হাসু কথা বলল না। চোখ ছোট করে রহিমার দিকে তাকিয়ে রইল।
রহিমা বলল, জিগাইলি না, কী কথা?
তুমিঐ কও। কথা কইতে আমার ভাল্লাগতাছে না।
ক্যা? কী অইছে তর? দোফইরা ভাতও তো ঠিক মতন খাইলি না!
হ।
ক্যা? শইল ভাল না?
না। কেমুন জানি লাগতাছে।
কেমুন লাগতাছে?
কইতে পারুম না।
জ্বরজ্বারি আইলো নি?
হাসুর কপালে হাত দিল রহিমা। দিয়া চিন্তিত হল। হ শইল ইট্টু ইট্টু গরম। মনে অয় জ্বর আইবো।
হাসু কাতর গলায় বলল, ভাত খাইতে বইয়া খালি উটকি (উদগার) আইছে।
কচ কী?
হ। খালি মনে অইছে উকাল অইব।
রহিমা ভাল রকমের চিন্তিত হল। পান চিবানো ভুলে একদৃষ্টে হাসুর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, উটকি পারছস, উকাল করতে চাইছস! হাসু, অন্যকোনও ভেজাল বাজাচ নাই তো?
কথাটা বুঝতে পারল না হাসু। বলল, কীয়ের ভেজাল?
বোজচ নাই?
না।
সিয়ানা মাইয়ারা কুনসুম উটকি পারে আর উকাল করে জানচ না তুই?
হাসু মুমূর্ষ মুখে হাসল। জানি। তয় ওই হগল না। ওই হগল অইলে বহুত আগে অইতো। তোমার লাহান বেবাক কিছু মাইন্না লইলে শইল্যের এমুন বেড়া বেড়া দশা হইতো না। মউচ্ছামান্দ্রার বাইত্তে ভালঐ থাকতে পারতাম। কয়দিন পর পর তোমার কাছে আইতাম না। এই বাইত্তে থাকতে চাইতাম না।
এই বাড়িও কইলাম ওই বাড়ির লাহানঐ। হুজুর আর তার পোলায় আছে না?
বেবাকঐ জানি। বহুতদিন ধইরাঐ আতাহার দাদার মতলব আমি বুজি, হুজুরের মতলবও বুজি। হেদিন পাও টিপতে ডাইক্কা হুজুরে আমার শইল্যে হাত দিতে চাইছে। এই হগল অবস্থায় নিজেরে আমি ঠিকঐ বাঁচাইতে পারি। হেদিন আমার বাঁচান লাগে নাই, হুজুরানিঐ আমারে বাঁচাইয়া দিছে।
কেমতে?
হুজুর খালি আমার শইল্যে হাতটা দিবো, লগে লগে হুজুরানি আইয়া ঘরে হানছে।
হেয় দেকছে?
পুরা দেকছে কিনা কইতে পারি না।
তরে কিছু কয় নাই তো?
না।
রহিমা স্বস্তির শ্বাস ফেলল। তয় মনে অয় বোজে নাই। হেয় এই হগল বোজে কম। বহুত ভাল মানুষ। হেয় যদি মানুষ খারাপ অইতো তাইলে এই বাইত্তে আমি থাকতে পারতাম না। হুজুরেও যা মন লয় করতে পারত না। মোতাহারের বউ আর আতাহার যেই হগল করে, এই হগল কিছুঐ এই বাইত্তে অইতো না।
তয় আমার মনে অয় হুজুরানির অমুন হওনঐ ভাল আছিলো। কুত্তা যেমুন অয় ইটামুগইরও হেমুন অওন উচিত।
বাদ দে এই হগল প্যাচাইল। অহন আসল কথা হোন।
হাসু আবার চোখ বুজল। কও।
ভাত খাইয়া এই ঘরের মিহি আইতাছি, দেহি বাইর বাড়ির মিহি যাইতাছে হুজুরে।
এই টাইমে ওই মিহি যায় ক্যা? এইডা তো তার ঘোমের টাইম!
হ। আইজ মনে অয় ঘোম আহে নাই।
ক্যা?
আমি কেমতে কমু!
হাসু কথা বলল না। চোখ বুজে চুপ করে রইল।
রহিমা পান চিবাতে চিবাতে বলল, হুজুরের মুখ দেইক্কা মনে অইলো হেয় জানি কী চিন্তা করতাছে। আমারে দেইক্কা হাত ইশারায় ডাক দিল। গেলাম। জিগাইলো আতাহাররে দেখছিলি? কইলাম, না। আতাহারে আইজ দুইফইরা ভাত খাইতে আহে নাই। মনে অয় দোস্তগ লগে আছে। কনটেকদার সাবের লগে মাওয়ার বাজারের হইটালে খাইয়া লইবো নে। হুজুরে আর কথা কইলো না। বড়ঘরের মিহি কাইক দিছে দেইক্কা আমি সাহস কইরা তর কথা কইয়া হালাইলাম।
হাসু চোখ খুলল। কী কইলা?
কইলাম তুই এই বাইত্তে থাকতে চাস। আমি বুড়া অইয়া গেছি, একলা এতবড় সংসারের কামকাইজ করতে পারি না।
হেয় কী কইলো?
কইলো, যেই বাইত্তে কাম করে ওই বাইত্তে অসুবিদা কী?
তুমি কী কইলা?
অসুবিদার কথা বেবাক ভাইঙ্গা কই নাই। দুই-একখান কইছি। চালাক মানুষ তো, অল্পতেঐ বেবাক বোজে।
তারবাদে কী কইলো?
হাসলো। আইচ্ছা ঠিক আছে, থাউক। তয় বেতন বোতন কইলাম দিতে পারুম না। তুই যেমতে আছস তর ভাইরবেডিও অমতেঐ থাকবো। পেড়ে ভাতে। দুই ইদের সমায় দুইহান কাপড় পাইবো, আর কিছু না।
হাসু আবার চোখ বুজল। কথা বলল না।
হাসুর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে আবজানো দরজার ফাঁক দিয়া উঠানের দিকে তাকাল রহিমা। উঠানে এখন বৈশেখ মাসের দুপুর শেষের রোদ। রোদের তেজালো ভাব আবজানো দরজার ফাঁক দিয়া যেটুকু আসছে তাতেও দশা খারাপ অবস্থা হওয়ার কথা মানুষের। রহিমার তেমন হচ্ছিলও। তয় শরীরের ভিতর থেকে অদ্ভুত এক উষ্ণতা ঠেলে বেরুবার ফলে বাইরের উষ্ণতা একদমই টের পাচ্ছিল না হাসু। ফুফুর লগে এতক্ষণ ধরে টুকটাক কথা বলার ফলে ক্লান্ত লাগছে তার, গলাটা কী শুকিয়েও আসছে। গলা ভিজাবার জন্য একবার ঠোঁট চাটল হাসু। ব্যাপারটা খেয়াল করল রহিমা। কী রে তিয়াস লাগছেনি?
হ।
পানি খাবি?
দেও।
ঘরের কোণে ঠিলা রাখা আছে। মুখের উপর মাটির সরা। সরার উপর টিনের চলটা ওঠা মগ। দীর্ঘদিন ধরে মাটির ওপর ভরা ঠিলা রাখতে রাখতে ঠিলার তলার আকৃতির গর্ত হয়ে গেছে জায়গাটায়। গর্তে বসা ঠিলা থেকে পানি ঢালতে সুবিধা। পায়ের পাতার উপর ঠিলা তুলে পানি ঢালতে হয় না। কাত করলেই হয়।
রহিমা দ্রুত হাতে সেই ঠিলা থেকে পানি ঢেলে আনল হাসুর জন্য। কোনওরকমে মাথা তুলে দুই-তিন টোক পানি খেল হাসু। তারপর দুর্বল ভঙ্গিতে মাথা রাখল বালিশে। আবজানো দরজার ফাঁক দিয়ে মগের বাকি পানিটুকু গোলাঘরের ছনছায় ফেলে মগ জায়গা মতন রাখল রহিমা। আবার এসে বসল হাসুর পাশে। বলল, এতদিন বাদে আইজ হুজুরের লগে তরে লইয়া কথা কইলাম, এই বাইত্তে তর থাকনের বেবস্তা করলাম আর আইজঐ তর জ্বর আইলো? কোনও কোনও মাইনষের নছিব এমনুঐ অয়। যেদিন কোনও শুভ কাম অয় হেদিন হেগো অসুক বিসুক অয়। শুভ কামের ফুর্তিডা হেরা করতে পারে না। তুই অইছস হেই পদের মানুষ।
