তহুরা বেগম গম্ভীর গলায় বললেন, আমি অহনও কানা অই নাই। চোক্কে ভালঐ দেহি। বেবাকঐ আমি দেকছি। তয় এই হগল লইয়া অহন কথা কমু না। বাইচ্চা থাকলে পরে একদিন কমু। কারণ বহুত বড় একখান কাম আমার আছে, হেই কামডা আমি শেষ করতে চাই। আপনের ছাড়া কামডা আমি শেষ করতে পারুম না। আপনের লগে বুদ্ধি পরামশ্ব কইরাঐ আউগগান লাগবো কামড়ায়।
যেন এত কথার বেশির ভাগই তিনি বুঝতে পারেন নাই এমন গলায় মান্নান মাওলানা বললেন, আমি খ্যাল করছি, তুমি আইজকাইল কথা বেশি কও। কথার কোনও আগামাথা নাই। অৰ্দেকঐ আমি বুজি না।
আমি কী কইছি, ক্যান কইছি বেবাকঐ আপনে বোজছেন। ঐযে ডাকের কথা আছে না। ‘যার মনে যা, ফালদা ওডে তা’। আপনে যেই কাম করতে চাইছিলেন, আমি কথা কওনের পর হেইডাঐ আপনের মনে ফালদা উটছে। কইলাম তো এই হগল লইয়া আমি আইজ কথা কমু না। আমি কমু অন্যকথা।
এবার মুখ গম্ভীর করলেন মান্নান মাওলানা। খেটকুরে গলায় বললেন, এতো প্যাচাইল পাইড়ো না। যা কওনের কইয়া হালাও।
পালঙ্কের কোণে বসে গম্ভীর গলায় তহুরা বেগম বললেন, মাসহানির মইদ্যে আতাহাররে বিয়া করামু।
কী?
হ।
আতাহারের মত লইছো?
না। হেইডা লওন লাগবো আপনের।
বোজলাম। পোলার বিয়ার লেইগা তো একহান মাইয়া লাগে, মাইয়া দেকছো?
হ।
মান্নান মাওলানা আকাশ থেকে পড়লেন। আমি জানলাম না আর তুমি মাইয়া দেকলা? কই দেকলা?
তহুরা বেগম আগের মতোই গম্ভীর গলায় বললেন, মাইয়া এই বাইত্তে আছে।
কী, এই বাইত্তে আছে? কেডা?
পারুল। আমগো পারু। আপনের বড়পোলার বিধবা বউ।
পারুর কথা শুনে মান্নান মাওলানার অবস্থা হল ওই অত মানুষজনের সামনে নূরজাহান তার মুখে থুতু ছিটিয়ে দেওয়ার পর যেমন হয়েছিল অনেকটা তেমন। তিনি একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। কথা বলতে পারলেন না। হতভম্ব ভঙ্গিতে হাঁ করে তহুরা বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর কলের পুতুলের মতন নিঃশব্দে বিছানায় উঠে বসলেন। কী কইলা তুমি? কার কথা কইলা?
তহুরা বেগম বললেন, হোনেন নাই? আমি পারুর কথা কইছি। আতাহারের লগে পারুর বিয়া দিমু। বেবাক ব্যবস্থা আপনের করন লাগবো।
তুমি কি পাগল অইয়া গেছ?
না। পাগল অই নাই। সুস্থই আছি।
আমার মনে অয় অইছো। মাথায় ছিট দেহা দিছে তোমার।
না, আমার মনে অয় আপনের সংসারে আহনের পর থিকা আমি এতদিন পাগল আছিলাম। মাথায় ছিটঐ আছিলো আমার। এর লেইগাঐ আপনে যহন যা কইছেন হুনছি, আপনের বদামি দেইখাও মুখ ফুইট্টা কিছু কই নাই। আমার চোকের সামনে আকাম কুকাম বহুত করছেন আপনে। আমার লগে হুইয়া থাইক্কাও রাইত দুইফরে উইট্টা গেছেন রহির কাছে, মাকুন্দারে ষড়যন্ত্র কইরা মারলেন, জেলে দিলেন। অহন আছেন গাছির মাইয়ারে লইয়া বদামির চিন্তায়, আরও বহুত ধান্দা ফিকির আপনের আছে। মাওলানা অইয়া, আল্লার কামেলদার বান্দা সাইজ্জা যেই হগল কাম জীবনভর আপনে করছেন আর আমি দেকছি, ওইডি দেইক্কা যে মুখ বুইজ্জা রইছি, হেই মুখ বোজনডাঐ আছিলো আমার পাগলামি। মাথায় ছিট না থাকলে স্বামীর আকাম কুকাম কেঐ মাইন্না লয় না। আমার মাথায় ছিট আছিলো দেইক্কা আমি মাইন্না লইছি। আইজ হেই পাগলামি আর ছিট আমার গেছে গা। আইজ আমি ভাল অইয়া গেছি। এর লেইগা এই চিন্তাডা আমি করতাছি। আপনে আতাহারের লগে কথা কন। বিয়ার ব্যবস্থা করেন।
স্ত্রীর এই চেহারা আজও নিয়া দুইদিন দেখলেন মান্নান মাওলানা। প্রথম দিনকার মতো আজও চিন্তিত হলেন। তাঁর স্বভাব অনুযায়ী এই ধরনের কথা শোনার পর হয় স্ত্রীকে লাথথি মেরে পালঙ্ক থেকে ফেলে দেওয়া নয়তো দিকপাশ না তাকিয়ে হাতের সব শক্তি দিয়ে থাপ্পড় মারা। সেদিনও এই কাজটা তিনি করেন নাই, আজও করলেন না। ভেতরে ভেতরে রাগ তার প্রচণ্ডই হচ্ছে তয় সেই রাগ দমন করে তিনি ভাবতে চাইলেন ব্যাপারটা আসলে হচ্ছে কী! সেদিনের পর থেকে এভাবে কেন হঠাৎ করে বদলে গেলেন তহুরা। বেগম! সেদিন বলেছেন অনেক কথা তিনি মান্নান মাওলানার লগে বলবেন। কী কথা বলতে চান? আর আজ হঠাৎ করে আতাহারের লগে পারুর বিয়া দেয়ার জন্যই বা পাগল হয়ে গেলেন কেন? কোথায় কী এমন ঘটেছে যে কারণে মহিলা এমন হয়ে গেলেন! হাসুর লগে মান্নান মাওলানার অশ্লীল একটি আচরণ দেখেও ওই নিয়া কথা না বলে বলছেন পারুর বিয়ার ব্যাপারে!
স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন মান্নান মাওলান। অতিরিক্ত নরম গলায় বললেন, তোমার অইছে কী?
কিছুঐ হয় নাই।
তয়?
তয় আবার কী?
এতদিন বাদে আথকা আতাহারের লগে পারুর বিয়া দিতে চাইতাছো?
এই চাওনডা আমার আগেঐ চাওন উচিত আছিলো। চোক্কের সামনে উপযুক্ত মাইয়া থাকতে আমি দুইন্নাই ভর পোলার লেইগা মাইয়া দেকতাছি।
কই আর দেকলা? তোমার পোলায় তো বিয়াঐ করতে চায় না!
না চাওনের কারণ আমিও জানি, আপনেও জানেন। যার কারণে চায় না তার লগেঐ যুদি বিয়া অয় তাইলে বিয়ায় আর অমত করবো না।
তোমার মনে অয় অমত করবো না?
হ আমার মনে অয়।
আমার মনে অয় না।
ক্যা?
একজনরে লইয়া মইজ্জা থাকনের পোলা আতাহারে না।
হেইডাও আমি জানি। এই সবাবটা ও পাইছে আপনের কাছ থিকা। তারবাদেও পারুরে বিয়া অর করনঐ লাগবো। করন উচিত।
ক্যা? উচিত ক্যা?
চোখ তুলে স্বামীর চোখের দিকে তাকালেন তহুরা বেগম। আপনে জানেন না ক্যান উচিত?
