুখের দিকে একপলক তাকিয়ে নাড়ার পালার উপর দাঁড়িয়ে থাকা কাকতাড়ুয়াটির দিকে তাকালেন মান্নান মাওলানা। গম্ভীর গলায় বললেন, তরে কে কইলো?
রহি।
হ বিচড়াইছি। কথার কাম আছে।
কন।
এহেনে কইতে চাই না। ঘরে যাইয়া বয়, আমি আইতাছি।
আতাহার বুঝতে পারল না কোন ঘরে গিয়া বসবে! বলল, কোন ঘরে যামু? বড়ঘরে?
না, বাংলাঘরে যা।
আইচ্ছা।
আতাহার বাংলাঘরে গিয়া ঢোকার কিছুক্ষণ পর মান্নান মাওলানা এসে ঢুকলেন। মাটিতে পা রেখে চৌকির মাঝবরাবর বসেছিল আতাহার। ঘরের একপাশে বড়সড় ভারী ধরনের একখান টেবিল আর হাতাআলা একখানা চেয়ার আছে। বহুদিনের ব্যবহারে বার্নিশ মুছে পাকা কাঠের আসল রং বের হয়ে গেছে। এই চেয়ার টেবিলে বসে একসময় লেখাপড়া করেছে আতাহার। এখন টেবিল চেয়ার তেমন কোনও কাজে লাগে না। কখনও কখনও ভাত খাওয়ার কাজে টেবিলটা আজকাল ব্যবহার করে আতাহার। দুপুরে রাতে রহিমা তার ভাত ঢেকে রেখে যায় এই টেবিলে। চেয়ারে বসে আরাম করে খায় আতাহার।
আজ বিকালবেলা সেই চেয়ারটায় ছেলের মুখামুখি বসলেন মান্নান মাওলানা। হাতের তসবি জপতে জপতে বললেন, তর মা’র লগে তর কোনও কথা অইছে?
আতাহার অবাক হল। না তো! কী কথা?
তর বিয়াশাদির ব্যাপারে?
বাপের মুখে নিজের বিয়ার কথা শুনে আতাহারের মতন ছেলেও লজ্জা পেল। মাথা নিচা করে বলল, না।
মান্নান মাওলানা স্বস্তির হাঁপ ছাড়লেন। তয় ঠিক আছে।
আতাহার মুখ তুলে বাবার দিকে তাকাল। কী অইছে?
তর মা’য় একহান ভেজাল লাগাইছে।
কীয়ের ভেজাল?
তর বিয়াশাদি লইয়া।
কী কয়?
আবল তাবল প্যাচাইল। হুইন্না মনে অইলো মাথা খারাপ অইয়া গেছে।
আতাহার কথা বলল না। মান্নান মাওলানার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
মান্নান মাওলানা বললেন, আথকা কেমুন জানি অইয়া গেছে তর মা’য়। যেই মানুষ কোনওদিন। কথাঐ কইতো না, কয়দিন ধইরা বহুত প্যাচাইল পাড়তে শুরু করছে হেই মানুষ।
আতাহার আবার বলল, কী কয়?
একদিন বিয়ানে আমার লগে কাইজ্জাঐ লাগাই দিল।
ক্যা?
আমি নমজ পড়তে ডাক দিছি, এর লেইগা।
কন কী?
হ।
আতাহার চিন্তিত গলায় বলল, মায় তো এমুন মানুষ না!
আমিও তো হেইডাঐ কই। তারবাদে নমজ হেয় পড়ছে। নমজ পড়নের আগে মোতাহাররে লইয়া অনেক প্যাচাইল পাড়লো। আমারে অনেক দোষ দিলো। আমি বলে অর লেইগা কিছু করি নাই, এর লেইগা ও মইরা গেছে।
মা’য় তো দাদারে ইট্টু বেশি আদর করতো, এর লেইগাঐ কইছে।
হেদিন বড়পোলারে হেয় সপনেও দেকছে।
এর লেইগাঐ মনে অয় মনডা খারাপ আছিলো।
হইতে পারে। তয় মোতাহার মরণের পরও তো অরে হেয় সপনে দেকছে! আগে তো কোনওদিন আমার লগে এমুন করে নাই!
এসব কথা শুনে আতাহার চিন্তিত হয়ে রইল। বাড়ি ফিরেছিল টাকাপয়সা নিতে। আলী আমজাদের কন্ট্রাক্টরির ছাপরা ঘরে আজ তিতাস খেলা হবে। লগে কেরু কোম্পানির। হুইস্কি। চারখান মুরগি ভুনা করে পাঠাবে ফুলমতি। লগে খাঁটি ঘিয়ে ভাজা পরোটা। মজাটার আয়োজন দুপুরের পর হঠাৎ করেই করল আলী আমজাদ। তারপর আলম সুরুজ আর আতাহার যে যার বাড়ি গেল টাকা আনতে, আর নিখিল গেল খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করতে। পাঁচশো টাকার একখান নোট তার হাতে দিয়া দিল কন্ট্রাক্টর সাহেব।
তয় বাড়িতে এসেই মান্নান মাওলানার মুখামুখি পড়ে গেল আতাহার। বাংলাঘরের। কারের তলায়, দক্ষিণ দিককার বেড়ার লগে চওড়া কাঠের তাক, সেই তাকে আতাহারের টিনের সুটকেস। ওই সুটকেসেই তার টাকাপয়সা। ছোট্ট তালা আছে সুটকেসে। চাবিটা আতাহারের মাজায়, কাইতানের লগে বান্দা। সুটকেস খোলার সময়ই পায় নাই আতাহার। কখন পাবে, কে জানে! বাবা কতক্ষণ কথা বলবে, কে জানে!
তবে খেলা শুরু হতে দেরি আছে। সন্ধ্যার পর ছাড়া হবে না।
মা তার বিয়াশাদির ব্যাপারে কী বলল সেকথা শোনার জন্য খুবই উদগ্রীব হয়ে আছে আতাহার। কেন যে কথাটা এখনও বলছেন না বাবা! শুধু আবোল তাবোল প্যাচালই যে কেন পাড়ছেন!
আতাহারের মনের এই কথাটা যেন টের পেলেন মান্নান মাওলানা। একবার ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে, হাতের তসবি জপতে জপতে উঠানের দিকে তাকালেন। উঠোনে রোদের রং এখন পাকা আমের মতন। বিকালবেলাও গরমের কমতি নাই। রোদের দিকে। তাকিয়ে গরমটা যেন একটু বেশিই টের পেলেন মান্নান মাওলানা। নিজের কাছে নিজে বলার মতন করে বললেন, ইস কী গরমডা যে পড়ছে! বৈশাখ মাস আইয়া পড়লো তাও মেগবিষ্টির দেহা নাই। এমুন অইলে মাইনষের দশা খারাপ অইয়া যাইবো।
আতাহার কথা বলল না। অস্থির লাগছে তার। এইসব আবল তাবল প্যাচাইল পারতাছে ক্যা বাবায়! আসল কথা কয় না ক্যা!
চালাকি করে নিজেই কথা তুলল। বাবা, হেদিনের পর থিকা কি মা’য় প্যাচাইল ইট্টু বেশি পাড়তাছে?
মান্নান মাওলানা চিন্তিত গলায় বললেন, হ।
কী কয়?
বহুত পদের কথা।
আমারে লইয়া কী কইছে?
হেদিন কিছু কয় নাই। কইছে দুই-তিনদিন আগে। আথকা আমারে কয়, আতাহারের লেইগা অন্য জাগায় মাইয়া দেইক্কা লাব নাই। বাইত্তেঐত্তো মাইয়া আছে। হেই মাইয়া অরে বিয়া করান।
