না জানি না। তুমি কও।
জাইন্না হুইন্না ক্যান আমারে দিয়া কথাডি কওয়াইতে চান! খালি আমার একহান কথার জোব দেন আপনে, আপনের যে চাইরহান মাইয়া, আপনের কোনও মাইয়ার জীবন যুদি পারুর লাহান অইতো, তাইলে আপনে কী করতেন?
মান্নান মাওলানা রুক্ষ গলায় বললেন, অন্যের সমস্যার লগে নিজের পোলাপানরে মিলাইয়ো না।
ক্যান মিলামু না? পারু অন্যের মাইয়া ঠিক, তয় আপনের আততিয়। আবার আপনের এক পোলার বউ, আরেক পোলার তিন পোলাপানের মা। এতমিহি দিয়া যে জড়িত তারে আপনে অন্যমানুষ কন কেমতে? আর আপনের লেইগা যেই মাইয়াডার জীবন নষ্ট অইছে। তার কথা আপনে ভাববেন না ক্যা?
আমার লেইগা পারুর জীবন কেমতে নষ্ট অইছে?
বড়পোলার শইল্যের কথা বেবাক কিছু জাইন্নাঐত্তো আততিয়র মাইয়ারে আপনে বউ কইরা আনছিলেন, যাতে আততিয়র মাইয়া বাইরের মাইনষেরে কিছু না কয়, কেলেঙ্কারি না করে।
কেলেঙ্কারি তো করছেঐ।
তহুরা বেগম একটু চমকালেন। কেমতে?
দেওরের লগে ইটিস পিটিস করছে।
এর লেইগাও আপনেঐ দায়ী। আমি বারবার আপনেরে অনুরুদ করছি মোতাহাররে ঢাকা লইয়া যান, বড় ডাক্তার দেহান, চিকিচ্ছা করলে ও ভাল অইবো। হেই কামডা যুদি করতেন, মোতাহারের শইলডা যুদি ভাল অইতো তাইলে এই কেলেঙ্কারি অয় না।
মান্নান মাওলানা চুপ করে রইলেন।
তহুরা বেগম বললেন, হেদিনও কইছি আইজও কই, আমার পোলাডা মরছেও আপনের লেইগা। অর গ্যাসটিকের চিকিচ্ছাডাও আপনে করান নাই। বিয়া করাইয়া বাঁজা জমিন আর ল্যারল্যাইরা দুই-তিনহান গোরু দিয়া ছাইড়া দিছেন পোলাডারে। বউ আর নিজের খোরাকি জোগাড় করতে করতেও পোলাডা আমার মরছে। যাউক ঐহগল লইয়া কথা কইয়া আর লাব নাই। যে গ্যাছে তারে তো আমি আর ফিরত পামু না! পোলার লগে বিয়া দিয়া যেই মাইয়াডারে সংসারে আনছিলেন বাইচ্চা থাইক্কাও তিনহান পোলাপান লইয়া হেয় আছে জিন্দা মরনে মইরা। হেরে আমি বাঁচাইয়া রাকতে চাই। বাইত্তে নতুন বউ আননের কাম নাই। দুইন্নাইতে এমুন ঘটনা বহুত ঘটে। বড়ভাইর বিধবা বউরে অনেক দেওরেঐ বিয়া করে। আর আতাহারের লগে পারুর সম্পর্ক বউ জামাইর লাহান। বেবাক কিছু বিবেচনা কইরাঐ চিন্তাডা আমি করছি। অহন এইডার ব্যবস্থা আপনের করন লাগবো। আমি আর কোনও কথাই হুনুম না।
অনেকক্ষণ ধরে একই রকমের কথা শুনতে শুনতে খুবই বিরক্ত হয়েছেন মান্নান মাওলানা। আতাহারকে নিয়া এই ধরনের চিন্তাভাবনা তাঁর একদমই ভাল লাগছে না। আবিয়াত ছেলে হচ্ছে একধরনের মূলধন। এই মূলধন খাঁটিয়ে অন্য গিরস্তের কাছ থেকে টাকাপয়সা সোনাদানা এমনকী জায়গাসম্পত্তিও বাড়াবেন তিনি। বড়ছেলেটাকে দিয়া সেই কাজ হয় নাই। এখন হাতে আছে অন্য দুই ছেলে! তার একটাকে নিয়া স্ত্রী এর মধ্যেই ভেজাল লাগাবার চেষ্টা করছে। এই ভেজাল এখনই ভাঙতে গেলে ঝগড়াঝাটি লেগে যাবে! সোজা মানুষ এতদিন পর খেপেছে তাকে সামলাতে হবে বুদ্ধি দিয়া, কায়দা করে। সেই কায়দার পথটাই তারপর ধরলেন মান্নান মাওলানা। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললেন, ঠিক আছে, তুমি অহন শান্ত হও। আমি ব্যবস্থা করতাছি।
.
হাসুবালা, ও হাসুবালা! ঘুমাইছনি?
গোলাঘরের চৌকিতে কাত হয়ে শুয়ে আছে হাসু। তার পরনে সবুজ রঙের ত্যানা ত্যানা শাড়ি আর নানা রঙের ফুল লতাপাতা আঁকা ছিট কাপড়ের ব্লাউজ। মাথার তলায় তেল। চিটচিটা ধ্যালধ্যাল বালিশ। মাথার ভারে চৌকির লগে এতটাই মিশে গেছে সেই বালিশ হঠাৎ করে তাকালে বোঝাই যায় না যে বালিশ মাথার তলায় একখান আছে।
হাসুর চোখ বোজা, মুখে মুমূর্ষ ভাব। খানিক আগেই রান্নাঘর থেকে ভাত খেয়ে আসছে। সে আর রহিমা একলগেই খেতে বসেছিল। হাফিজদ্দিও ছিল। খেতে আজ ভাল লাগছিল না হাসুর। শরীরের কীরকম একটা ম্যাজম্যাজ ভাব। দুই-তিন লোকমা ভাত খাওয়ার পরই শরীর গুলাতে শুরু করেছে, বমি বমি ভাব হয়েছে। নিজেকে শক্ত করে ব্যাপারটা চেপে রেখেছে হাসু। কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়া কোনওরকমে থালের ভাত শেষ করে এই ঘরে এসে শুয়ে পড়েছে।
রহিমা খেয়াল করেছিল ব্যাপারটা, জানতেও চেয়েছিল। কী অইছে তর? এমুন হরতরাইস্যা ভাব ক্যা?
হাফিজদ্দি হেসেছে। হাসু তো এমুন।
তখনই হাসু ভেবে রেখেছিল খাওয়াদাওয়া শেষ করে ফুফু যখন গোলাঘরে আসবে তখন তাকে সব বলবে।
রহিমা এল অনেকক্ষণ পর। হাসুর ততক্ষণে শরীর আরও খারাপ। বুকের অনেক ভেতর থেকে তাপ বেরুচ্ছে। শরীরে অদ্ভুত এক অবস্থা, হাত পায়ের গাটে গাঁটে ব্যথা, চোখ জ্বলছে, মাথা ঝিমঝিম করছে, জ্বর আসার লক্ষণ।
এই অবস্থায় রহিমা এসে এমন আহ্লাদী গলায় ডাকল।
ভাত খেয়েই আঁচলের গিঁট থেকে খুলে পান মুখে দিয়েছে রহিমা। পান মুখে দিলে এমনিতেই তার আচরণে একটা ফুর্তির ভাব আসে। এখন যেন ভাবটা একটু বেশি আসছে। হাসুকে ডাকছে হাসুবালা বলে।
হাসুর নামের লগে যে বালা কথাটা আছে সেইকথা ভুলেই গিয়েছিল সে। এখন ফুফুর ডাকে বহুদিন পর মনে পড়ল। সত্যিই তো, তার পুরা নাম তো হাসুবালাই। কেউ ডাকে না বলে দিনে দিনে চাপা পড়ে গেছে।
কোনওরকমে চোখ খুলল হাসু। মুমূর্ষ গলায় বলল, কী অইছে? ডাক পাড়ো ক্যা?
হাসুর পাশে বসল রহিমা। একখান সমবাত আছে।
কীয়ের সমবাত?
মুখের পানে দুই-তিনটা চাবান দিল রহিমা। হুজুরের লগে আমার কথা অইছে।
